দোলনচাঁপার ইতিবৃত্ত

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৩, ১৭:৫৯

একবার দাক্ষিণাত্যের গোকর্ণপুরে একটি মন্দির স্থাপিত হলো শিবলিঙ্গের। ‘ভক্তরা বলতেন, গোকর্ণেশ’। সেই লিঙ্গদর্শনেই নাকি মানুষের সব পাপ ধুয়ে যেত।

দেবলোকে কানাঘুষো হতেই খবরটি পৌঁছাল ঋষি নারদের কানে। তার ভারী কৌতূহল হলো মহাদেবের সেই লিঙ্গরূপ দর্শনের!

তিনি ব্রাহ্মণের বেশ ধরে, শিববন্দনা গাইতে গাইতে মন্দিরের সামনে হাজির হলেন। এসে দেখলেন, এক ব্রাহ্মণ মন্দিরের সামনের চাঁপাগাছ থেকে ১০৮টি চাঁপা দিয়ে শিবপুজো করে নিজস্বার্থে শিবকে সন্তুষ্ট রাখছেন।

নারদ মুনির মনে প্রশ্ন জাগল। তিনি আরও খোঁজ নিয়ে দেখলেন, এই ব্রাহ্মণ শিবকে সন্তুষ্ট করে রাজ্যের রাজাকে ভুলিয়ে রেখেছেন।

পাশাপাশি সব অসহায়ের সঙ্গে জোরজুলুমও করে যাচ্ছেন। নারদ অসন্তুষ্ট হয়ে শিবের কাছে নালিশ দিলেন। তখন শিব আদেশ করলেন নারদকে, ‘তুমি যেমনটা ভালো মনে করো।’

সেই থেকে হিন্দুধর্মে চাঁপাকে নিষিদ্ধ ফুল ও পুজোর অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়।

চাঁপা কিউবার জাতীয় ফুল। এটি ব্রাজিলে প্রথম নেওয়া হয় ক্রীতদাস যুগে; সেখানে ক্রীতদাসরা দোলনচাঁপা গাছের পাতাকে তোশকের মতো ব্যবহার করতেন।

বর্তমানে ব্রাজিলে এর ব্যাপকতার কারণে একে ‘রাক্ষুসে-আগাছা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

হাওয়াই অঞ্চলেও একে আগাছা গণ্য করা হয়েছে! আফ্রিকার কিছু স্থানে এই গাছ নিষিদ্ধ।

স্পেনীয় উপনিবেশ আমলে নারীরা এই ফুলের মধ্যে গোপন বার্তা লুকিয়ে আদান-প্রদান করতেন বলে স্পেনেও একে অলক্ষুণে ফুল বলা হয়। ক্রীতদাসরা দোলনচাঁপা গাছের পাতা তাদের বিছানা হিসেবে ব্যবহার করতেন।

আহা! যার সৌন্দর্যে সবাই বিমোহিত, আর সেই ফুল কতই-না অবহেলিত। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, চাঁপার রূপে-গন্ধে পাগল হননি, এমন মানুষ পাওয়া ভার।

বাংলার এই অতি পরিচিত ফুলটি প্রায় সব বাগানে স্থান করে নিয়েছে তার অপরূপ সৌন্দর্য আর সুগন্ধের বিনিময়ে। দোলনচাঁপার আদি নিবাস এশিয়া হলেও বর্তমানে সারা বিশ্বে গুটিগুটি পায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। এটির বৈজ্ঞানিক নাম Hedzchium coronarium; এটি Zingiberaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

Hedzchium এসেছে গ্রিক দুইটি শব্দ Hedys এবং Chios থেকে। Hedys অর্থ Sweet বা মিষ্টি এবং Chios অর্থ Snow বা তুষার। ফুলের সৌরভ আর বর্ণের কারণেই এই নামকরণ। এর অন্যান্য নামের মধ্যে Butterfly Ginger Lily, White Ginger Lily, Dolan Champa.

এছাড়াও মণিপুরি ভাষায় দোলনচাঁপা হচ্ছে ‘তখেল্লৈ অঙৌভা’। ‘সোনটাকা’ এর মারাঠি নাম। আসামে দোলনচাঁপা পরিচিত ‘সুরুলি সুগন্ধি’ নামে।

বর্ষাকালীন ফুলগুলোর মধ্যে দোলনচাঁপা অন্যতম। শুনতে পাই, দোলনচাঁপার নাকি মোট প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৪০টি! সাদা ছাড়াও কোনো কোনোটির রং হলদেটে বা লালচে হয়।

আবার কোনো কোনো ফুলে থাকে গাঢ় হলুদ বা কমলা রঙের ছিটে। যদিও সাদা ছাড়া অন্যগুলো আমি চোখে দেখিনি!

এই ফুলের নানান উপকারী দিক রয়েছে। এর নির্যাস উন্নতমানের পারফিউম প্রস্তুতিতে এবং কসমেটিকস উপাদান তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কোথাও কোথাও দোলনচাঁপার কুঁড়ি, ফুল, শিকড় ও কন্দ অপ্রচলিতভাবে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শিকড়ের ক্বাথ ফেসিয়াল, রূপচর্চায় ব্যবহৃত হয়।

শিকড় ভক্ষণে বাতজ্বরে উপকার পাওয়া যায়। এদের বীজের নির্যাস পাকস্থলী ও পায়ুর বায়ুনাশ করে কৃমি ধ্বংসে কাজ করে। কাণ্ড থেকে প্রস্তুত মণ্ড কাগজশিল্পে ব্যবহৃত হয়।

কথায় আছে না, ‘রতনে রতন চেনে’ যেখানে সব ভাবেই অবহেলিত অভিযুক্ত হচ্ছে এই ফুলটি, সেখানে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঠিক মুগ্ধ করেছিল। তাকে নাকি এতটাই বিহ্বল করেছিল যে, কারাগারে থাকাকালীন অবস্থায় তিনি তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের নামকরণই করেন ‘দোলনচাঁপা।’

দুর্ভিক্ষে খাদ্যাভাবের সময় এই গাছের অংশাদি কিন্তু খাদ্য হিসেবেও ব্যাপক ব্যবহৃত হয়েছিল মর্মে জানা যায়।  কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন তার কবিতায় এভাবে—

দোলে দোলে দোলে প্রেমের দোলনচাঁপা হৃদয়-আকাশে, দোল-ফাগুনের চাঁদের আলোর সুধায় মাখা সে। সব ছাপিয়ে দোলনচাঁপার সৌন্দর্য, মোহনীয় গন্ধ আমাদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে, আনন্দিত করে—এ গুরুত্ব অপার্থিব, অমূল্য।

লেখক :সংস্কৃতি কর্মী

ইত্তেফাক/জেডএইচ