রাজনীতিবিদ, সমাজসেবী ও নারী নেত্রী আইভি রহমানের আজ ১৯তম মৃত্যুবাষির্কী। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ঢাকার সিএমএইচে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ২৪ আগস্ট (২০০৪) মৃত্যুবরণ করেন। তার জন্ম ১৯৪৪ সালে। তার পিতা জালাল উদ্দিন আহম্মদ ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। তিনি এসএসসি বাংলাবাজার হাই স্কুল, স্নাতক ইডেন কলেজ এবং এমএ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আমার সঙ্গে তার সরাসরি পরিচয় ও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয় ১৯৮২ সালে। আর তা আমৃত্যু অক্ষুণ্ন থাকে। তার সঙ্গে দীর্ঘ ২২ বছর কাজ করার সময়ের অনেক স্মৃতি আজও মনে পড়ে।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির (বিএনএসবি) সাধারণ সম্পাদিকা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলা সম্পাদিকা। বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদিকা, পরে সহসভানেত্রী। সভানেত্রী ড. নীলিমা ইব্রাহিমের মৃত্যুর পর তিনি মহিলা সমিতির সভানেত্রী হন। আবার ২০০১ সাল পর্যন্ত জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও আইভি আপা (আমৃত্যু) বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির (বিএনএসবি) যথাক্রমে চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদিকা ছিলেন (১৯৭৬-১৯৮২ সময়টুকু ছাড়া)। অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনও গত বছর ৩১ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
১৯৮২ সালে একদিন আমাকে তার বাসায় যেতে বলেন। আইভি আপা তখন সপরিবারে মোহাম্মাদপুর ইকবাল রোডে থাকতেন। সকালে আমি তার বাসায় গেলে তিনি স্মিত হেসে দরজা খুলে দিয়ে বসতে বলে ভেতরে চলে গেলেন। ড্রয়িং রুমের ওয়ালে বঙ্গবন্ধুর একটি বড় সাইজের পোর্ট্রেট টাঙানো। গভীরভাবে মগ্ন হয়ে ছবিটি দেখছিলাম আর ভাবছিলাম—অসীম সাহসী, দৃঢ়চেতা, ভীষণ আত্মবিশ্বাসী, বিশাল হূদয়ের এ মানুষটি (বঙ্গবন্ধু) কেন মাত্র ৫৫ বছর বয়সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। এ সময় আইভি আপার ডাকে সংবিত্ ফিরে পেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি আপা আমার জন্য নাস্তার প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন—একদিন বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে নিয়ে কী মনে করে ছবিটি দিয়ে ছিলেন জানি না । সে দিন আপার সঙ্গে আরো অনেক কথা হলো।
পরবর্তী সময়ে তাদের গুলশানের বাড়িতে গিয়েছি। বাড়িটি গুলশান লেকের পশ্চিমে ১০৮ নম্বর রোডে। আমার বাসা লেকের পূর্ব পাড়ে পাঁচ মিনিটের পথ। বিভিন্ন স্থানে যাওয়া-আসার সময় প্রায়ই এই বাসার পাশ দিয়ে যেতে হয়। স্বভাবতই বাসার দিকে তাকাই। মনে পড়ে কত দিনের কত স্মৃতি।
আইভি আপার স্বামী জিল্লুুর রহমান যখন মন্ত্রী হলেন তখন মন্ত্রীপাড়ার সরকারি বাড়িতে উঠলেন। হেয়ার রোডের দোতলা বাড়ি। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও মন্ত্রীর সেই বাড়িতে যেতে আমাদের জন্য কোনো অনুমতি লাগত না বা ঢোকার সময় আমাদের জন্য কোনো রকম চেকিংও ছিল না। আমরা সরাসরি চলে যেতাম। কারণ আমরা আইভি আপার লোক। দোতলায় যাওয়ার পথে নিচতলায় জিল্লুর রহমানের বসার রুমে ঢুকে তাকে পেয়েছি। ছালাম বিনিময়ের পরে তিনি হাসিমুখে বলতেন ‘আইভির কাছে এসেছ? ওপরে যাও—আইভি আছে’। সেসব স্মৃতি মনে পড়লে এখনো দুই জনের জন্যই চোখে জল আসে। জিল্লুুর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি তখন বঙ্গভবনে (রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন) যেতাম আইভি আপার মৃত্যুবার্ষিকীর মিলাদে।
তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও পার্শ্ববর্তী কটিয়াদিতে প্রায় দুই/এক বছর পরপরই বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির (বিএনএসবি) পরিচালনায় চক্ষু শিবির হতো। একবার ভৈরব ও পরে আর একবার কটিয়াদিতে চক্ষু শিবির উদ্বোধন করতে জিল্লুুর রহমান, সমিতির প্রয়াত চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদিকা আইভি আপাসহ আমিও গিয়েছিলাম। চক্ষু শিবির উদ্বোধন শেষে আমরা সবাই তাদের ভৈরবের বাড়িতে দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে সন্ধ্যায় একসঙ্গে ঢাকা ফিরি। ভৈরবের বাসার দোতলায় বসে খাওয়ার পরে আপার সঙ্গে তার পারিবারিক বিষয় অনেক কথা হয়।
একবার পটুয়াখালীতে বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য জমি নির্ধারণ করতে (Site Selection) চেয়ারম্যান মহোদয়, সাধারণ সম্পাদিকা, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন (আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ও আমি লঞ্চে করে পটুয়াখালীর উদ্দেশে ঢাকা থেকে বরিশাল যাই। সেখানে আইভি আপার দেবর বরিশালের তত্কালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (ডাক নাম রোজ) সরকারি বাংলোয় সবাই নাস্তা করি। পরে গাড়িতে করে পটুয়াখালী গিয়ে হাসপাতালের জন্য বর্তমান স্থানটি নির্ধারণ করা হয়।
একবার খন্দকার মাহবুব হোসেন স্যার ও আইভি আপাকে নিয়ে ফরিদপুর চক্ষু শিবির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে মানিকগঞ্জের কাছাকাছি যেতেই গাড়িতে আগুন ধরে যায়। তড়িঘড়ি গাড়ি সাইড করে আমরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে যাই। পরে পানি এনে আগুন নিভানো হয়। আমরা বাসে করে মানিকগঞ্জ চলে যাই। বড় কোনো ক্ষতি না হওয়ায় ড্রাইভার আবদুল্লাহ কোনো মতে গাড়ি মানিকগঞ্জে নিয়ে গিয়ে মেরামত করে পুনরায় আমাদেরকে ফরিদপুর নিয়ে যায়; কিন্তু আল্লাহর রহমতে পথে আর কোনো অসুবিধা হয়নি।
আইভি আপার মৃত্যুর পর বিএনএসবি পরিচালিত ঢাকার মিরপুরে ‘খন্দকার মাহবুব হোসেন চক্ষু হাসপাতালের’ মহিলা ওয়ার্ড তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। ওয়ার্ডের সামনে বড় করে নাম ফলক লাগানো আছে—‘আইভি রহমান মহিলা ওয়ার্ড’। পাশেই আইভি আপার প্রতিকৃতি। সমিতির বর্তমান কোষাধ্যক্ষ আবদুল বাসেত আকনসহ আমরা প্রতি বত্সর আইভি আপার মৃত্যুবার্ষিকীতে বিএনএসবির পক্ষ থেকে তার বনানীর কবরস্থানে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করি এবং তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
স্বাধীনতা আন্দোলন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ, নারীদের কর্মসংস্থান, রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন আন্দোলনে আইভি রহমানের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, খন্দকার মাহবুব হোসেন চক্ষু হাসপাতাল, বিএনএসবি, মিরপুর-১, ঢাকা
