বিএমডিসি ও ডিজি মেডিকেল এডুকেশনের নতুন ভর্তি প্রক্রিয়ায় অস্তিত্ব সংকটে বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষা

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩, ১০:৪৮

চট্টগ্রাম হালিশহরের মুহাম্মদ আবু সুফিয়ানের মেয়ে সানজিদা আকতারের স্বপ্ন ছিল চিকিত্সক হবেন। কিন্তু দূরবর্তী পটুয়াখালি সরকারী মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় মেয়েকে নিজ এলাকার কোনো প্রাইভেট মেডিকেলে পড়াবেন মর্মে সিদ্ধান্ত নেন সুফিয়ান। কিন্তু বিধিবাম, তিনি জানতে পারলেন এবার ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির নতুন অটোমেশন পদ্ধতি চালুর কারনে তাদের এই সিদ্ধান্ত আর কাজে আসবেনা। অধিদপ্তর খুদে বার্তার মাধ্যমে নিশ্চিত করবে তার মেয়ে কোথায় পড়বে। এখন তার দুশ্চিন্তা খুদে বার্তায় দূরে এবং ব্যায়বহুল কোনো কলেজে ভর্তি নিশ্চয়ন হলে তার সন্তানের মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন অংকুরেইনা বিনষ্ট হয়ে যায়!

পরে জানা গেল আবু সুফিয়ান যে আশংকা করেছিলেন বাস্তবে তাই ঘটেছে। খুদে বার্তায় তার মেয়ে যে মেডিকেল পেয়েছিলেন সেটা অন্য জেলার এবং সেখানকার শিক্ষা ব্যায় তার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। একেতো অতিরিক্ত খরচ অন্যদিকে হলে বা ভাড়া বাড়িতে থেকে পড়ার বিরাট অংকের খরচ এবং মেয়েকে নিরাপত্তার কারনে যেখানে পটুয়াখালিতে সরকারীতে দেননি সেই দুরগতিই তাকে গাটের অর্থ ব্যায় করে বহন করতে হবে। তারচেয়ে বরং সরকারী ব্যায়ে পটুয়াখালিই ভালো ছিল! সবচেয়ে দুংখজনক হচ্ছে বিএমডিসি কর্তৃক প্রণিত প্রাইভেটে ভর্তিরহুট করে চাপিয়ে দেয়া নতুন অটোমেশন পদ্ধতি’র ব্যাপারটি আগে জানতে না পারায় মেয়ে যেখানে টিকেছিল সেটাও সময়মত উদ্যোগ না নেয়ায় তাকে হারাতে হয়েছে। সব মিলিয়ে মেয়েটির চিকিত্সক হওয়ার ন্বপ্নই ভেস্তে গেল। বিএমডিসি’র দেয়া প্রেসক্রিপশন ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের হুট করে চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের বলি হয়েছে ঐ শিক্ষার্থী তথা গোটা পরিবারটি। শিক্ষা নিয়ে এমন ছিনিমিনির স্বীকার গত ১৫ বছরে এ দেশের মানুষ কখনো হয়নি। 

অনুরুপ ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়া কিশোরগঞ্জের এক শিক্ষার্থী বলেন, তার পছন্দ ছিল নিজ জেলার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। কিন্তু তাকে ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তির জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। কিন্তু এখানকার ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন। এ কারণে তিনি মেডিকেলে না পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

সংকট এখানেই শেষ নয়, নতুন ভর্তি পদ্ধতির কারনে অস্বচ্ছল ও মেধাবীদের ৮১ আসন এখন শূন্য। অর্থাৎ বিনা খরচায় পড়া আসনও শূন্য পড়ে আছে। যা দুংখজনকতো বটেই, অত্যন্ত বিরল ঘটনাও। এবার ইত্তীর্ন হওয়া ৪৯,০০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৬,৬০০জন মেডিকেলে পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তন্মধ্যে ১,৬০০ অস্বচ্ছল ও মেধাবী। ডেন্টালের অবস্থা আরো ভয়াবহ, যেখানে ১৫০০ সিটের বিপরীতে মাত্র ৫০০ জন আবেদন করেছে। 

উল্লেখ্য, আগে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতবাছাই করে পছন্দের মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতো।কিন্ত চলতি বছর উক্ত সুযোগ রহিত করেনতুন অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হয়। এবার প্রথমে শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য পাঁচটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পছন্দক্রম রাখা হয়। পরে এই নিয়মও বদলে ফেলে ছাত্রদের জন্য ৬০টি এবং ছাত্রীদের জন্য ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের তালিকা করা হয়।

নতুন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী আবেদনের পর একটিনির্দিষ্ট মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে তাকে জানানো হয়। ওই কলেজে ভর্তি হতে চাইলে ১০০ টাকা দিয়ে ভর্তির নিশ্চয়ন করতে বলা হয়। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী পছন্দের প্রতিষ্ঠান পাননি। পছন্দের ব্যাপারটি আর্থিক সংগতির সাথে সংশ্লিষ্ট বিধায় খুদে বার্তায় কলেজ নির্ধারণ করলে চলবেনা। কারন, ব্যায়ের ব্যাপারটি মেডিকেল কলেজ ভেদে তারতম্য থাকায় শিক্ষার্থীরা সামর্থ অনুযায়ী কলেজ নির্বাচন করেন। তাই নতুন নিয়মে শিক্ষার্থীদের যে কলেজে সুযোগ দেয়া হয়েছে বা পছন্দের তালিকায় যে মেডিকেল কলেজের নাম আছে, সেখানকার শিক্ষা ব্যয় শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়েও ভর্তি হতে পারেননি।

২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত ১০ মার্চ। ফলাফল প্রকাশিত হয় ১২ মার্চ। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি শেষে বেসরকারিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারি-বেসরকারি সব মেডিকেল কলেজে ক্লাস শুরু হয়েছে ২৪ জুলাই। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি বেশ কিছু মেডিকেল কলেজেই আসন পূরণ হয়নি। ভর্তি কার্যক্রমও শেষ হয়নি। কারণ হিসেবে সংশিষ্ট ব্যক্তিরা দায়ী করছেন বিএমডিসি’র অদূরদর্শী নিতিমালা ও ডিজি হেলথের চাটুকারী সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি না নিয়েই অটোমেশন পদ্ধতি চালু করাকে।

এককথায় নতুন নিয়মে সংকটে পড়েছে বেসরকারি চিকিত্সা শিক্ষা খাত। কাঙ্খিত মেডিকেল কলেজ না পেয়ে ভর্তিতে অনীহা, আবার ভর্তি হলেও মাইগ্রেশন পদ্ধতিতে কলেজ বদল করায় আসন পূরণ হয়নি বেশিরভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজের। বেশ কিছু আসন শূন্য রেখে ক্লাসও শুরু করতে হয়েছে কোনো কোনো বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে। এমনকি অস্বচ্ছল ও মেধাবী কোটাও পূরণ হয়নি তরিঘরি করে নেয়া এই নতুন সিদ্ধান্তের কারনে। 

বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ডা. মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, গত ২৫ বছরে এই প্রথম বিএমডিসির অদূরদর্শি ও হুট করে চাপিয়ে দেয়া নতুন অটোমেশন পদ্ধতির ফলে ৭৩১ আসন এখনও পূর্ন হয়নি। এমনকি ৪৯০০ সিরিয়ালের তথাকথিত অস্বচ্ছল ও মেধাবীদের জায়গা করে দিয়েছে ডিজি হেলথ। এতে নতুন এই  সিদ্ধান্ত তথা ভর্তি পদ্ধতি যে চরম ভ্রান্ত ও নৈরাজ্যকর তা প্রমানিত হয়েছে। 

তিনি বলেন, কলেজগুলো গত ১৫ বছর মন্¿ণালয়ের ডিজি হেলথ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার অস্বচ্ছল ও মেধাবীদের মেধাক্রম তালিকা প্রণয়ন করতো। কিন্তু এবার বিএমডিসির নির্দেশনায় ডিজি হেলথ কোন মেধাক্রম তথা সিরিয়ালের তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়াল খুশি মত এই মেধা তালিকা নিশ্চিত করছে।  

এবছর ৩০০ এর অধিক মেডিকেল শিক্ষার্থী বিএমডিসির অনুমোদন নিয়ে বিদেশে পড়তে চলে গেছে। ভয়াবহ ডলার সংকট তথা অর্থনৈতিক এই সংকটের মূহুর্তে শতশত কোটি নিজস্ব অর্থ বিদেশ পাচার হয়ে গেল। ভর্তির এসব ভ্রান্ত পদ্ধতি তথা সিদ্ধান্তের পেছনে সময় নষ্ট না করে বরং সংশ্লিষ্টদের সামান্য চেষ্টা ও তত্পরতায় এসব শতভাগ না হলেও অনেকাংশই রোধ করা যেত এবং দেশের অর্থ পাচার না হয়ে দেশেই থাকতো। 

উল্লেখিত বিষয় ও অটোমেশন পদ্ধতিসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনাকে হযবরলতো বটেই এই খাতের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় ভয়ংকর বাধা বলে অভিহিত করেছেন কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন, নতুন অটোমেশন পদ্ধতি শিক্ষার্থী ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ উভয়কেই সংকটে ফেলেছে। আসন সংখ্যানুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি হতে না পারায় বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করলে মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে বলা হয়, ‘বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তিতে এবারই প্রথম অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বিষয়টি অনেকের কাছে নতুন। এ জন্য কিছু সমস্যা হয়েছে। আশাকরি, ভবিষ্যতে এ সমস্যাগুলো থাকবেনা। কিন্তু  প্রশ্ন হচ্ছে হঠাত্ চাপিয়ে দেয়া এই নতুন সিদ্ধান্ত বা নিয়মের কারনে প্রচুর শূন্য আসন নিয়ে ক্লাস শুরু করা কলেজগুলোর শিক্ষাকার্যক্রম ভবিষ্যত্ আসার আগেই যদি মুখ থুবরে পড়ে তাহলে ভবিষ্যত্ কোথায়, কোন দিকে যাবে এবং ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত্ইবা কি হবে! 

ক্লাস শুরুর আগে ‘অধিদপ্তরের অন্য শংশ্লিষ্টরা বলেন, যেসব বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এখনো নির্ধারিত আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারেনি, সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এক মাসের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান করা হবে। কিন্ত একমাস পেরিয়ে গেলেও সংকট নিরসনে কার্যত কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো কলেজগুলোকে নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ক্লাস শুরুর নির্দেশনা দেয়া হয়। 

বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষগণ বলেন, অনেক শিক্ষার্থী স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তালিকানুযায়ী ভর্তি হলেও পরে মাইগ্রেশনের মাধ্যমে অন্য মেডিকেলে চলে গেছেন। এতে ওই আসন আবার শূন্য হয়ে গেছে। প্রথমত আসন সংখ্যার বিপরীতে শিক্ষার্থী কম দেওয়া, পরে মাইগ্রেশনের মাধ্যমে আরও আসন খালি হওয়ায় বেশিরভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজেরই আসন পূরণ হয়নি। এ যেন মড়ার উপর খাড়ার ঘাঁ। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকটে পড়বে। যার প্রভাব পড়বে শিক্ষা কার্যক্রমেও। এককথায়  শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে। যার প্রভাব পড়বে পুরো বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষায়।  

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মুবিন খান বলেন, অটোমেশন প্রক্রিয়ায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তিতে সংকট তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো কলেজ শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। সবার মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। এ জন্য পুরোটাই বিএমডিসি ও ডিজি হেলথ দায়ী।

প্রসঙ্গত, সারা দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাবোর্ডের অধীভূক্ত কলেজগুলোর ভর্তি কার্যক্রমকে অনলাইনে অটোমেশন পদ্ধতিতে শুরু করার প্রাক্কালে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে আলোচনা ও সমর্থন এবংদীর্ঘ মেয়াদে এর প্রশিক্ষণ ও প্রচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর ক্রমান্বয়ে তা বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্ত মেডিকেলের মত একটি গুরুত্বপূর্ন তথা স্পর্শকাতর বিষয়ে চলতি ভর্তি মৌসুমেই কোনরকম পূর্ব প্রস্তুতি ব্যাতীত তরিঘরি করে অটোমেশন পদ্ধতি বাস্তবায়নের বিষয়টি সত্যিই বিস্নয়কর। মেডিকেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন ব্যায়বহুল এই শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন এই ভর্তি পদ্ধতি তথা প্রক্রিয়ার ব্যাপারে অংশিজন তথা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জনমত ও প্রস্তুতি সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হত। তবে মেডিকেল শিক্ষার্থী ও কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি নতুন ভর্তি প্রক্রিয়া কার্যত কোন সুফল নয় বরং জটিলতাই বাড়াবে। তাই মেডিকেল কলেজ ভর্তি প্রক্রিয়ায় পূর্বের নিয়ম তথা পদ্ধতি বলবত রাখার জোর দাবি তাদের।

 

.