মানুষ-ডেঙ্গু ভাইরাস-মশক চক্র

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৩, ০৫:৩০

গত ২০ আগস্ট পালিত হলো বিশ্ব মশা দিবস। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও চিকিত্সক রোনাল্ড রস ১৮৯৭ সালের এই দিনেই আবিষ্কার করেছিলেন পোষক (মানুষ), ম্যালেরিয়া জীবাণু ও মশার (অ্যানোফিলিস) মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক। উন্মোচিত হয়েছিল জনস্বাস্থ্যবিষয়ক মানবজাতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক ঘাতক মশার সঙ্গে লড়াই’ (Fighting the world’s deadliest killer the Mosquito) হ্যাঁ, সত্যিই তো। বিশ্বের পরিসংখ্যান আলোকপাত করলে সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে মশাই বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক ঘাতক। কারণ এই মশা দ্বারাই বিশ্বে বছরে ৭ থেকে ১০ লাখ লোক মারা যায়, যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা মানুষ নামক ঘাতকের চেয়ে ৩ থেকে ৫ লাখ বেশি। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, এই মারাত্মক ঘাতকের বিরুদ্ধে কঠিন যুদ্ধ ঘোষণা করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তবে বুঝতে হবে ঘাতকের শক্তি, পরিষ্কার করতে হবে তার ব্যবহূত অস্ত্র এবং আক্রমণের ধরন, সময় ও তীব্রতা। আর এসব বোঝার পরেই সঠিকভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করা সহজ হবে এবং আশানুরূপ সফলতা আসবে। তা না হলে বারংবার শুধু ব্যর্থতার গ্লানিতেই পর্যবসিত হয়ে শত্রুর আঘাতে অমূল্য প্রাণ হারাতে হবে। স্বীকার করে নিতে হবে মানবজাতির অপূরণীয় ক্ষতি। এ জন্যই পোষক (মানুষ)-জীবাণু (ভাইরাস/অণুজীব)-মশা (বাহক)-এর আন্তঃসম্পর্ক স্পষ্ট করে বুঝতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে এই শত্রুকে বিনাশ করার জন্য ব্যবহূত অস্ত্র কতটা শক্তিশালী, কতটা ব্যবহারের উপযোগী এবং কতটা কার্যকর, তা-ও যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কর্মপদ্ধতি বিজ্ঞানিকভাবেই হতে হবে। এই অতি শক্তিধর শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে যে অতিব চৌকশ সৈন্যবাহিনী দরকার, তার কর্মদক্ষতায় কতটা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা-ও যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাত্, পুরো বিষয়টা আরো স্পষ্ট করে বললে এভাবে বলা যায় পোষক-জীবাণুবাহক আন্তঃসম্পর্ক, মানে মানুষের শরীরে জীবাণু কীভাবে প্রবেশ করছে এবং প্রবেশের বাহক হিসেবে মশা কী ভূমিকা পালন করছে। মশার বহন ও জীবাণুর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য মানুষ আবার কী ধরনের ভূমিকা পালন করছে—সবকিছুরই সুস্পষ্ট ধারণা পেতে হলে অবশ্যই মশার বাহ্যিক গঠন, মানে মশা কোন অঙ্গ দিয়ে মানুষের রক্ত শোষণ করে, এই রক্ত শোষণের জন্য মশাকে কোন কোন পরিবেশের উপাদান, অর্থাত্ তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, বাতাসের গতিবেগ, সূর্যের আলোর তীব্রতা ইত্যাদির সঙ্গে মশার কী সম্পর্ক, সেটা জানতে হবে। অর্থাত্, মশার সেই অঙ্গটির কার্যকারিতা এবং মানুষকে খুঁজে পাওয়ার জন্য মশার যে অঙ্গ বা ধীশক্তি কাজ করে, তার পরিবেশের সঙ্গে কী সম্পর্ক—একই সঙ্গে স্ত্রী মশা কেন রক্ত শোষণ করে—কোন পদার্থের উপস্থিতি অথবা কোন শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের জন্য স্ত্রী মশার জীবন্ত জীবের শরীর থেকে প্রবহমান রক্ত পান করার তীব্রতা অনুভব করে এবং কীভাবে রক্ত পান করে—এতগুলো জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই মশার মরফোলজি, ইকোলজি ও ফিজিওলজি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে। আর এ জন্যই কীটতত্ত্ববিদের বিকল্প কখনই সম্ভব নয় এই শক্তিধর ভয়ংকর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।

এবার আসি মশার দ্বারা বাহিত ভাইরাস বা অণুজীব মশার শরীরের সব শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যবহার করে তার ইনকিউবেশন পিরিয়ড পার করছে। এই সময়ে মশার শরীরের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানসমূহ ভাইরাস বা অণুজীবের রেপ্লিকেশন ও বায়োটাইপে কতটা ভূমিকা রাখছে, যা মানুষের শরীরে রোগ সৃষ্টি ও মৃত্যুতে ভূমিকা রাখছে—এই সম্পর্ক যদি সুস্পষ্ট না হয়, তবে তো ভয়ংকর শক্রর অস্ত্রের তীব্রতা, আক্রমণের ধরন ও আমাদের ঘায়েল করে মৃত্যু নিশ্চিত করার কর্মপদ্ধতি রহস্যাবৃতই থেকে যাবে আর শক্রর অস্ত্রের আঘাতে আমরা মৃত্যুবরণ করতেই থাকব। 

তাই এই রহস্য উন্মোচন করে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু মশা ও এর দ্বারা বাহিত ভাইরাস বা অণুজীবের তীব্র আক্রমণের শিকার থেকে রক্ষা পেতে হলে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে দক্ষ চিকিত্সা কীটতত্ত্ববিদ বা মেটিক্যাল এন্টোমোলজিস্ট ও উন্নতমানের গবেষণাগারের কোনো বিকল্প নেই।

এখন আসি আমাদের প্রচলিত মশক দমন পদ্ধতি, এর কার্যকারিতার জন্য করণীয়। এডিস মশার অস্তিত্ব ও ডেঙ্গু জ্বর রোগতত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে মূলত কীটনাশক অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড একমাত্র মশক দমন পদ্ধতি হিসেবে প্রচলিত। বিবেচ্য বিষয় হলো, মশা নামক ডিপটেরান ইনসেক্টরের সঙ্গে প্রয়োগকৃত কীটনাশকের (অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) সম্পর্ক, এর প্রয়োগ পদ্ধতি, প্রয়োগে ব্যবহূত মেশিনের ড্রপলেট সাইজ, প্রয়োগকারী কর্মীদের প্রায়োগিক জ্ঞান, সময় ও কীটনাশকের মাত্রা প্রভৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা, জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ পর্যাপ্ত কি না। আমরা সবকিছু বন্দোবস্ত করলেও যদি কীটনাশক প্রয়োগ সঠিক পদ্ধতি, পরিমাণ ও সময় অনুয়ায়ী না হয়, তবে তাতে হিতে বিপরীত হবে। অর্থাত্, লার্ভিসাইড প্রয়োগের সময় যদি তীব্র সূর্যের আলোর উপস্থিতি থাকে, তাহলে তার কার্যকারিতা প্রথমেই হারিয়ে ফেলবে, একইভাবে প্রয়োগের পরপরই যদি ভারী বৃষ্টিপাত হয়, তবে তা অন্যান্য উপকারী জলজ প্রাণীর জন্য চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কীটনাশক প্রয়োগে ড্রপলেট সাইজ যদি যথার্থ না হয়, তবে অবশ্যই তা কার্যকারিতা হারাবে। কীটনাশক কত মাত্রায় কোথায় কোথায় প্রয়োগ করতে হবে, তা সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী যদি না হয়, তা অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত ফল আনবে না। আর এই সব ধরনের কার্যক্রম যদি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে মনিটরিং করা না হয়, তবে কখনোই আশানুরূপ ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে অভিজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে সার্ভে কার্যক্রম পরিচালনা করে সেই ভিত্তিতে মশার ঘনত্ব অনুসারে, কীটতত্ত্ববিদদের দ্বারা সঠিক মুড অব অ্যাকশনের কীটনাশক (অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) নির্বাচন করে সব কীটনাশক প্রয়োগকারী কর্মীকে যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান-পূর্বক শক্তিশালী মনিটরিং শেলের তত্ত্বাবধানে কীটনাশক প্রয়োগেই আনতে পারে আশানুরূপ সফলতা। তবে তার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ ও অধিদপ্তরের সঙ্গে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্পৃক্ততায় সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমরা এই মারাত্মক শত্রুর ভয়ংকর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারি।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান (নিপসম), মহাখালী, ঢাকা

ইত্তেফাক/এমএএম