ফুটবলের বাণিজ্যিকীকরণে বাংলাদেশ

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৩, ০৪:৩০

নানা রকম খেলাধুলার মধ্যে ফুটবল সবচেয়ে এগিয়ে আছে। শুধু প্রফেশনাল ফুটবল নয়; হাটে, মাঠে, ঘাটে, রাস্তায়—কোথায় এই খেলা চলছে না। ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (ফিফা) হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সারা বিশ্বে ২৫ কোটি ফুটবল প্লেয়ার রয়েছে। ফিফার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখেছে ৩০০ কোটির বেশি মানুষ। এত জনপ্রিয়তা আর কোনো খেলায় দেখা যায় না।

মধ্যযুগে ফুটবলকে শুধু একটি খেলা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কাজের ফাঁকে শুধু বিনোদনের জন্য অনেকেই ফুটবল খেলত। তখন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল গ্রামের সঙ্গে গ্রামের, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের সূচনা হয় ১৯ শতকে, যার গোড়াপত্তন করে ব্রিটেন। তখন এটি শীতকালীন ইভেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এটি সীমাদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন—কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়াতে থাকে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৮৪৮ সালে ফুটবল খেলার নীতিমালা তৈরি করে, যেটি ‘কেমব্রিজ রুল’ নামে পরিচিতি পায়। এরপর নানা ধরনের নিয়মনীতি আসতে থাকে ফুটবলে। এর মধ্যে পেশাদারিত্ব উল্লেখযোগ্য। ফুটবলকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ক্লাব গড়ে ওঠে ব্রিটেনে। বিশেষ করে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরের নাম অনুসারে ক্লাবগুলোর নাম দেওয়া হয়। ১৮৭১ সালে এসে মোট ক্লাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫। বর্তমানে ফুটবলের বাজারমূল্য ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

তবে ফুটবলের উন্নতি ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এর পেশাদারিত্বকে ঘিরে। আজ থেকে ১১৯ বছর আগে ১৯০৪ সালে ফিফা গঠিত হওয়ার পর থেকে বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে মহাযজ্ঞ শুরু হয়। যে খেলাটি ছিল একেবারে শৌখিনতার, সেটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে কয়েক শ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। ক্লাব অবকাঠামো, স্টেডিয়াম, ট্রেনিং গ্রাউন্ড, স্পনসরশিপ, খেলোয়াড় কেনাবেচায় বিলিয়ন ডলারের কমিশন, সম্প্রচার বাণিজ্য, বিজ্ঞাপন আয় প্রভৃতির কারণে ফুটবল আজ উন্নত শিখরে। দেশ থেকে দেশে ও মহাদেশ থেকে মহাদেশে ফুটবলের রাজত্ব বাড়ছে। ফুটবল খেলার কারণেই শুধু একটি দেশ পরিচিতি পেয়েছে এমন উদাহরণও আছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর পরিচিতি অনেকটা ফুটবলকে ঘিরে। সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার দেশগুলোতে ফুটবলের উন্নতির হাওয়া লেগেছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন প্রভৃতি দেশ এখন ফুটবলে ব্যাপক উন্নতি করছে। আমাদের উপমহাদেশেও এর ছায়া পড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ফুটবল গত কয়েক বছরে পেশাদারিত্বের দিক থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। এখানকার বড় বড় উদ্যোক্তা ক্লাব গড়ে তুলে দেশের ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

ফুটবল খেলোয়াড়দের জন্য প্রশিক্ষণ একটি বড় বিষয়। এ তাড়না থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এলিট একাডেমি তৈরি করার কথা মাথায় আসে। রাজধানীর কমলাপুর স্টেডিয়ামে এই একাডেমিতে বেশ কয়েক জন ফুটবলারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এদের সবার বয়স ১৭ বছরের নিচে। সম্পূর্ণ আবাসিক সুবিধাসংবলিত এই একাডেমিতে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। সারা দেশের ৬৪ জেলা থেকে খেলোয়াড় নির্বাচন করেন কোচরা। এখানে এলে তাদের খাওয়াদাওয়াসহ সবকিছু একাডেমি বহন করে। ফুটবলারদের দক্ষতা বাড়ছে। ভারতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব ২০ বছরের টুর্নামেন্টের জন্য ডাক পাওয়া ১২ জন ফুটবলার এলিট একাডেমির। একাডেমির খেলোয়াড়েরা শুধু জাতীয় দল নয়, বিভিন্ন লিগের খেলায়ও অংশ নিচ্ছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটের নামকরা দলগুলো তাদের অর্থের বিনিময়ে নিচ্ছে। বাফুফে এলিট একাডেমিতে নিয়মিত অনুশীলন করে আসছিলেন উদীয়মান ফুটবলাররা। তাদের দিকে চোখ পড়েছিল প্রিমিয়ার লীগের ক্লাবগুলোর। শেষ পর্যন্ত নিলামের আশ্রয় নিতে হয়েছে। স্থানীয় একটি হোটেলে ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাগারিতে মোট ১০ জন খেলোয়াড়কে নিলামে তোলা হয়। প্রথম বারের মতো নিলাম অনুষ্ঠানে গোলকিপার মোহাম্মদ আসিফ মূল্যের দিক দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। বসুন্ধরা কিংস ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকায় তাকে দলে ভিড়িয়েছে। নিলামে মোট ১১টি ক্লাব অংশ নেয়। এগুলো হলো বসুন্ধরা কিংস, আবাহনী, পুলিশ এফসি, মোহামেডান, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, শেখ জামাল ক্রীড়া চক্র, ফর্টিস এফসি, চট্টগ্রাম আবাহনী, রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস অ্যান্ড সোসাইটি, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ থেকে এবার প্রিমিয়ার লিগে উঠে আসা গোপালগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাব।

দুই বছর আগে গঠন করা হয় বাফুফে এলিট একাডেমি, যে একাডেমির ফুটবলারদের চাহিদা এখন তুঙ্গে। একাডেমি করার দুই বছরের মাথায় এসে আমরা মনে করছি, যে উদ্দেশ্যে করেছি, তাতে সফল হয়েছি। আমাদের এখানে প্লেয়ার তৈরি হয়েছে এবং আমাদের ফুটবলারদের চাহিদা আছে। দুই-এক জন বিদেশে যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করছে। এটা আমাদের জন্য বড় অর্জন। এরকম একাডেমিতে কমপক্ষে ৩০০ ফুটবলার থাকা উচিত। এতসংখ্যক খেলোয়াড় যদি থাকত, তাহলে আমরা অনেক খেলোয়াড় সাপ্লাই দিতে পারতাম। যে ছেলেটা সাফে ভালো করেছে এবং প্রীতি ম্যাচে গোল দিয়েছে, সে কিন্তু এই একাডেমির ফুটবলার।

আর্জেন্টিনার ফুটবল দেশটির জিডিপিতে ভূমিকা রাখে। এই যে বিশ্বকাপে ১১-১২ বিলিয়ন নেট আয় করে ফিফা, তাহলে এটা তো অবশ্যই বাণিজ্যিকীকরণ। আমাদের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হলে আগে ফুটবলার লাগবে। আমাদের যখন শক্তিশালী ফুটবলার ও শক্তিশালী টিম থাকবে, তখনই বাণিজ্যিকীকরণ চলে আসবে। এই নিলাম দিয়ে হয়তো আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। এলিট একাডেমির যাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে এর সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।

আমরা এখনো কাঠ-খড় পুড়িয়ে জোড়াতালি দিয়ে একাডেমি চালাচ্ছি। আর্থিক অনটনের কারণে এলিট একাডেমি বন্ধ হয়ে যাবে এমন আশঙ্কা যেমন রয়েছে, একই সঙ্গে এটাও সত্যি যে, কেউ না কেউ এই একাডেমির হাল ধরবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ফুটবল এগিয়ে যাবে।

লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট ও চেয়ারম্যান, ডেভেলপমেন্ট কমিটি, বাফুফে

ইত্তেফাক/এমএএম