বাড়ছে উষ্ণায়ন, খুঁজতে হবে উপায়

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৫:৩০

তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, সেক্ষেত্রে বিশ্ব জুড়ে দাবানল এক-তৃতীয়াংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খরার কারণে বিশ্বের ৮০ থেকে ৩০০ কোটি মানুষ তীব্র পানিসংকটে পড়তে পারে। আর বৈশ্বিক উষ্ণায়নে পৃথিবীর তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে এই শতকের শেষ নাগাদ চরম আবহাওয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা পাঁচ গুণ বেড়ে যাবে। বিশ্ব জুড়ে ২৯ শতাংশ গাছ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে  যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বের সব জায়গাতেই বৃদ্ধি পাচ্ছে গড় তাপমাত্রা। আর তাপ বাড়ার বিরূপ প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনে, প্রকৃতিতে, জীব ও উদ্ভিদ জগতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’য় গডার্ড ইনস্টিটিউটের গবেষণা মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রতি বছর তার পূর্ববর্তী বছরের রেকর্ড ভেঙে বেড়েই চলেছে। কিছু দিন আগে ‘সারফেস এয়ার টেম্পারেচারের’ নিরিখে বিশ্বের উষ্ণতম দিন বলা হয়েছিল ৫ জুলাইকে। ঐ স্কেলে অর্থাত্ ভূপৃষ্ঠের ২ মিটার ওপরে আমাদের আশপাশের যে বাতাস, তার তাপমাত্রা ছিল ১৭ দশমিক ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।  আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ‘এই তাপমাত্রা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে।’ উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো গরমের নিরিখে নিত্যনতুন রেকর্ড করে চলেছে। ইতালি, স্পেনে কমবেশি ৪০ ডিগ্রির মতো থাকছে তাপমাত্রা। অত্যধিক শুষ্কতায় গ্রিসে দাবানল ছড়িয়েছে। সুইজারল্যান্ডের তাপমাত্রাও ঊর্ধ্বমুখী। জাপানের রাজধানী টোকিওসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ইরাকের তাপমাত্রাও ছাড়িয়েছে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জ্বলছে কানাডার বনাঞ্চল। অস্ট্রেলিয়ায় পুড়ছে লাখ লাখ একর বন। বন্যায় ক্ষতবিক্ষত ভারত, চীন ও পাকিস্তান। তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত চরম পরিস্থিতির ফলে অস্থির ও উষ্ণ পৃথিবীতে মানুষ, উদ্ভিদ ও জীবের বসবাস করাটাই কঠিন ও কষ্টকর হয়ে যাবে। কারণ, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করলে জলবায়ুর অভিযোজন সম্ভব হবে না। মানুষ ও প্রাণীসমূহ চরম প্রাকৃতিক বৈরিতার মুখে স্বাভাবিক অভিযোজনের ধারা থেকে বিরূপ পরিস্থিতিতে ছিটকে পড়বে, যা থেকে উদ্ধার পেয়ে প্রাণধারণ করাই প্রচণ্ড কষ্টকর ও চ্যালেঞ্জিং হবে মানুষের, গাছপালা ও জীবজন্তু-কীটপতঙ্গের জন্য। গবেষণা বলছে, চলতি শতকে তীব্র তাপজনিত কারণে শুধু ইরাকেই মৃত্যু হতে পারে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের।

পরিবেশবাদী, বিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন, এই হারে তাপ বৃদ্ধির ধারা চলতে থাকলে তার প্রভাব মোকাবিলা করা মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপরও তাপ বৃদ্ধির ভয়ানক প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। বৈশ্বিক উত্পাদন ও খাদ্য মজুত কমে যাবে। প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গলতে থাকবে মেরু অঞ্চলের জমাট বরফ। এতে অনেক দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাবে। অনেক অঞ্চল অনাবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের কারণে মরুভূমিতে পরিণত হবে। মানুষের জীবন যাপন হয়ে পড়বে চরম দুর্বিষহ। গরমের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ২২ হাজার ৮০০ কোটি শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এর আর্থিক মূল্য ২৮ থেকে ৩১ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। মাথাপিছু শ্রমঘণ্টা নষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে ৫ নম্বরে। বাংলাদেশে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি শ্রমঘণ্টা। মাথাপিছু হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫৪ শ্রমঘণ্টা। জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-২০২১ সালের রিপোর্ট মতে, এই শতকের শেষ নাগাদ পৃথিবীর ওপরিভাগের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, তা আগামী দেড় দশকেই পেরিয়ে যাবে। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশেই রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া পৃথিবীর সব অঞ্চলেই দেখা দিচ্ছে অতিবৃষ্টি ও বন্যা। জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন করে মানুষ পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে এরই মধ্যে প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়ে ফেলেছে। গড়ে প্রতি দশকে মানবসৃষ্ট কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে ০ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরই মধ্যে বিশ্ব একটি জলবায়ুসংকটের ভেতর পড়ে গেছে। প্রতিবেদন মতে, প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অতিবৃষ্টির হার বাড়ে ৭ শতাংশ। বাড়ে শক্তিশালী সাইক্লোনের হার।

জাতিসংঘ বলছে, গত বছর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ রেকর্ড স্তরে পৌঁছেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাদের ধারণা গত ৮ লাখ বছরের মধ্যে পৃথিবীর বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ এখন সবচাইতে বেশি। শিল্পকারখানায় ব্যবহূত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণ হয়ে বাতাসে মিশছে, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে প্রধান গ্রিনহাউজ গ্যাস কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের বার্ষিক গড় দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৪১০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন), ১৮৬৬ পিপিবি (পার্টস পার বিলিয়ন) ও ৩৩২ পিপিবি। তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, সেক্ষেত্রে বিশ্ব জুড়ে দাবানল এক-তৃতীয়াংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খরার কারণে বিশ্বের ৮০ থেকে ৩০০ কোটি মানুষ তীব্র পানিসংকটে পড়তে পারে। আর বৈশ্বিক উষ্ণায়নে পৃথিবীর তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে এই শতকের শেষ নাগাদ চরম আবহাওয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা পাঁচ গুণ বেড়ে যাবে। বিশ্ব জুড়ে ২৯ শতাংশ গাছ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ২০৪৫ সালের মধ্যে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপ প্রবাল শূন্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে নানা রকমের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ধরা হয়েছিল শীর্ষবিন্দু। সেই মাপকাঠি বেশ আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, অতি যান্ত্রিকীকরণের কুপ্রভাবে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য বিনষ্টের কারণে চলতি একুশ শতকেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করবে। যান্ত্রিকীকরণের মাত্রা ও হার এতটাই প্রবল হয়েছে যে, বায়ু ও পরিবেশদূষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুরো পৃথিবী অগ্নিগর্ভ ও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গাছপালা কর্তন, নদী-খাল ভরাটের মতো কাজও অবাধে চলছে প্রবৃদ্ধি অর্জনের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে। পরিবেশবান্ধব নীতি ও কর্মসূচি গৃহীত না হলে অচিরেই যে তাবত্ পৃথিবী অসহনীয় অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হবে, সে ধারণা অনেকের মধ্যেই নেই। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সম্পাদিত প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। কোনোভাবেই যেন পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম না করে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এরও আগে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ‘কিয়োটো প্রটোকল’-এও বৈশ্বিক তাপমাত্রা সীমিত রাখার অঙ্গীকার করা হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন তীব্রভাবে কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে সীমাবদ্ধ রাখার এখনো সময় আছে। এজন্য দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। এছাড়াও মানুষকে আরো সচেতন হতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

ইত্তেফাক/এএইচপি