চাঁদের মিথ, চাঁদের রহস্য উন্মোচন

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৩, ০৬:২০

যে কোনো ‘একমাত্র’ জিনিসই আমাদের নিকট অতি বিশেষ গুরুত্ব পাইয়া থাকে। চাঁদ হইল পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ। এই জন্য সেই প্রাচীনকাল হইতে চাঁদ লইয়া আমাদের রোমান্টিসিজমের শেষ নাই। কেবল রোমান্টিকতা নহে, বস্তুগতভাবেও পৃথিবীতে চাঁদের রহিয়াছে অতিশয় প্রভাব-প্রতিপত্তি। বলা যায়, এই বসুমতীর সকল মানুষের বিচিত্র ধরনের আবেগ-অনুভূতি, চিন্তাভাবনা, মিথ, ভালোলাগা গড়িয়া উঠিয়াছে চাঁদকে কেন্দ্র করিয়া। পৃথিবী থেকে আনুমানিক ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা এই একমাত্র উপগ্রহটি তাহার সমস্ত রহস্য লইয়া পৃথিবীবাসীর জীবনে-মনে বিশেষ স্থান দখল করিয়াছে। আমরা সেই শৈশব হইতেই চাঁদের বুড়ির গল্প শুনিয়া আসিতেছি। চাঁদের বুড়ি একমনে চরকা কাটিতেছে। আমরা কল্পচোখে যেন দেখিতে পাই—চাঁদে রহিয়াছে এক থুত্থুরে বুড়ি—তাহার লম্বা সাদা চুল। ঐখানেই বসিয়া সে রাতদিন সুতা বুনিতেছে। ছোটবেলায় এই গানটি আমরা সকলেই শুনিয়াছি—‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদমতলায় কে?/ হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে সোনামণির বে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটি জীবনে একবার হইলেও আমরা শুনিয়াছি—‘যেতে যেতে পথে পূর্ণিমারাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে।/ দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে কী জানি কী মহা লগনে।’

এক মহা লগনে ১৯৬৯ সালে মানুুষ প্রথম চাঁদে পা রাখিয়াছিল। যুক্তরাষ্ট্রের লোকসংস্কৃতিতে আছে—চাঁদের বুকে এক বালিকা আর তাহার খরগোশের বাস করিবার মজার এক গল্প। গল্পটি এতটাই জনপ্রিয় যে, ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো-১১ চাঁদে নামিবার পূর্বে কন্ট্রোল রুম হইতে নাকি মজা করিয়া বলা হইয়াছিল—‘দেখো তো খরগোশজাতীয় কিছু আছে নাকি!’ কলিন্স নাকি উত্তর পাঠাইয়াছিলেন—‘আচ্ছা। আমরা খরগোশওয়ালা মেয়েটার জন্য জোর অনুসন্ধান চালাইব।’ চাঁদ লইয়া প্রবাদ-প্রবচনেরও শেষ নাই। যেমন বলা হয়—‘দুষ্ট লোকের ঘরেও চাঁদের আলো পড়ে।’ আবার যাহার ভাঙা ঘর, তাহার জন্য রোমান্টিক প্রবাদ হইল—‘ভাঙাঘরে চাঁদের আলো,/ যেদিন যায় সেদিন ভালো।’ বিখ্যাত সাহিত্যিক খলিল জিবরান যেমন বলিয়াছেন—‘আমরা সবাই উজ্জ্বল চাঁদের মতো, যদিও আমাদের অন্ধকার দিকও রহিয়াছে।’ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাহার ‘নতুন চাঁদ’ কবিতায় বলিয়াছেন—‘দেখেছি তৃতীয় আসমানে চিদাকাশে/ চির-পথ-চাওয়া মোর নতুন চাঁদ হাসে।’ চাঁদকে অত্যন্ত মূল্যবান বিবেচনা করা হয় বলিয়া প্রবাদ রহিয়াছে—বামন হইয়া চাঁদে হাত বাড়ানোটা অতি বড় স্পর্ধার পরিচয়। এইভাবে সারা বিশ্বের সিনেমা, গল্প-উপন্যাস, লোককথায় চাঁদ চিরজাগরূক হইয়া রহিয়াছে। চাঁদের সকল কিছুই খুব ভালো, তাহা নহে। আধুনিক চিকিত্সাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে বলিয়াছিলেন যে, পূর্ণচন্দ্রের রাতে যেই মানুষ আতঙ্ক, ভয় আর পাগলামিতে আক্রান্ত হয়, তাহাকে চাঁদের দেবী দেখা দেয়। উল্লেখ্য যে, রোমান পুরাণ অনুসারে চাঁদের দেবী লুনা প্রতি রাতে অন্ধকার আকাশে তাহার রুপালি বাহন লইয়া ভ্রমণে বাহির হন। অমাবস্যা মানে এক বিভীষিকাময় রজনি। ভূতপ্রেত দেও-দানব এই সময় পৃথিবীব্যাপী রাজত্ব করে। চাঁদ আর নেকড়ে মানবের গল্প তো হলিউডে বিখ্যাত। এই গল্পে বলা হয়—নেকড়েমানব বা ওয়্যারওলফ জাতীয় একটি হিংস্র জন্তু রহিয়াছে, যাহা একদম মানুষের মতো দেখিতে। ইহারা সকল সময় মানুষের মতো করিয়া জীবনধারণ করিলেও পূর্ণিমা রাতে ইহারা হিংস্র নেকড়েতে পরিণত হয়।

তবে চাঁদ লইয়া এত ধরনের মিথ-উপকথা-গল্পকাহিনির রোমান্টিসিজমে জল ঢালিয়া দিতেছে পৃথিবীর মহাকাশবিজ্ঞানীরা। চাঁদে এই যাবত্ ১২ জন মানুষ পা রাখিয়াছেন। গত ৬০ বত্সর ধরিয়া চাঁদের অভিমুখে বেশ তাত্পর্যপূর্ণ অনেক অভিযান পরিচালিত হইয়াছে এবং হইতেছে। আমরা সৌভাগ্যবান যে, চাঁদের রোমান্টিক দিকের পাশাপাশি ইহার রহস্যোন্মোচনের বিজ্ঞানকথাও জানিতে পারিতেছি। শতকথার এক কথা হইল—নরম রোমান্টিক জ্যোত্স্না কিংবা পৃথিবীর জোয়ার-ভাটা হইতে শুরু করিয়া চাঁদের চৌদ্দোকলার ছলাকলা—ইহার তুলনা মিলে না। যতই রহস্য ভাঙুক, আমরা চিরকালই চাঁদে মুগ্ধ হইয়া থাকিব। চন্দ্রাহত হইব। অদূর ভবিষ্যতে মানুষ নিশ্চয়ই চাঁদে উপনিবেশ করিবে। তখন যাহারা চাঁদে গিয়া বসবাস করিবে, তাহারা চাঁদের আলো পাইবে না। তখন হয়তো চাঁদের জায়গায় পৃথিবীই হইবে তাহাদের রোমান্টিক জায়গা।

ইত্তেফাক/এএইচপি