একদিকে জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতি অন্যদিকে কৃষিজমির কমে যাওয়া—এই দুই বৈপরিত্যের মাঝে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার অসামান্য কাজটি করে চলছেন আমাদের কৃষক ও কৃষিবিদরা। কিন্তু কথা হলো আগামী দিনে কেমন হবে আমাদের কৃষি? যেহেতু আমাদের অর্থনীতি এখনো নির্ধারিত হয়ে থাকে কৃষির উত্পাদনের হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর।
একসময় ‘ভাতের ওপর চাপ কমান, বেশি করে আলু খান’—এইরকম একটা স্লোগান বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। পরে পুষ্টি বেশি বিবেচনায় রুটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বর্তমানে স্বাস্থ্য সচেতনতা, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব, রুচি ইত্যাদি কারণে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আসছে। গবেষকেরা দাবি করছেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং ক্যান্সার বেশি হচ্ছে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই হার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ব্যয় জরিপ-২০২২ প্রতিবেদন অনুযায়ী মানুষের খাদ্য গ্রহণে পরিবর্তন এসেছে। প্রধান খাবার ভাতের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। তবে মোট খাদ্যগ্রহণের হার সামান্য বেড়েছে। অন্যদিকে ডাল, শাকসবজি, মাংস ও ফল খাওয়ার পরিমাণও বেড়েছে। এর ফলে বেড়েছে খাদ্য ক্যালরি এবং প্রোটিন গ্রহণের হারও।
আমরা প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ গ্রাম ভাত খাচ্ছি, সেখানে পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ ২০০ গ্রামের বেশি ভাত খায় না। জাপানিদের প্রধান খাবার ভাত হলেও তারা আমাদের চেয়ে অনেক কম ভাত খায়। অনেকে আবার শাকসবজি খেয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। আমাদেরও ভাতের পাশাপাশি সম্পূরক খাদ্য হিসেবে ধীরে ধীরে আলু বা অন্য কোনো ধরনের শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হতে হবে। চালের বিকল্প হিসেবে ভুট্টা, গম এবং আলুর বিকল্প ইয়াম, কাসাভা চাষে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কৃষকদের এসব কৃষিপণ্যের আবাদে উদ্বুদ্ধ করতে হবে কৃষিঋণ সহায়তা দিয়ে। বিকল্প খাদ্যপণ্যের উত্পাদন ব্যয় চালের উত্পাদন ব্যয়ের চেয়ে কম না পড়লে মানুষ ভাতের বিকল্প খাদ্য হিসেবে সহজে তা গ্রহণ করবে না।
চিকিত্সা বিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ ৩৬ জন বিজ্ঞানীর একটি দল, যেখানে কৃষি থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সেইসঙ্গে পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা ছিলেন। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন বিষয়ে টানা দু’বছর গবেষণা করে বলছেন, যেসব খাবারে আমাদের প্লেট ভরিয়ে রাখি, সেখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার বলে তারা মনে করছেন। তাদের পরামর্শ হলো মাংসের পরিমাণ কমিয়ে বিকল্প প্রোটিনের উত্স খোঁজা। যেসব পুষ্টিকর খাবার আমরা এড়িয়ে যেতে চাই সেগুলোর প্রতি আগ্রহ জন্মানোর ওপরও তারা জোর দেন। কেউ যদি প্রতিদিন মাংস খায় তাহলে তার ডায়েটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি। তার মানে এই না যে, মাংসই খাওয়া যাবে না। মাংস খাওয়া যাবে, তবে পরিমিত হারে। যেমন লাল মাংসের কোনো খাবার যেমন বার্গার যদি খেতেই হয় তাহলে সেটা সপ্তাহে একদিন। এছাড়া সপ্তাহের অন্য আরেক দিন মাছ বা মুরগির মাংস দিয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটানো যায়। বাকি দিনগুলো প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে হবে বিভিন্ন উদ্ভিদজাত খাবার খেয়ে। এক্ষেত্রে গবেষকরা প্রতিদিন বাদাম, দানাশস্য বা ডাল খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অক্সিজেনের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে খাবার। রেস্টুরেন্টের বদৌলতে নানা স্বাদের খাবারও আজকাল খাবার সুযোগ মিলছে। কিন্তু এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাবার নষ্ট আর অপচয় হওয়া। অথচ বিশ্বে প্রতিনিয়ত বাড়ছে খাবারের চাহিদা, প্রচুর খাবার নষ্ট হওয়ার পরেও অভুক্ত থেকে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে খাবার নষ্ট বা অপচয় বাসা-বাড়িতেই বেশি হয়। কিন্তু বাস্তবে খাবার ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর অনেক আগে থেকে নষ্ট হওয়া শুরু। খাদ্য উত্পাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত বেশ লম্বা একটি প্রক্রিয়া কাজ করে। সবচেয়ে বেশি খাবার নষ্ট হয় এই পর্যায়েই। তবে যেসব দেশ প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগিয়ে তাদের এই ক্ষেত্রে নষ্ট হওয়ার পরিমাণ অন্যান্য দেশের থেকে কম স্বাভাবিকভাবেই।
শুধু খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট নয়। খাবারের ফলে সৃষ্ট বর্জ্যের হার কমিয়ে আনা, সেইসঙ্গে বিদ্যমান জমিতে বাড়াতে হবে খাদ্যের উত্পাদন এবং কমাতে হবে খাবারের অপচয়ও।
লেখকঃ উপ-পরিচালক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
