চতুর্থ শিল্পবিপ্লব: আমরা কতটুকু প্রস্তুত?

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৩, ০৩:৩০

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বর্তমান সময়ে বহুল আলোচিত একটি বিষয়। এটি হচ্ছে আধুনিক স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত উত্পাদন এবং শিল্প ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণের একটি চলমান প্রক্রিয়া। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উত্পত্তি ২০১১ সালে জার্মান সরকারের একটি হাইটেক প্রকল্প থেকে। একে সর্বপ্রথম বৃহত্ পরিসরে উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোইয়াব। তিনি ২০১৬ সালে তার ‘ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমরা চাই বা না চাই, এতদিন পর্যন্ত আমাদের জীবনধারা, কাজকর্ম, চিন্তাচেতনা যেভাবে চলছে সেটা বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের ভিত্তির ওপর শুরু হওয়া ডিজিটাল এ বিপ্লবের ফলে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে গাণিতিক হারে, যা আগে কখনো হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি খাতে এ পরিবর্তনের প্রভাব ফেলছে। যার ফলে পালটে যাচ্ছে উত্পাদন প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনা। এমনকি রাষ্ট্র চালানোর প্রক্রিয়া।’

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো —সেলফ-অপটিমাইজেশন, সেলফ-কনফিগারেশন, সেলফ-ডায়াগনজ, কগনিশনের প্রবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান জটিল কাজে কর্মরত কর্মীদের বুদ্ধিদীপ্ত সহায়তায় প্রয়োজনীয় স্বয়ংক্রিয়করণ প্রযুক্তির নবতর বিকাশ। ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ডিজিটাল টেকনোলজি এবং জীববিজ্ঞানের প্রভূত উন্নয়ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তি। রোবোটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংস, স্বচালিত গাড়ি, মোবাইল সুপার কম্পিউটিং, নিউরোসায়েন্সের অ্যাডভান্স গবেষণা আমাদের শিল্প উত্পাদন এবং মানুষ হিসেবে জীবনধারণের পদ্ধতিকেই আমূল পরিবর্তন করে দিচ্ছে। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লানিং, রোবোটিক্স, অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, থ্রিডি প্রিন্টিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, বিগ ডেটা অ্যানালাইটিক, হরিজন্টাল ও ভার্টিক্যাল সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, জিন প্রযুক্তি ও প্রকৌশল ইত্যাদির সমন্বয়ে আজকের বিশ্বে যে দ্রুত পরিবর্তন আমরা লক্ষ করছি তাই হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। এ বিপ্লবকে ডিজিটাল বিপ্লব কিংবা ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ নামেও অভিহিত করা হয়। অন্যান্য শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লব শুধু মানুষের শারীরিক পরিশ্রমকে যন্ত্র ও প্রযুক্তি সেবার মাধ্যমে দ্রুততর করেছে। কিন্তু চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রমকে আরো বেশি গতিশীল ও নিখুঁত করে তুলেছে।

অদূর ভবিষ্যতে, আরো কয়েক শ কোটি মানুষ সংযুক্ত হয়ে যাবে ডিজিটাল নেটওয়ার্কে, সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বাড়বে অনেক গুণ বেশি, একসঙ্গে আরো অধিক রিসোর্স ম্যানেজ করতে পারবে। উত্পাদিত বস্তুগুলো দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে, সেন্সরের মাধ্যমে মনিটরিং ও ম্যানেজমেন্ট করায় হিসেবের খাতায় ডেপ্রিসিয়েশন বা অবচয়ন শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। অন্যদিকে, সংগঠনগুলো পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অক্ষম হলে, নতুন বিপ্লবের সঠিক ফল আনয়নে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারে সরকারগুলো ব্যর্থ হতে পারে। তখন নিরাপত্তাহীনতায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইউকেভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসির তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০ কোটি মানুষ তাদের বর্তমান চাকরি হারিয়ে ফেলতে পারে। শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আগাম ফসল হিসেবে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০ শতাংশ মানুষের পরিধেয় বস্ত্র ও ১০ শতাংশ মানুষের চশমার সঙ্গে ইন্টারনেট সংযুক্ত থাকবে। মানুষের শরীরে স্থাপনযোগ্য মোবাইল ফোন ও ৯০ শতাংশ মানুষ স্মার্ট ফোন ব্যবহার করবে। আমেরিকায় ১০ শতাংশ গাড়ি হবে চালকবিহীন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হবে ৩০ শতাংশ করপোরেট অডিট। আমেরিকায় এসে যাবে রোবট ফার্মাসিস্ট। এই পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, সমাজ, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদির ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন প্রযুক্তিবোদ্ধারা।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে মানুষ যে শুধু চাকরি হারাবে তা নয়, বরং নতুন করে ১০০ কোটি মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব থেকে সুবিধা গ্রহণ করতে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পরামর্শ হলো—প্রতিটি দেশের কর্মক্ষম জনবলকে সৃজনশীলতা, জটিল সমস্যা সমাধানে পারদর্শিতা, বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জনব্যবস্থাপনা, অন্তর্দৃষ্টি, অন্যদের সঙ্গে কাজের সমন্বয়, দর কষাকষি, সেবা প্রদানের মানসিকতা এবং চিন্তার স্বচ্ছতা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যে সব পেশা-শিল্প-ব্যবসার মধ্যে উদ্ভাবনী শক্তি বেশি থাকবে সেগুলোই শুধু টিকে যাবে। এজন্য তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তির মধ্যে অব্যাহত যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি যন্ত্রগুলো আপডেট করার পাশাপাশি প্রযুক্তির নিরাপত্তার ঝুঁকি আপডেটের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আইওটি, ব্লকচেইন ও রোবোটিক্স ইত্যাদির ব্যবহার করতে দ্রুত কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের সুদক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সাফল্যকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনাময় নব অধ্যায়ের শুভসূচনা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘শেখ কামাল আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর’ স্থাপন করা হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার জন্য মাদারীপুরের শিবচরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ‘শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি’ নামে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট। দেশের ৬৪ জেলায় স্থাপন করা হচ্ছে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইওটি, রোবোটিক্স, সাইবার সিকিউরিটিসহ উচ্চ প্রযুক্তির ৩৩টি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এ বছর সংযুক্ত হবে তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল। অতএব, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এই সক্ষমতাকে এখন বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

n লেখক :শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/এমএএম