প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থা ঘুরাইবার প্রচেষ্টা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৩, ০৪:৫৯

বর্তমানে যে প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থা রহিয়াছে, ইহার বিপরীতে বিকল্প ব্যবস্থা চালুর প্রচেষ্টা নূতন নহে। যুগের পর যুগ ধরিয়া এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রহিয়াছে। তবে হঠাত্ এইরূপ প্রচেষ্টায় জোরদার হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। ইহা ভালো না মন্দ কিংবা তাহা কতটা ফলপ্রসূ হইবে—সেই বিতর্কে আমরা যাইব না। তবে ইহা হয়তো-বা বিশ্বে আরো অস্থিতিশীলতা তৈরি করিতে পারে।

আশির দশকে ডলার ইমপেরিয়েলিজমের কথা উঠিলেই উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো শিক্ষকের চেহারা রক্তিমবর্ণ ধারণ করিত। স্পষ্টত তাহারা ইহাতে বিব্রতবোধ করিতেন। ইহা লইয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের কোনো শিক্ষার্থী গবেষণাপত্র তৈরি করিতে চাহিলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা ঐ বিষয়ের বদলে উন্নয়নশীল বিশ্বে বৈদেশিক সহায়তার প্রভাব ইত্যাদি লইয়া লিখিবার পরামর্শ দিতেন। কিন্তু আজ ডি-ডলারাইজেশন শব্দটি বহুল উচ্চারিত। ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা-পালটা নিষেধাজ্ঞা, সুইফট সমস্যা ইত্যাদির জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছে, তাহাতে ডলারের বিকল্প বিনিময় মুদ্রার আলোচনা সামনে চলিয়া আসিয়াছে। কিছু দেশ এখন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহার করিতেছেন নিজেদের মুদ্রা। এই ডি-ডলারাইজেশনের পাশাপাশি নিউওয়ার্ল্ড অর্ডার বা নয়া বিশ্বব্যবস্থার কথাও অনেকে এখন জোরেশোরে উচ্চারণ করিতেছেন।

বর্তমানে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক জোটের ব্যাপারে সর্বত্র আলোচনা চলিতেছে। তাহারা এক্সিসটিং সিস্টেম বা প্রচলিত পদ্ধতির বিরোধী। অবশ্য এই জোটের উদ্যোক্তাদের মধ্যে এমন দেশও রহিয়াছে, যাহারা দুই নৌকায় পা দিয়া রাখিয়াছেন। তবে ইহাকে যতই জটিল অবস্থা বিবেচনা করা হউক না কেন, আসলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজ স্বার্থ দ্বারাই পরিচালিত। সম্প্রতি এই জোটের সম্প্রসারণ এমন সময় হইতেছে, যখন বিশ্বে ঘটিতেছে ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের রুদ্ধশ্বাস ঘটনা। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক দেশজ উত্পাদনের এক-চতুর্থাংশ আসে এই জোটভুক্ত দেশগুলি হইতে। বৈশ্বিক জিডিপির ক্ষেত্রে এখন তাহারা জি-৭ দেশগুলির চাইতেও অগ্রসর। এই জোটের সমর্থকরা ইতিমধ্যে একটি বিকল্প আন্তর্জাতিক ব্যাংক ব্যবস্থারও গোড়াপত্তন করিয়াছেন। যদিও তাহা বিশ্বব্যাংক বা আই এম এফের বিকল্প প্রতিষ্ঠান হইতে পারে নাই।

গ্লোবাল সাউথের ভয়েজ বা কণ্ঠস্বর হিসাবে এই জোটের সম্প্রসারণের উদ্যোগটি অতীতের প্রচেষ্টাগুলির মতো একটি প্রচেষ্টা বটে। তবে ইহার জন্য তাহাদের কতটা মূল্য দিতে হইবে, আমাদের এই কথাও বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। এই জোটের মূল উদ্যোক্তার সহিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে কয়েক শত গজ দূরে থাকিবার কথা বলা হইলেও অনেকেই তাহা গ্রাহ্য করিতেছেন না। এই ব্যাপারে ভারসাম্য রক্ষা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে না পারিলে এই সকল দেশের জন্য তাহা যে সমূহ বিপদের কারণ হইতে পারে, এই বিষয়টিও আজ অনুপেক্ষণীয়। দিন শেষে এই সমন্বিত অর্থনৈতিক জোটটি কি একটি বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করিতে পারিবে? ইহা আসলে একটি বড় প্রশ্ন। চলমান বৈশ্বিক জোটকে তাহারা কতটা চ্যালেঞ্জ জানাইতে পারিবে তাহা—প্রশ্নাতীত নহে। কেননা নূতন এই জোটের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ ফাটল যথেষ্ট বড়। তাহারা উঠতি ও বড় অর্থনীতির দেশ হইতে পারে, তাহাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথাও সুবিদিত—কিন্তু তাহার পরও এই জোটের একজন শীর্ষনেতা ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারিগর আইসিসি বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা এড়াইতে শেষ পর্যন্ত সরাসরি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন নাই। তাহা ছাড়া দুইটি শত্রুভাবাপন্ন দেশের সীমান্ত সমস্যা এবং পাঁচ শীর্ষ দেশের মধ্যে তিনটি দেশের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলির ভালো সম্পর্কও একটি ফ্যাক্টর বটে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তাহারা কীভাবে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিবেন? ইহার বদলে তাহারা যতটা সম্ভব বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দিতে পারেন, যাহার মূল উদ্দেশ্য হইতে পারে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলে স্থায়ী সদস্য দেশের সংখ্যাবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন