নার্সিং শিক্ষা খাতে চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। এ খাতের উন্নয়নে বড় বাধা দুর্নীতি। প্রশাসনের নিচ থেকে শীর্ষ প্রতিটি পদে ঘুষ এখন ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর এক সঙ্গে ৬৮৪ নার্সের বদলির ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই বদলির পেছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ১০ বছরেও সিলেকশন গ্রেড ও পদোন্নতি না হওয়ায় নার্সদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণ দিয়ে নার্স তৈরি করার ঘটনায়ও নার্সিং সমাজ ক্ষুব্ধ। এসব ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে যে কোনো সময় ৩৬ হাজার নার্স আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দাবিতেই নার্সরা মাঠে নামবেন।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নার্সদের পদোন্নতিসহ মান উন্নয়নে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিলেও মন্ত্রণালয়ের একটি সিন্ডিকেটে নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে তাদের পদোন্নতি আটকে আছে। দেশ-বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রিধারী নার্স থাকলেও তাদের অধিদপ্তর, নার্সিং কলেজসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজ বেতনে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তাদের মূল পদ সিনিয়র স্টাফ নার্স। কিন্তু তাদের কেউ দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী পরিচালক, উপ-পরিচালক, পরিচালক, প্রিন্সিপালসহ অন্যান্য পদে। অনেকে ইতোমধ্যে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু দায়িত্ব পালন করেছেন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা পদে। আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স পদের। অথচ একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডিপ্লোমাধারী ফার্মাসিস্টরা সিলেকশন গ্রেড পাচ্ছেন। বঞ্চিত রয়েছেন শুধু নার্সরা। প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও নার্সদের প্রাপ্য বকেয়া সিলেকশন গ্রেড বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুঃখ, হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশন (বিএনএ) কেন্দ্রীয় কমিটি ও সংগঠনের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শাখা।
নার্সিং সেক্টর নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এই সিন্ডিকেটই নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। এদিকে দেশের কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম বহির্ভূতভাবে ডিপ্লোমাধারী নার্সদের সার্টিফিকেট প্রদান করছে। যা স্বাস্থ্যখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশনের (বিএনএ) মহাসচিব মো. জামাল উদ্দীন বাদশা বলেন, সরকার কর্তৃক স্বীকৃত তথা নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে পাসকৃত নার্সগণই কেবল নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের নিবন্ধিত পরীক্ষার মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত হবে। এর বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে নার্স হিসাবে পাসকৃতদের রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা যাবে না নার্সিং কাউন্সিল থেকে।
নার্সিং সেক্টর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সদিচ্ছায় এন্ট্রি পয়েন্টে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীতকরণের মাধ্যমে নার্সদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। সেই সাথে সেবা পরিদপ্তরকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারী অধিদপ্তরে উন্নীতকরণ, সেবা ভবনের জন্য ঢাকার মহাখালীতে জমি বরাদ্দসহ ভবন নির্মাণ, দেশে ও বিদেশে নার্সদের উচ্চ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, পদোন্নতির ব্যবস্থা, সর্বোচ্চ সংখ্যক পদ সৃষ্টিসহ ২০১০ সালে প্রায় ২০০০ নার্স, ২০১৩ সালে ৪১০০ নার্স এবং ২০১৬ সালে রেকর্ড সংখ্যক প্রায় ১০ হাজার নার্সকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দান, ২০১৮ সালে আরো ৫১০০ নার্সকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এ জন্য নার্স সমাজ বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ; কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো যে, দেশের সকল সেক্টরে কর্মরত প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারী প্রাপ্যতা অনুযায়ী তাদের সিলেকশন গ্রেড ও পদোন্নতি যথাসময়ে পেয়ে থাকলেও ব্যতিক্রম শুধু নার্সিং পেশায়। সিনিয়র স্টাফ নার্সদের বদলি নিয়ম অনুযায়ী অধিদপ্তরের অধীনে থাকলেও একটি কমিটি নার্সদের বদলি নিয়ন্ত্রণ করছে, যা জনপ্রশাসনের নিয়মনীতির বহির্ভূত।
ডিপিসির মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। যোগ্যতা সম্পন্ন নার্স থাকলেও বাইরে থেকে লোক এনে অধিদপ্তর চালানো হচ্ছে। এতে নার্সদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। মজার ব্যাপার হলো- অধিদপ্তরে যারা সত্ ও নিষ্ঠাবান, তাদের বলা হয় কাজ জানে না। যারা ঘুষসহ নানা অনিয়মের সাথে জড়িত তারা সেখানে ভাল কর্মকর্তা। এভাবেই চলছে অধিদপ্তর। গত অক্টোবরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম নার্সদের পদোন্নতি ও সিলেকশন গ্রেড নিয়ে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তা এক সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছিলেন। গত বৃহস্পতিবারও স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ বিষয়ের অগ্রগতি জানতে চান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। নার্সদের পদোন্নতি ও সিলেকশন গ্রেড নিয়ে সরকার বিরোধী কতিপয় কর্মকর্তা নানা অজুহাত দেখিয়ে বিলম্ব করছেন। তারা নার্সদের আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে আসছেন। তবে আন্দোলন হবে এ সকল ষড়যন্ত্রকারীর বিরুদ্ধে বলে নার্স নেতৃবৃন্দ জানান।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অদিধপ্তরের মহাপরিচালক তন্দ্রা শিকদার জানান, মন্ত্রণালয় থেকে নার্সদের সিলেকশন গ্রেড ও পদোন্নতি প্রদানের জন্য যে ধরনের কাগজপত্র চেয়েছে সব সেখানে পাঠানো হয়েছে। এখন নার্সদের সিলেকশন গ্রেড ও পদোন্নতির বিষয়টি সম্পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। অধিদপ্তরের কিছু করার নেই।
