পাবলিক কত প্রকার কী কী

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৩, ০৩:৩০

পাবলিক মানে হচ্ছে জনতা বা জনগণ। আমাদের দেশে অবশ্য পাবলিক বেশ পরিচিত শব্দ। ভিক্ষুক, পকেটমার থেকে শুরু করে নেতামন্ত্রীরা পর্যন্ত পাবলিক শব্দটি বোঝেন এবং প্রয়োগ করেন। আমাদের দেশে পাবলিকের দোহাই দিয়েই রাজনীতি চলে। এমনিতে কেউ পাবলিককে খুব একটা তোয়াক্কা করে না। কিন্তু পাবলিকের মাইরকে সবাই ভয় পায়। একবার পাবলিক খেপে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও কোনো কিছুতেই কাজ হয় না।

আমাদের দেশে পাবলিকের ওপর দায় চাপানোর একটা প্রবণতা আছে। ভালো, শিল্পসম্মত নাটক-সিনেমা-সাহিত্য কেন হচ্ছে না? এর জবাবে প্রায়ই বলা হয়, পাবলিক খায় না। অর্থাত্ পাবলিক যা খায়, তাই উত্পাদন ও সরবরাহ করা হয়! কেন আন্দোলন জমছে না? একপক্ষের মতে, অন্যপক্ষের ডাকে পাবলিক সাড়া দেয় না। নানা অপকর্ম করেও একপক্ষ কীভাবে বছরের পর বছর টিকে আছে? অন্যপক্ষের ভাষ্য মতে, ওরা পাবলিককে ভুল বুঝিয়ে, মিথ্যাচার করে, ভয় দেখিয়ে, শক্তি প্রয়োগ করে দাবিয়ে রেখেছে।

নানা মহল থেকে প্রায়ই আফসোস শোনা যায়, আমাদের দেশের এই পরিস্থিতির জন্য পাবলিকই দায়ী। তারা কেন প্রতিবাদ করে না, কেন রুখে দাঁড়ায় না, কেন গর্জে ওঠে না? মহলবিশেষই শুধু নয়, পাবলিকও অনেক সময় পাবলিককে দায়ী করে! দেশে এত এত অনাচার, অনিয়ম, লুটপাটের ঘটনা ঘটছে, অথচ যথাযথ প্রতিবাদ হচ্ছে না। পাবলিক সেভাবে পথে নামছে না। ফেসবুকে, ইউটিউবে সবাই এসব সমস্যার ব্যাপারে সরগরম হলেও রাজপথে গণমানুষের ঢল দেখা যাচ্ছে না। ঝাঁকুনি ও ধাক্কা মেরেও পালাবদলের হুংকারেও কাজ হচ্ছে না।

কে শোনে কার কথা! এজন্য অনেকের আক্ষেপ—আসলে আমাদের দেশের পাবলিকই খারাপ। এদের চরিত্র বলে কিছু নেই। এরা প্যাঁদানি খাবে, বাবা গো মা গো বলে চিল্লাবে। এর পর প্যাঁদানি শেষ। অমনি দাঁত কেলিয়ে হাসতে থাকবে। বাঁদরামি শুরু করে দেবে। এরা প্রচণ্ড সুবিধাবাদী। গাছেরটাও খায়, তলারটাও কুড়ায়। এদের বোধবুদ্ধি বলে কিছু নেই। ভোট এলে ভোট দেয়। তারপর সারা বছর গালাগাল করে। আবার ভোট আসে। এক কাপ চা, এক খিলি পান আর এক প্যাকেট বিড়ি পেয়ে এরা অতীত ভুলে যায়। আমাদের সমাজে জনতা, জনগণ বা পাবলিক সম্পর্কে এই হলো ‘পাবলিক-পারসেপশান’ বা সাধারণ অভিমত। মজার ব্যাপার হলো—এক পাবলিক আরেক পাবলিকের সংজ্ঞা ও চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়। এ ব্যাপারে সাধারণ পাবলিকও অসাধারণ মতামত দিয়ে থাকেন! কথা শুনলে মনে হয় যেন কত বড় বুদ্ধিজীবী!

কথা হলো পাবলিক আসলে কারা? আমাদের দেশে এখন তিন ধরনের মানুষের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। প্রথম শ্রেণিতে আছেন—যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এরা দলের হয়ে সব সময়ই হাততালি দেয়। দল ভালো করলেও জিন্দাবাদ বলে, জঘন্য খারাপ কিছু করলেও জিন্দাবাদ ধ্বণি দেয়। এদের বলা যায় দলবাজ। এর বাইরে একদল—‘গোপাল কলা খায়’-মার্কা মানুষ আছেন, যারা ‘কী করিতে হইবে’ বিষয়ে রেডিও-টেলিভিশনে-সেমিনারে-গোলটেবিল বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। নানা বিষয়ে নসিহত করেন। এরা চমত্কার করে কথা বলেন। ধোপদুরস্ত পোশাক পরেন। রুটি-রুজি নিয়ে তাদের ভাবতে হয় না। কারণ তারা প্রায় সবাই ভালো রোজগার করেন বা করেছেন। এদের অনেকেই আবার ‘অবসরপ্রাপ্ত’। জীবনের তিন কাল আরাম-আয়েশে কাটিয়ে শেষ বয়সে অবসর বিনোদনের উপায় হিসেবে ‘কী করিতে হইবে’-বিষয়ে জ্ঞানদান করতে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এদের অনেকের মনের কোণে একটু পদ-পদবি-সম্মান-পদক-পুরস্কারের মোহও কাজ করে। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা নিজেরাই নিজেদের নাম দিয়েছেন—সিভিল সমাজ বা নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজ। এই রাজনৈতিক সমাজ আর সুশীল সমাজের বাইরে আরো এক শ্রেণির মানুষ আছেন। তারা হলেন—আমপাবলিক। সুশীল সমাজ আর রাজনৈতিক সমাজ এদের নাম দিয়েছেন—জনগণ। এই আমপাবলিক বা জনগণকে নিয়েই রাজনৈতিক সমাজ তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। জনগণের দোহাই দিয়ে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যান। জনগণের হয়ে কেউ-বা হুংকার ছাড়েন। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জনগণ এসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না।

পাবলিক বা জনগণও এক আজব চিজ। তারা কারো সাতেও নেই পাঁচেও নেই। আবার তারা সব খানেই আছে। তারা সুশীল সমাজের টিভি টকশো মনোযোগ দিয়ে শোনে। অনেক ক্ষেত্রে সমর্থনও করে। কিন্তু যখন কোনো সুশীল ব্যক্তি ভোটে দাঁড়ায়, তখন তাকে ভোট দেয় না! ভোট দেয় তাদের, যাদের কারণে দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে, সারা বছর যাদের গালাগাল করে। এ এক জটিল মনস্তত্ত্ব! তবে রাজনৈতিক সমাজ ও সুশীল সমাজের বাইরে দেশে পাবলিকের সংখ্যাই বেশি। তারা কিল খেয়ে কিল হজম করে। রাজনৈতিক সমাজের একাংশের বদামিতে রাগে ফোঁস ফোঁস করে, কিন্তু গর্জে ওঠে খুব কম। এর অবশ্য কারণও আছে। পাবলিক হলো বাতাসের মতো। বাতাস ছাড়া আমরা বাঁচি না। বাতাসের শক্তিও প্রচণ্ড। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা বাতাসের গুরুত্ব খুব একটা অনুভব করি না। এর শক্তিকেও সমীহ করি না। কিন্তু ঝড়ের আভাস পেলে ঠিকই শঙ্কিত হই। পাবলিক খেপলে যে কী ভয়ানক অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে—সে ব্যাপারে সবাই অত্যন্ত সচেতন। তাই তারা সারাক্ষণই চেষ্টা করে একে-অপরের বিরুদ্ধে পাবলিককে খেপিয়ে দিতে। সমস্যা হলো—পাবলিককে গতর খাটিয়ে উপার্জন করে খেতে হয়। তারা রাজনৈতিক সমাজের চালাকির সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। সব সময় চালাকিটা ধরতেও পারে না। কিন্তু তার পরও অস্থিরতা কিংবা নৈরাজ্য শুরু হলে পাবলিককেই সবচেয়ে বেশি মূল্য গুনতে হয়।

পুনশ্চ :আমার এক ফেসবুক-বিপ্লবী’ বন্ধু সম্প্রতি লিখেছেন :এতকাল আমরা জেনে এসেছি, দুনিয়ায় নাকি তিন ধরনের মানুষ আছে :১. শুনে শেখে (নর-উত্তম), ২. দেখে শেখে (নর-মধ্যম) এবং ৩. ঠেকে শেখে (নরাধম)। ভেবে দেখলাম, আসলে আরো দুই ধরনের মানুষ দুনিয়াতে আছে। এক, যারা কখনো শেখে না এবং দুই, যারা নিজে শেখে না এবং অন্যকেও শিখতে দেয় না। বাংলাদেশের সমাজে নাকি এখন এই শেষোক্ত ধরনের মানুষের সংখ্যা বাড়ছে দিনদিন!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/এমএএম