বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের ঐতিহ্যের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। স্মরণাতীত কাল থেকেই বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প গৌরবময় ঐতিহ্য টিকে আছে। এক সময় বাংলাদেশে তাঁতিদের হাতে তৈরি মসলিন বিশ্বব্যাপী বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল। মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বস্ত্রের চাহিদা। বাংলাদেশের একদল গবেষক পুনরায় মসলিন কাপড় তৈরি করার চেষ্টা করছেন। তারা প্রাথমিকভাবে সফলও হয়েছেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ হয় তো আবারও মসলিন বস্ত্র রপ্তানি করতে পারবে। তবে তাঁতিরা উন্নতমানের বস্ত্র তৈরি করতে পারলেও এখন আর শুধু তাঁতিদের হাতে তৈরি কাপড়ের ওপর নির্ভর করলে চলে না। এখন বস্ত্রশিল্পে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পোশাক উত্পাদন ও রপ্তানি করছে। এখন দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশেরও বেশি অর্জিত হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
তৈরি পোশাকশিল্পের দুইটি খাত রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ওভেন এবং অন্যটি নিট গার্মেন্টস। এর মধ্যে নিট গার্মেন্টসে রিটেইন পারসেন্টেজ বেশি। বাংলাদেশে তুলা তেমন একটা উত্পাদিত হয় না। ফলে বেশির ভাগ তুলাই আমাদের আমদানি করতে হয়। গত অর্থবছরে (২০২২-২০২৩) তৈরি পোশাক (ওভেন ও নিট) রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে নিট গার্মেন্টস থেকে আর ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আসে ওভেন গার্মেন্টস থেকে। নিট গার্মেন্টসের রিটেইন পারসেন্টেজ হচ্ছে প্রায় ৭০ শতাংশ। আর ওভেন গার্মেন্টসে এ হার হচ্ছে গড়ে ৪০ শতাংশের মতো। ফলে আমাদের দেশে নিট গার্মেন্টস খাতের উন্নয়নের সম্ভাবনা বেশি। গার্মেন্টস রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তৈরি পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার অত্যন্ত বিশাল। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব মাত্র ৭ শতাংশ। তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজারের ২০ শতাংশ চীনের দখলে রয়েছে। ভিয়েতনাম আমাদের কাছাকাছি অবস্থান করছে। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির বাড়ানোর উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পে যারা কাজ করেন, তাদের অধিকাংশই নারী শ্রমিক। নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যেসব নারী তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, তাদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আগত এবং তাদের পেশাগত প্রশিক্ষণ থাকে না। নারী শ্রমিকরা পেশাগতভাবে দক্ষ না হওয়ার কারণে তাদের উত্পাদনশীলতা কম। ফলে তাদের মজুরিও কম।
বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময় তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের উত্সাহ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের কর মওকুফ ও আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে। বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা ধরনের সুবিধা পেয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া কোটাসুবিধা (যা ২০০৫ সালে প্রত্যাহূত হয়) কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সে দেশের বাজারে প্রচুর পরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে সক্ষম হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৯৭৬ সালে জিএসপি (জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) প্রদান করলে বাংলাদেশ শুরু থেকেই এই সুবিধা ভোগ করে ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশে শুল্কমুক্তভাবে তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে থাকে। বর্তমানে একক অঞ্চল হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পরিমাণে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে থাকে। মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় অংশই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই উন্নয়নশীল দেশের প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবে। তারপর তিন বছর জিএসপি অব্যাহত থাকবে। ২০২৯ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেওয়া জিএসপি হারাবে বাংলাদেশ। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন জিএসপির পরিবর্তে জিএসপি+ প্রদান করবে। কিন্তু সেই সুবিধা পেতে হলে যেসব শর্ত মানতে হবে তা বাংলাদেশের পক্ষে পরিপালন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জিএসপি লাভ করেছে। কাজেই ভবিষ্যতে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে অতিক্রম করে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশকে তৈরি পোশাকশিল্প নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে। আমরা তৈরি পোশাকশিল্পের সম্ভাবনার কথা বলতে গেলেই এ দেশে সস্তা শ্রমিক পাওয়া যায়, এটা উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, অপ্রশিক্ষিত এবং অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি কমই হয়। অপ্রশিক্ষিত এবং অদক্ষ শ্রমিকের উত্পাদনশীলতা ও সৃজনশীলতা কম থাকে। কিন্তু ভবিষ্যতে তৈরি পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পণ্যের মান উন্নয়ন ব্যতীত কোনো গত্যন্তর নেই। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য উপযুক্ত এবং প্রশিক্ষিত দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রিন ফ্যাক্টরি রয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ যথেষ্ট ভালো। কিন্তু যদি প্রশিক্ষিত কর্মী সৃষ্টি করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে পারে। এছাড়া তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য শীর্ষ এবং মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্পে মধ্যম এবং শীর্ষপর্যায়ে দক্ষ এবং উপযুুক্ত কর্মকর্তার অভাব রয়েছে।
কোনো শিল্পই উপযুক্ত গবেষণা ব্যতীত পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারে না। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল সেক্টর নিয়ে গবেষণা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যেসব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার প্রতি বছর পাশ করে বেরোচ্ছেন তারা মধ্যম পর্যায়ের ম্যানেজার। আমাদের জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারসহ এ খাতের জন্য দক্ষ লোকবল তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের এই স্থান পূরণের জন্য সচেষ্ট হতে হবে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অনেকেই মনে করেন, বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার বা দক্ষ লোকজন যেভাবে এই শিল্পকে পরিচালনা করতে পারছেন দেশীয় ইঞ্জিনিয়ারগণ তা পারবেন না। এ ধরনের মনোভাব পরিহার করে স্থানীয়ভাবে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারদের বাস্তব ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশি দক্ষ লোকজন যারা এই শিল্পে কাজ করছেন, তারা বছরে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছেন বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাবদ। আমরা যদি স্থানীয়ভাবে তৈরি দক্ষ লোকবল এই খাতে পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যেত না। সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। উত্পাদন খরচ বেশি পড়ছে। ফলে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাগণ অন্যান্য দেশের তুলনায় কম মুনাফা অর্জন করতে পারছেন। আমরা যদি উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে চাই, তাহলে সব ক্ষেত্রেই সততা, দক্ষতা এবং সর্বোচ্চ দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করতে হবে।
তৈরি পোশাকশিল্প থেকে যে রপ্তানি আয় হয় তার একটি বড় অংশই কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং অন্যান্য মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে চলে যায়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। যেসব শিল্প-কারখানা স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে তারা জাতীয় অর্থনীতিতে তুলনামূলক বেশি হারে মূল্য সংযোজন করতে পারে। তৈরি পোশাকশিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশে যে সামান্য পরিমাণ তুলো উত্পাদিত হয় তা দিয়ে তৈরি পোশাক শিল্পের চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব। পাহাড়ি এলাকায় তুলা উত্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার পরও তুলার চাহিদা আমরা স্থানীয়ভাবে পূরণ করতে পারবো না। একটি সূত্র মতে, বাংলাদেশ ২০২২ সালে মোট ১৮ দশমিক ০৩ লাখ টন তুলা আমদানি করে। আগের বছর তুলা আমদানি করা হয়েছিল ১৯ দশমিক ৭৯ লাখ টন। তুলা আমদানি কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে কারখানা মালিকগণ তাদের উত্পাদনক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছেন না। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের কারণে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণ তুলা আমদানি করতে পারছে না। তুলার বিকল্প হিসেবে পাটের সংমিশ্রণ ব্যবহার করা গেলে তুলা আমদানির পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব। আমাদের তুলার বিকল্প কোনো উপকরণ ব্যবহারের চেষ্টা চালাতে হবে। বাংলাদেশের একজন গবেষক ড. মোবারক পাটের গোড়ার অংশ (৭/৮ ইঞ্চি) থেকে আঁশ বের করে তা তুলার সঙ্গে মিশ্রণ ঘটিয়ে সুতা উত্পাদনের এক বিশেষ কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। এটা বেশ কার্যকর কৌশল। তুলার সঙ্গে পাটের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সুতা উত্পাদন করা গেলে সহজেই তুলার বিকল্প হিসেবে পাটকে দাঁড় করানো যাবে। তুলার সঙ্গে পাটের মিশ্রণ ঘটিয়ে সুতা উত্পাদনের যে কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরো পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এ ধরনের উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় সহায়তা না পেলে কখনোই সার্বিকভাবে সফল হতে পারে না। পাটের সংমিশ্রণ পরিবেশবান্ধব বিধায় আন্তর্জাতিক বাজারে এই সুতা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পাবে। আমাদের সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে হবে কী করে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক উত্পাদন করা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে উত্পাদিত পণ্যের গুণমান ঠিক রাখার পাশাপাশি অন্যান্য দেশের তুলনায় কম মূল্যে পণ্য বিক্রির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনায়ম। কিন্তু একে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করতে হলে পরিকল্পিতভাবে এই খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
লেখক: প্রকৌশলী এবং অধ্যাপক সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
অনুলিখন: এম এ খালেক
