লঙ্কাকাণ্ডের পর  ডিমকাণ্ড

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৩, ০৬:৩০

ডিমের বাজারে আগুন নিভছে না। বাণিজ্যমন্ত্রী বললেন, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় চাইলে ডিম আমদানি করতে পারবে। ডিমের ব্যাপারীরা নিশ্চয়ই হাসছেন এমন চাওয়াচাওয়ির ঘোষণায়। বাস্তবতা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের ঊর্ধশ্বাস। প্রতিটি নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়ে মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে। ঈদের পর অন্তত উচ্চমূল্যেও স্থিতিশীলতা ছিল নিত্যপণ্যের বাজারদরে। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই হঠাত্ করে বেড়ে গেল ডিমের দাম। শুধু বৃদ্ধিই নয়, লাফিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা ডজনে গিয়ে ঠেকে। কারণ কী?

ক্রেতার মাথায় হাত। পাড়ার মুদিদোকানির সঙ্গে বচসা। অধিক দামে ডিম নিয়ে ফেরা কিংবা পকেটে ঘাটতি হওয়ার কারণে ডিম ছাড়াই বাসায় ফেরা। কেন দাম বাড়ল—এমন প্রশ্ন আর এখন সাধারণ ক্রেতারা করতে উত্সাহ বোধ করেন না। এতে লাভ নেই। বিক্রেতারা যা চাইবেন, তা দিয়েই কিনতে হবে, না হলে নাই। তার পরেও বচসা এবং কারণ জানতে চাওয়া দুই-এক জনের।

প্রশ্ন করা সম্ভব, কিন্তু জবাব দেবে কে? মুদিদোকানি বলবেন—পাইকারের কাছ থেকে যে দামে কিনব সেই হারেই তো বিক্রি করব। কথা সত্য। মুদিদোকানির কিই-বা করার আছে!

নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সাধারণত উত্পাদনকারীরা উত্পাদন ব্যয় বাড়ার কথা বলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়তো সত্যও হয়। কিন্তু ডিমের হঠাত্ দাম বাড়ার কারণ তো এটা নয়। মুরগির খাদ্যমূল্য হঠাত্ নতুন করে বাড়েনি সাম্প্রতিক সময়ে। বরং ডিম ব্যবসায়ীদের গত বছর সরকার থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আরো ছাড় আছে পোলট্রি শিল্পের জন্য। এই বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়ার উদ্দেশ্য ভোক্তা পর্যায়ে সুবিধা প্রদান। অথচ উত্পাদনকারীরা রাষ্ট্রীয় সুবিধা হাতিয়ে নিয়ে ভোক্তাদের বঞ্চিত করছেন প্রকাশ্যেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ, সরকারের সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারগুলো এক্ষেত্রে ভোঁতা হিসেবে প্রমাণ দিয়েছে। তাদের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। তাদের নীরব পরামর্শ যেন চুপ করে ডিম ব্যাসায়ীদের গণনির্যাতন সয়ে যাওয়া।

খুচড়া বিক্রেতা আর ক্রেতারা যখন একে অন্যের মাথায় ডিম ভাঙছেন, ঐ মুহূর্তে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বাজার পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির সদস্যরা বৈঠকে বসেছিলেন উত্পাদনকারী ও বিক্রেতাদের নিয়ে। এটা-ওটা নানামুখী কথা বলে বৈঠক শেষ। বাজার চাহিদার তুলনায় উত্পাদনে কোনো ফারাক নেই। এ কথা তারাও স্বীকার করলেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা পোলট্রি মালিকেরা নিচ্ছেন, কিন্তু এর সুফল কেন ক্রেতারা পাচ্ছেন না, এর কোনো উত্তর নেই পোলট্রি মালিকদের কাছে। ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই বলছে, বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতার কারণে ডিমের মতো অন্যান্য পণ্যেরও মূল্য বেড়ে যায়। এবং ডিমের সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জন্যও তারা বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন। বিষয়টা অনেকটা এমন—ট্রাফিক পুলিশ কেন ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীর প্রতি নরম কথা বলল, এটা তার দোষ; কিন্তু যে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করল, সে ফেরেশতা। তার দোষ নেই।

ব্যবসায়ীদের বৃহত্তম সংগঠন এফবিসিসি  মনিটরিংয়ের কথা বললেও বলেননি ডিম উত্পাদনকারী ও বিক্রেতাদের যোগসাজশে এই দুর্গতি কেন তৈরি করা হলো। সেই ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের ভূমিকায় দেখা যায় ডিম উত্পাদনকারী থেকে শুরু করে পাইকারী ব্যবসায়ীদের। এদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কথা হচ্ছে, ডিম বাজারজাতকরণে অতিমুনাফা ও ত্রুটিপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির ফলে ডিমের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, অতি মুনাফালোভীরা বাজারে নামার সঙ্গে সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হলো না কেন? শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ চলাকালেই কেন নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? এর জবাব কে দেবে? সরকারের হাতিয়ারগুলোর ব্যর্থতা ঢাকার যত যুক্তিই দেখানো হোক না কেন, আখেরে দায়টা কিন্তু সরকারের ওপরই বর্তায়।

তাত্ক্ষণিক তদারকি ও ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যর্থতার জন্য কি কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে? এর জন্য যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, তা কি ধীরগতির ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নিরসন সম্ভব হবে?

ভারতের বাজারে বাংলাদেশি টাকায় মাত্র ৭৫-৮০ টাকা ডজন বিক্রি হয় ডিম। আমাদের এখানে পোলট্রি ফিডের দাম বেশি হওয়ার কারণে এর দাম কত হতে পারে? ক্রেতাদের অনেকেই ভারতের দামের সঙ্গে বাংলাদেশের ডিমের দাম তুলনা করেন। এর যৌক্তিকতা নিয়ে কথা হতে পারে। তার পরও বলতে হবে, ওদের পোলট্রি ফিডের দাম আমাদের চেয়ে অনেক কম। যে কারণে তারা কম দামে ডিম বিক্রি করতে পারে। কিন্তু আমাদের এখানে তা নয়। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি ডিমের উত্পাদন ব্যয় ১০ টাকার কম। সেই অনুপাতে উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়মূল্য যদি ১১ টাকা ধরা হয়, তাহলে বাজারে কি সেটা ১৫০ টাকার বেশি হওয়ার কথা? বাস্তবতা তো সবাই জানেন।

হয়তো শিগিগরই ডিমের দাম কমবে। আবার হয়তো ১৫০ টাকা কিংবা এর চেয়ে কমও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তত দিনে সরকারের ব্যর্থতার দুর্নাম যা হওয়ার হয়ে গেছে। এমনিতেই বিভিন্ন পণ্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার অনেক ওপরে। তারপর যদি সেটাও অতিক্রম করে, তখন সাধারণ মানুষ সরাসরি সরকারকেই দায়ী করে। একবারও ভাবে না, এর পেছনে সিন্ডিকেট সক্রীয়। সেক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ভাঙার কাজটি সরকারকেই করতে হবে। মাত্র মাস দুই আগে ঈদের সময় কাঁচা মরিচের দাম নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে বাজারে। মানুষকে ভুগিয়ে, সরকারের দুর্নাম বাড়িয়ে সেই কাঁচা মরিচ এখন দেড় শ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অথচ অতিবৃষ্টিতে কাঁচা মরিচের ঘাটতি হওয়ার কথা। এ কারণে দামও চড়া হওয়ার কথা। বাস্তবতা হচ্ছে, কাঁচা মরিচ এখন ক্রয়সীমার মধ্যে। ডিমের ব্যাপারটাও কাঁচা মরিচের মতোই। ঘোড়ার ডিমের মতোই কি ডিমের অবস্থাও হবে?

তবে স্বীকার করতে হবে, বর্ষায় ডিমের চাহিদা একটু বাড়ে। অন্যদিকে তুলনামূলক উত্পাদনও কিছুটা কমে, যে কারণে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি পড়ে। এ বছর যে দাম বেড়েছে, তার সঙ্গে কি এর সংশ্লিষ্টতা আছে? প্রতি মাসে ৬ কোটি ডিমের চাহিদা, বাজারের মজুত ও সরবরাহ এই চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবস্থানে আছে। তাহলে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা অবশ্যই ইচ্ছাকৃত।

এমন সংকট তৈরির জন্য সরকারের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। সরকার তেমন উদ্যোগী কি না, তা ভেবে দেখার দরকার আছে। গত বছর কিছু মামলা হয়েছিল ব্রয়লার মুরগি খামারি ও ডিম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। ঐ মামলাগুলো কি নিষ্পত্তি হয়েছে? হয়েছে এমন সংবাদ চোখে পড়েনি। অন্যায় বন্ধের প্রথম শর্ত হচ্ছে সুষ্ঠু তদারকির ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত শর্ত হচ্ছে, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। অসত্ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে নিতে যদি দীর্ঘ সময় যায়, অপরাধীরা এমনিতেই আশকারা পায়। সংগত কারণেই বলা যায়, বিচারহীনতাও কমবেশি দায়ী এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য।

সরকারের দুর্নাম যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরা দরকার। মানুষের দুর্ভোগ যেন আর না বাড়ে।

লেখক:মুক্তিযুদ্ধ-গবেষক ও সাংবাদিক

 

ইত্তেফাক/এমএএম