সুষ্ঠু নির্বাচন করিবার বার্তা কি মাঠ পর্যায়ে যায়?

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৩, ০৭:৩১

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির নির্বাচনি সংস্কৃতি বড়ই নির্মম ও পরিহাসমূলক। এই সকল দেশে স্থানীয় হইতে শুরু করিয়া জাতীয় নির্বাচন আসিলেই হামলা-মামলার রেওয়াজ বাড়িয়া যায়। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশগুলিতে হামলা চালানো হয়, যাহাতে বিরোধী দলগুলি নির্বাচনের পূর্বে সঠিকভাবে জনমত গঠন করিতে না পারে। একই সঙ্গে তাহাদের বিরুদ্ধে ভুয়া ও মিথ্যা মামলার পাহাড় তৈরি হয়। কয়েক বছরের, এমনকি কয়েক যুগের পুরাতন মামলাগুলিও এই সময় চাঙ্গা করা হয়। উদ্দেশ্য আর কিছুই নহে, যাহাতে নির্বাচনের পূর্বে তাহাদের জেলে পুরিয়া রাখা যায়। তাহাদের সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা যায়। চরিত্র হনন করা যায়। এমন সকল মিথ্যা, সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়, যাহার কোনো মেরিট নাই। পুলিশি তদন্ত করা হয় দায়সারাভাবে কিংবা গোঁজামিল দিয়া। চার্জশিটেই ত্রুটি থাকে বিধায় শেষ পর্যন্ত তাহা বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক আদালতে টিকে না; কিন্তু কারাগারে আটকাইয়া রাখিবার কারণে ততদিনে সরকারি দল নির্বাচনের ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ পাইয়া যায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির এই অপকৌশলের কারণে সেইখানে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া হানাহানি, মারামারি, সংঘাত-সংঘর্ষ ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছে। বিরোধী দলগুলি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তাহারাও একই রকম অপকৌশল গ্রহণ করিয়া থাকে বিধায় এই সকল দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কখনো অবসান হয় না।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, জাতীয় নেতার ছবি ভাঙচুরের তথাকথিত ও ঠুনকো মামলায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। অথচ এই ঘটনার সত্যটা কতটুকু এবং এতো সত্ত্বেও অভিযোগকারীদের ছবি কেন অক্ষত থাকে, তাহা লইয়া পুলিশ তদন্ত করিয়া দেখিবার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করে না। এই সকল দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন যেইভাবে অনিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, তাহা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। এইখানে ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও আইনসিদ্ধ আচরণ লইয়া প্রশ্ন উঠে। তাহারা অনেক সময় সরকারি দলের সহিত মিলিয়া মিশিয়া একাকার হইয়া যান। এমনকি সরকারি দলের নেতাকর্মীদের চাইতেও বড় কর্মী সাজিয়া যান। ফলে নির্বাচনের পূর্বে এই সকল দেশে সরকারি দলের কোনো চিন্তা থাকে না। তাহারা নাকে তৈল মর্দন করিয়া দিব্যি নিশ্চিন্তে ঘুমাইতে পারেন।

উপর্যুক্ত কারণে এই সকল দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আশা করা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নহে। অথচ সেই সকল দেশের সরকারপ্রধান ও তাহার অনুসারী নেতারা অনবরত বলিয়া যান—নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হইবে। ইহা তাহাদের মনের কথা কি না, তাহা বিশ্বাস করা কঠিন। কেননা তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া নির্বাচনের পূর্বে বা পরে যাহা ঘটে, তাহাতে এই কথার কোনো ভিত্তি খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। নতুবা মাঠ পর্যায়ে কীভাবে বলা হয় যে, সরকারপ্রধান যখন মার্কা দিয়াছেন, তখন আর নির্বাচন কীসের? এই সকল কথা যাহারা বলেন, তাহারা সরকারি দলে অনুপ্রবেশকারী ছাড়া আর কেহ নন। তাহাদের ব্যাকগ্রাউন্ডের খোঁজখবর করিলেই এই কথার সত্যতা পাওয়া যাইবে। তাহারা স্থানীয় নির্বাচনে সিসিটিভি ক্যামেরার তার ছিঁড়িয়া ফেলিলেও এই জন্য কোনো বিচার হয় না। আবার শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কথা বলা হইলেও কীভাবে সরকারি দলের নেতারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের শিকড় উপড়াইয়া ফেলিবার কথা বলেন? উচ্ছেদ বা নির্মূল শব্দে অশান্তি ছাড়া কি আর কিছু আশা করা যায়?

এই সকল দেশে এমন অবস্থা দাঁড়াইয়া যায় যে, সরকারি দল নিজ দলের নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীতাও অনুভব করে না। তাহাদের উলটা ভয় দেখানো হয়। কেননা ওসি-এসপি ও ডিসিরা যেইখানে নির্বাচন উঠাইয়া নেওয়ার জন্য আশ্বাস প্রদান করেন, সেইখানে কি আর কিছু লাগে? অতএব, এই সকল দেশের সরকারপ্রধানগুলির সদিচ্ছাকে অর্থবহ করিতে হইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ এবং তৃণমূল পর্যায়ে সেই বার্তা সঠিকভাবে পৌঁছাইয়া দিতে হইবে—যাহাতে তাহারা মনে করেন ইহাই তাহাদের করণীয় বিষয়। তাহা না করিয়া অতি উৎসাহীদের পাল্লায় পড়া বাঞ্ছনীয় নহে। আর যাহা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা করা হয় না, সেই ব্যাপারে কিছু বলিবার প্রয়োজনীয়তা আছে বলিয়া মনে হয় না।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন