বর্ষাকালে বাংলাদেশে ফি বত্সর বন্যা হয়। ইহার পাশাপাশি আরো একটি বন্যা হয় প্রায় বত্সর জুড়িয়া। উহা হইল কথার বন্যা। আমাদের চারিদিকে অধিক কথা আর উপদেশের বন্যা। যিনি ধমকি দিতে পারেন, তিনি প্রায়শই ধমকির পর ধমকি দিয়া কথার বন্যা বিপজ্জনক সীমা পার করাইয়া দেন। যিনি ধমকি দিতে পারেন না, তিনিও কম যান না। ইহার ফলে যাহা হইবে—তাহার নাম ‘নৈরাজ্য’। আমরা কি সেই দিকেই যাইতেছি?
বহু যুগ পূর্বে থেকেই উপদেশ দেওয়া কিংবা অন্যকে নসিহত করিবার ক্ষেত্রে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার; কিন্তু যেই বিষয় লইয়া কথা বলিতেছি—উহা লইয়া কথা বলিবার মতো যোগ্যতা আমাদের আছে কি না—আমরা তাহার অগ্রপশ্চাত্ বিবেচনা করি না। মাইক্রোফোন পাইলেই কিংবা আমাদের সম্মুখে ক্যামেরা ধরিলেই দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো আমরা অনর্গল কথা বলিতে শুরু করি। অথচ জ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রই নিশ্চিতভাবে কম কথা বলিবেন। কারণ, অধিক কথা বলিতে গেলেই কিংবা অধিক উপদেশ দিতে গেলেই ‘ভুল’ কথা বলিবার আশঙ্কা বাড়িবে। সুতরাং জ্ঞানীরা সাধারণত যতটুকু বলিয়া থাকেন, জানিয়া-বুঝিয়াই বলেন; কিন্তু জ্ঞানী হওয়া তো সহজ কথা নহে। কেবল বই মুখস্থ করিয়া পাশ মার্কস তুলিয়া সার্টিফিকেট পাইলেই তো কেহ জ্ঞানী হইয়া যান না। একাডেমিক শিক্ষা আমাদের কেবল এইটুকুই শিখায়—আমরা কী করিয়া ক্রিটিক্যালি পড়ালেখা করিব। পড়ালেখা একটি নিরন্তর বিষয়, সমগ্র জীবনের বিষয়। আমরা তাহা ভুলিয়া যাই। পড়ালেখার সমাপ্তি টানি বহু পূর্বেই। সেই কারণে আমরা হাফ-এডুকেটেড হইয়া অতিকথনের ফুলঝুড়ি ছোটাই। আমরা ভুলিয়া যাই মহামতি চাণক্যের কথা। তিনি বলিয়াছেন—‘অন্যকে উপদেশ দিতে পাণ্ডিত্যের কমতি কারো নাই।/ স্বয়ং আচারি ধর্ম শিক্ষা দেন শুধু মহাত্মাই।’
স্পষ্টতই, সবচাইতে কঠিন কাজ হইতেছে নিজেকে চেনা এবং সবচাইতে সহজ কাজ হইতেছে অন্যদের উপদেশ দেওয়া। যদিও প্রবাদে আছে—‘একটি সত্ উপদেশ দান, লক্ষ টাকা দানের চাইতেও শ্রেয়।’ কিন্তু ‘সত্ উপদেশ’ সকলে গ্রহণ করিতে পারে না। এই ব্যাপারে কবি শেখ সাদি বলিয়াছেন—‘লৌহদণ্ড যেমন পাথরের গায়ে বিদ্ধ হয় না, তেমনি কালো অন্তরে সদুপদেশ ক্রিয়া করে না।’ আর এই জন্যই হজরত আলি (রা.) বলিয়াছেন—‘যে তোমার উপদেশ শুনিতে চাহে তাহাকে ছাড়া আর কাহাকেও উপদেশ দিয়ো না।’ হজরত আলি (রা.) ইহাও বলিয়াছেন, ‘যাহা তুমি স্বয়ং করো না বা করিতে পারো না, তাহা অন্যকে উপদেশ দিয়ো না।’ মনে রাখিতে হইবে, উপদেশ প্রদানে অবশ্যই শিষ্টাচার থাকা দরকার। ইবনুস সালাহ (র.) এই জন্য বলিয়াছেন, ‘নসিহত হইতেছে উপদেশদাতার পক্ষ হইতে উপদেশ গ্রহীতার জন্য কল্যাণ কামনা ও হিত সাধন।’ তবে উপদেশ প্রদানের নাম করিয়া অধিক কথা বলাটাও বিপজ্জনক। এই ব্যাপারে হজরত ইব্রাহিম আদহাম (রা.) স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন—‘যে অধিক কথা বলিবে, তাহার হইতে মিথ্যা ও পরনিন্দা নিশ্চয়ই বাহির হইবে।’ এই বিষয়ে মহামতি প্লেটো বলিয়াছেন—‘যে ব্যক্তি অন্যকে সত্কর্মের উপদেশ দেয় আর নিজে সত্কর্ম করে না, সেই ব্যক্তি মশালবাহী অন্ধের ন্যায়, অন্যে তাহার দ্বারা পথ দেখে কিন্তু নিজে দেখিতে পায় না।’
আমাদের মনে আরো একটি প্রশ্ন জাগে—যাহারা প্রতিনিয়ত উপদেশ দেন, তাহারা নিজেদের ওজন মাপিয়া দেখিয়াছেন কখনো? যেই আরোপিত শক্তির ভারে লাগামহীন ঘোড়ার মতো কথার তুফান তাহারা ছুটাইতে থাকেন, সেই শক্তি না থাকিলে নিজের ওজন কতটুকু থাকিবে?—তাহারা একান্তে কি সেই কথা ভাবিয়া দেখিয়াছেন কখনো? অধিক কথা না বলিলে কী হয়? উন্নয়নশীল দেশে যে কথা বলা উচিত—তাহা যথাযথভাবে বলা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এই কারণে তৃতীয় বিশ্বে অতিকথন নৈরাজ্যকে ত্বরান্বিত করে। সুতরাং কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো।
