রাশিয়ার পাঠানো চন্দ্রযান লুনা-২৫ নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া গতকাল রবিবার চাঁদেই বিধ্বস্ত হইয়াছে। ৪৭ বছর পর গত ১১ আগস্ট রাশিয়া লুনা-২৫ নামের মহাকাশযানটি চাঁদে পাঠাইয়াছিল। একসময়ে মহাকাশ অভিযানে সোভিয়েত রাশিয়ার বিশাল ভূমিকা ছিল। তবে লুনা-২৫-এর ব্যর্থতা রাশিয়ার জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। কারণ, চন্দ্রপৃষ্ঠে রাশিয়ার মহাকাশযান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটিল এমন সময়, যখন দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশটি বহু দশকের মধ্যে বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়িয়াছে। পশ্চিমা দেশগুলির নিষেধাজ্ঞা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচাইতে বড় রুশ-ইউক্রেন স্থলযুদ্ধ যাহার প্রধান কারণ। রাশিয়ার এই চন্দ্রযানটি চাঁদের এমন একটি অংশে অভিযান চালাইবার কথা ছিল যেইখানে জমাটবাঁধা বরফ জল ও মূল্যবান বস্তু থাকিতে পারে বলিয়া বিজ্ঞানীরা ধারণা করিতেছেন। সেই একই অঞ্চলেই ভারতের মহাকাশযান চন্দ্রযান-৩ অবতরণের অপেক্ষায় রহিয়াছে। চন্দ্রযান-৩-এর অবতরণের কথা আগামী ২৩ আগস্ট। তাহার পূর্বেই রাশিয়ার লুনা-২৫-এর অবতরণের কথা ছিল। উল্লেখ্য, চার বছর পূর্বে চাঁদের এই দুর্গম দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হইয়াছিল ভারতের চন্দ্রযান-২। দুর্গম, বন্ধুর ও জটিল হিসাবনিকাশের এই চন্দ্রাভিযান বরাবরই অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের ছিল।
এই ক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করিতে পারি যুক্তরাষ্ট্রের চন্দ্রাভিযানগুলির কথা। নাসার অ্যাপোলো-১৭ অভিযানে শেষ বার চাঁদের মাটিতে পা রাখিয়াছিল মানুষ। উহা ছিল ১৯৭২ সালের ৭ ডিসেম্বরের ঘটনা। প্রায় অর্ধশত বছর পর গত বছর যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় চাঁদে মহাকাশচারী পাঠাইবার নূতন উদ্যোগ লইয়াছে। সকল কিছু ঠিক থাকিলে ২০২৪ সালের মধ্যে নাসা চাঁদে মহাকাশচারী পাঠাইবে। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী চাঁদের দেবী আর্টেমিস। তাহার নামানুসারে এই চন্দ্রযানের নাম রাখা হইয়াছে। ‘আর্টেমিস-১’ অভিযানের এই ক্ষণে স্মরণ করা যাইতে পারে, ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম পা রাখিবার ঘটনাটি। উহার নেপথ্যে ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের টানাপড়েন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার টক্কর ছিল সেয়ানে সেয়ানে। এই টক্করে ১৯৫৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুনিক প্রেরণ করে। ইহার পর তাহারা ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিন নামের নভোচারীকে প্রথম মহাশূন্যে পাঠাইয়া বিশ্বকে তাক লাগাইয়া দেয়। এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় একটি ‘লাফ’ দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়াছিল। এই জন্য ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের ৪ শতাংশের অধিক বরাদ্দ দেওয়া হয় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাকে। ১৯৬৫ সালে সোভিয়েত যখন ‘স্পেস ওয়াক’ সম্পন্ন করেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অ্যাপোলো-১ অভিযান মুখ থুবড়াইয়া পড়ে। লাঞ্চপ্যাডের অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু ঘটে তিন নভোচারীর। মহাকাশে কর্তৃত্ব অর্জন করিতে যুক্তরাষ্ট্র ইহার পর আরও মরিয়া হইয়া উঠে। ইহার পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই অ্যাপোলো-১১ মিশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিন নভোচারী চাঁদে পা রাখেন। যুক্তরাষ্ট্র এই অর্জনকে ঘোষণা করে সমগ্র মানবজাতির অর্জন হিসাবে। চাঁদের মাটিতে প্রথম পা ফেলিবার সময় বলা হয়—মানুষের জন্য ইহা ‘ছোট্ট পদক্ষেপ’; কিন্তু মানবসভ্যতার জন্য ইহা বিরাট লাফ।
আধুনিক বিজ্ঞান বলে, আফ্রিকা হইতে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল মানুষ। ইহার নেপথ্যে ছিল নূতন ও অজানার প্রতি প্রচণ্ড আকর্ষণ। মানুষ অদম্য কৌতূহলে তরি ভাসাইয়াছে মহাসমুদ্রে, আবিষ্কার করিয়াছে নূতন নূতন ভূখণ্ড, স্থাপন করিয়াছে নূতন উপনিবেশ। বিভিন্ন সময় কলম্বাস, ভাস্কো-দা-গামা, আমেরিগোসহ অসংখ্য অভিযাত্রী অংশ লইয়াছে এই দুঃসাহিসক অভিযানে। ইহা হইল পরাশক্তিদের নূতন উপনিবেশ অনুসন্ধানের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। মান্না দে যেমন গাহিয়াছিলেন—‘ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে’; কিন্তু চাঁদ কি সকল সময় তাহার জোছনাকে সামলাইয়া রাখিতে পারে? বিভিন্ন দেশের অভিযান সফল হউক—ইহা অনেকেই চাহে। কারণ উহা দ্বারা আহরিত জ্ঞান নিঃসন্দেহে ঋদ্ধ করিবে সমগ্র মানবজাতিকেই। সকল মহাকাশ অভিযান হউক মানবজাতির স্বার্থে—ইহাই কাম্য।
