রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর বিকল থাকায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যালের (শেবাচিম) রোগীদের বাইরের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে বিপুল অর্থ খরচ করে এমআরআই, এক্সরেসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে। দরিদ্র রোগীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার এত বিপুল ব্যয়ভার মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল বিশেষায়িত এ হাসপাতালে যুগ যুগ ধরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। এখানে চিকিৎসক থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী—প্রায় সকলেই ডায়াগনস্টিক, প্রাইভেট হাসপাতালসহ চিকিৎসা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা এসব প্রাইভেট ব্যবসায় যুক্ত হয়ে যে যেভাবে পারছেন অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছ থেকে চিকিৎসার নামে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। শেবাচিম হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে বাড়তি টাকা গুনেও তদবির ছাড়া চিকিৎসা তো দূরের কথা পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরও দেখা মেলে না। অভিযোগ রয়েছে এসব সিন্ডিকেটের কারসাজির মাধ্যমে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাবে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালটিতে। দীর্ঘদিন যাবত এ হাসপাতালের রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতিগুলো বিকল হয়ে পড়ে আছে। আর এই সুযোগে হাসপাতালের সামনের ডায়াগনস্টিকগুলো প্রতিদিনই ফুলেফুপে উঠছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগ নির্ণয়ের যেসব যন্ত্রপাতি বিকল রয়েছে সেগুলো সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করছেন তারা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিক্যালের একটি মাত্র এমআরআই যন্ত্র ছয় বছর ধরে বিকল। দুটি সিটিস্ক্যান যন্ত্র একসঙ্গে নষ্ট হয় আরও দুই বছর আগে। দুই মাস আগে একটি চালু হলেও তা চলছে সেখানকার কর্মরতদের মেজাজ-মর্জি অনুযায়ী। বিশেষ তদবির ছাড়া সেখান থেকে সিটিস্ক্যান করানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী। পাঁচটি আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রের মধ্যে তিনটিই অচল তিন বছর ধরে। দুটি যন্ত্র দিয়ে আন্তঃ ও বহির্বিভাগের রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেহাল অবস্থা এক্সরে বিভাগের। ১৩টি এক্সরে যন্ত্রের মধ্যে ১০টিই বিকল। বাকি তিনটি চালু থাকলেও ফিল্ম জটিলতায় বন্ধ রয়েছে এক্সরে বিভাগ। রেডিওলোজি বিভাগের প্রধান ডা. সরজিত্ কুমার মণ্ডল ইত্তেফাককে জানান, ফিল্মের মধ্যে ছোট-বড় রয়েছে। আমরা এক্সরের জন্য ছোট ফিল্মের চাহিদাপত্র দিয়েছিলাম। কিন্তু বড় দামি যে ফিল্ম সরবরাহ করা হয়েছে তা দিয়ে এক্সরে করা হলে সরকারের লোকসান গুনতে হবে। বিষয়টি পরিচালককে অবহিত করা হয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, যে ফিল্ম সরবরাহ রয়েছে তা মেয়াদ উত্তীর্ণের পূর্বে ব্যবহার করার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। তাছাড়া ঐ ফিল্মের ওপর ‘এক্সরে করার জন্য তৈরি’ কথাটি লেখা রয়েছে। কিন্তু তার পরও এ কাজে গাফিলতি করায় বর্তমানে এক্সরে বিভাগটি বন্ধ রাখা হয়েছে। অপরদিকে এক্সরে বিভাগে কর্মরত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিকল ১০টির মধ্যে পাঁচটি এক্সরে মেশিন ২০১৪ সালে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে বাকিগুলো মেরামত করে চালানো সম্ভব। হাসপাতালের ইকোকার্ডিওগ্রাম মেশিন বিগত তিন মাস নষ্ট থাকার পর চালু হলেও সেখানে চিকিৎসা হয় চিকিৎসকদের ইচ্ছের ওপর। ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হয় ২০১৪ সালের জুনে। তবে এটি বন্ধ থাকায় মাঝে টানা তিন বছর এনজিওগ্রামও বন্ধ ছিল। যন্ত্রটি বারবার মেরামত করে সচল রাখতে হচ্ছে। ২০১৭ সালে স্থাপন করা ক্যানসারে আক্রান্তদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কোবাল্ট-৬০ মেশিনও নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ে অনেক বারই চিঠি দিয়েছি, যে কারণে দুই-একটি মেশিন ঠিক করা হয়েছে। বাকি যেগুলো আছে সেগুলো ঠিক করার মতো নয়; সেগুলো মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অকশনে দেওয়া হবে। এরপর হয়তো নতুন মেশিন পাওয়া যাবে। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে যাতে আমাদের চাহিদানুযায়ী মেশিনগুলো ঠিক করা যায় এবং রোগীদের সেবা প্রদান করা যায়। এছাড়া এনজিওগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এক্সরেসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভাগগুলোতে কর্মরতরা আন্তরিক হলে আরও সেবা দেওয়া সম্ভব।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ১ হাজার বেডের এই হাসপাতালে প্রতিদিন ২ হাজারেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকে। এছাড়া আউটডোরেও সমসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে। গ্রামের এসব সহজ-সরল মানুষের সঙ্গে প্রতারণার জন্য রয়েছে প্রশিক্ষিত দালাল। এসব দালালের মাধ্যমে রোগী ও স্বজনদের হাসপাতাল থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বাইরের বেসরকারি বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে তাদের কাছ থেকে খসানো হয় মোটা অঙ্কের টাকা। একাধিক রোগী ও স্বজনরা জানান, হাসপাতালে ভর্তির পরপরই কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে তাদের হাতে লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দেন। তাদের জানিয়ে দেওয়া হয় হাসপাতালের মেশিন নষ্ট, তাই এসব পরীক্ষা বাইরের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে করাতে হবে।
