প্রসঙ্গ: সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩, ০৭:৩০

নিঃসন্দেহে আমাদের দেশে এখন সর্বাধিক উচ্চারিত শব্দগুলি হইল—সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন। পত্রপত্রিকা, চায়ের দোকান হইতে শুরু করিয়া ঘরোয়া আড্ডা অথবা পাঁচতারকা হোটেল, এমনকি বিদেশি যেই সকল প্রতিনিধি আসিতেছেন, তাহাদেরও মুখে উচ্চারিত হইতেছে—সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন। আমরাও সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ঘোরতর সমর্থক। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশসমূহে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন জিনিসটা কী এবং তাহা শেষ কবে আমরা দেখিয়াছি? যেই রকম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহাকে কি নির্বাচন বলা যায়? আমরা দীর্ঘকাল ধরিয়া দেখিয়া আসিতেছি, উন্নয়নশীল দেশসমূহের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যবহার করা হইয়া থাকে; এবং তাহা দিনে দিনে বাড়িতেছে। যেই দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন সকল বাহিনীই, সকল অফিসই দলীয় কর্মীদের মতো আচরণ করিয়া থাকে, অথবা তাহাদের দিয়া দলীয় কর্মীদের মতো আচরণ করানো হইয়া থাকে। আর সেই কারণেই রাজনৈতিক অঙ্গনে কাহার কতটুকু ওজন, তাহা পরীক্ষার সুযোগ মিলে না। একজন স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ যখন সুস্থ থাকেন, তখনো নানাবিধ স্বাস্থ্যবিষয়ক পরীক্ষা করাইয়া থাকেন। লিপিড প্রোফাইল, ইসিজির মতো সাধারণ পরীক্ষা, কিডনি-লিভারের অবস্থা কী—তাহা পরীক্ষা করাইতে হয়। ইহাতে বোঝা যায়, তাহার শরীরের অবস্থা ভিতরে ভিতরে কী রকম রহিয়াছে। ঠিক তেমনি একটি পরীক্ষা রাজনৈতিক মাঠেও প্রয়োজন রহিয়াছে। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে যাহারা ক্ষমতায় থাকেন, তাহারা কখনোই কোনো পরীক্ষা করান না। পরীক্ষার ধারেকাছেই যাইতে চাহেন না। তাহারা ভিতরের প্রকৃত অবস্থা দেখিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন। কারণ তাহারা জানেন, পরীক্ষা করাইলে ভয়ানক রোগ ধরা পড়িবে। অথচ ইহারাই যখন ক্ষমতার বাহিরে থাকেন, তখন ‘মারিল’, ‘ধরিল’, ‘সকল গেল’ বলিয়া চিৎকার করিতে থাকেন। এত চিৎকার করেন যে, তাহাতে প্রতিবেশীরও ঘুম নষ্ট হইবার উপক্রম হয়!

একটি দেশে প্রধানত তিনটি সাংবিধানিক অর্গান থাকে। এই তিনটি হইল— লেজিসলেটিভ, জুডিশিয়ারি ও এক্সিকিউটিভ। অর্থাৎ আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ। আধুনিককালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বহু হিসাবনিকাশ করিয়া এই অর্গানগুলি করিয়াছিলেন, যাহাতে তিনটি বিভাগের দ্বারা রাষ্ট্রে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়। একটি রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে চলিতে হইলে এই তিনটি অর্গানের সমন্বয় থাকিতে হয়। আবার তিনটি অর্গানের কর্মপদ্ধতি এবং কর্ম অঞ্চলও আলাদা। কিন্তু দেশের সাংবিধানিক এই বিভাগগুলিকে একই রকম বিবেচনা করিয়া যদি কেহ ক্ষমতায় থাকিবার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করিতে শুরু করেন, তাহা হইলে সেই দেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলি সঠিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকিতে পারে না। যাহারা উন্নয়নশীল বিশ্বে ক্ষমতায়  থাকেন বা ক্ষমতায় ছিলেন, এখন নাই—তাহাদের সকলেরই ভাবিয়া দেখা প্রয়োজন—ভূত ও ভবিষ্যৎ চিন্তা তাহাদের মধ্যে আছে কি না। উন্নয়নশীল দেশের প্রবণতা হইল, সকল কিছু সহজে অর্জন করা। আর তাহা করিতে গেলেই বাছিয়া লইতে হয় এমন সকল পথ, যাহা সর্বজন দ্বারা সমর্থিত নহে। রাজনৈতিক অঙ্গনও ইহার ব্যতিক্রম নহে। তবে ইহা প্রত্যেকের মনে রাখা জরুরি যে, পৃথিবী সর্বদাই পরিবর্তনশীল। আজ যাহা দেখা যাইতেছে না, আগামীকাল তাহা দৃশ্যমান। আজ যাহা দৃশ্যমান, আগামীকাল তাহা তিরোহিত। সুতরাং উন্নয়নশীল বিশ্বে যিনি বা যাহারা রাষ্ট্রের অর্গানগুলির ক্ষতিসাধন করিয়া থাকেন, তাহাদের পরিণতির কথা বিবেচনায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন