গত ১৭ই আগস্ট প্রধানমন্ত্রী সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। উদ্বোধনের পরই সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। পত্রিকায় এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে। অনেকেই এর ভালো ও মন্দ দিকগুলো তুলে ধরছেন। তবে বেশির ভাগই এই কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করছেন। এ বিষয়ে কারো সন্দেহ ও দ্বিমত নেই যে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমটির প্রবর্তন দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জন্য শেষ জীবনে আর্থিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে এই অতি জরুরি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিটি চালু করার পেছনে একজন অর্থনীতিবিদের অবদান অপরিসীম। তিনি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি হিসাবে সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনায় তিনি বিষয়টি প্রায় প্রতি বছরই তুলে ধরেছেন। জোর তাগাদা দিয়েছেন এটি বাস্তবায়নের। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০১৯-২০-এর ৩২ পৃষ্ঠার সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বেষ্টনীর অধীন ৭ দশমিক ৩৮ ক্রমিকে প্রস্তাব করা হয়েছে, ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ‘প্রবীণ নীড়’ গড়ে তোলা সময়ের দাবি। দেশে এক দিকে যেমন মানুষের আয়ুষ্কাল বাড়ছে, তেমনি বর্ধিষ্ণু পরিবার ভেঙে অণু-পরিবার (nuclear family) বাড়ছে আর এর ফলে অনেক প্রবীণ মানুষ বিশেষত দরিদ্র-নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রবীণদের আশ্রয়হীন হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। আমরা মনে করি, প্রবীণ মানুষদের জন্য ‘প্রবীণ নীড়’ (‘বৃদ্ধাশ্রম’ নয়) গড়ে তোলার বিষয়টি বাজেটে থাকা জরুরি।’ বাজেট প্রস্তাবনার ৭ দশমিক ৪০ ক্রমিকে প্রস্তাব করা হয়েছে, আমরা যেহেতু উন্নয়নে অগ্রগামী, সেহেতু এখন থেকেই সর্বজনীন পেনশন প্রদানের বিষয় নিয়ে ভাবনা জরুরি। বিষয়টি আসন্ন বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য আমরা সুপারিশ করছি। একইভাবে, সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০২০-২১-এর ২০ নম্বর ক্রমিকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘সর্বজনীন পেনশন বিষয় নিয়ে এখনই ভাবনা জরুরি। বিষয়টি, আসন্ন বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।’ একইভাবে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমটি অতি দ্রুত চালুর জন্য প্রস্তাব করা হয়। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ওয়েবসাইটে আপলোডকৃত সমিতির প্রতি বছরের বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনাগুলো দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিবার্চনি ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’ ও ‘রূপকল্প ২০২১’ প্রণেতাদের অন্যতম একজন হলেন অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। ঐ নির্বাচনি ইশতেহারে দেশের বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে একটি টেকসই ও সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় বৃদ্ধকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয়ভাবে একটি সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি প্রবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে সরকার কর্তৃক প্রণীত জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রে একটি ব্যাপকভিত্তিক সমন্বিত অংশগ্রহণমূলক পেনশন-ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা বা উদ্যোগ কেউ নেয়নি। একমাত্র বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনায় এটি বাস্তবায়নে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অধ্যাপক আবুল বারকাত ‘সার্বজনীন পেনশন’ বিষয়টির ধারণাত্মক কাঠামো বিনির্মাণ করেই ক্ষান্ত হননি, একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য সর্বজনীন পেনশনের আর্থিক হিসাবপত্রও করে দেখিয়েছেন যে, আগামী পাঁচ অর্থবছরে-২০২৩/২৪ থেকে ২০২৭/২৮-মোট ৩ লাখ কোটি টাকা অর্থাত্ বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে। এসবের পাশাপাশি তিনি এ-ও দেখিয়েছেন যে, সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি বাস্তবায়নে অর্থের উত্স হিসেবে কালোটাকা ও অর্থপাচার উদ্ধার থেকে শুরু করে সম্পদ কর ও অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯। তারা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জনশুমারি বলছে, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম। অন্যদিকে প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি। জাতিসংঘের জনসংখ্যা উন্নয়ন তহবিলের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ২০২৫-২৬ সালে প্রবীণের সংখ্যা হবে ২ কোটি। ২০৫০ সালে ঐ সংখ্যা হবে সাড়ে ৪ কোটি, যা তখনকার জনসংখ্যার ২১ শতাংশ হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতিতে নির্ভরশীল মানুষের বর্তমান হার ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০৫০ সালে ২৪ শতাংশ এবং ২০৭৫ সালে ৫৮ শতাংশে বৃদ্ধি পাবে। ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে সরকারি চাকরি করছেন মাত্র ১৪ লাখ মানুষ। এসব সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের পেনশন সুবিধা রয়েছে। বাকি ১৮ থেকে ৫০ বছরের বেশির ভাগ মানুষ কৃষি, বেসরকারি খাত, ব্যবসায়ী কিংবা অন্যান্য পেশায় জড়িত রয়েছেন। এদের কোনো পেনশন সুবিধা নেই। এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে পেনশনের আওতায় আনতেই সরকারের এই সিদ্ধান্ত। এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের জন্য সর্বজনীন পেনশন স্কিম যে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশে সর্বজনীন পেনশন চালুর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাংলাদেশকে অনন্য মর্যাদা দেবে। এই উদ্যোগ তার দূরদর্শী আর্থসামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম হাতিয়ার। বর্তমান শ্রমশক্তিকে তাদের ভবিষ্যত্ সুরক্ষিত করার জন্য পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে। এই উদ্যোগ কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেটে প্রস্তাবিত সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালুর দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়েই বর্তমান সরকার এই কর্মসূচিটি চালু করল। এ বিষয়ে ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাগোনিউজ২৪.কম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, “বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গত ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেয়। ঐ আলোচনায় প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করার প্রস্তাব দিয়েছিল।”
পরিশেষে, সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু করায় কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। সেই সঙ্গে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন করছি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও সমিতির সভাপতি গণমানুষের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের প্রতি। দেশ ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে তিনি ইতিপূর্বে যত মৌলিক গবেষণা করেছেন, তার প্রত্যেকটিরই বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখেছি।
বাংলাদেশের উন্নয়নভাবনা ও মৌলিক গবেষণায় অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত অব্যাহতভাবে যে অবদান রেখে যাচ্ছেন, তার গুরুত্ব অপরিসীম। এ পর্যন্ত তিনি যত গবেষণাকর্ম করেছেন, সেসবের কয়েকটি মাইলফলক বা দিকনির্দেশক হিসেবে যেমন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত হয়েছে, তেমনি এ দেশের উন্নয়ন-নীতি, কর্মসূচি প্রণয়নে ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
