রাশিয়ানরা তাদের দেশে ড্রোন হামলা সম্পর্কে কী ভাবছে?

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৫:০০

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে, গত শুক্রবারসহ, রাশিয়া ক্রমবর্ধমানভাবে ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। ইউক্রেন হামলা করার পর মস্কো অতিদ্রুত তার চারটি প্রধান বিমানবন্দর বন্ধ করে দিয়েছে। বিবিসি জানিয়েছে, এ বছর ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে রাশিয়া ও তার দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ১৪০টিরও বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার মধ্যে এটা ছিল সর্বশেষ। ইউক্রেনীয় সৈন্য রাশিয়ার ভূখণ্ডে অভিযান এবং সীমান্ত শহরগুলোতে গোলাবর্ষণের জন্য দায়ী। এসব হামলা যুদ্ধটাকে রাশিয়ানদের ঘরে নিয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবং এখন পর্যন্ত এসব কার্যক্রম যে রাশিয়ার জনসাধারণদের ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতি নিরুত্সাহী করে তুলছে, সে বিষয়ে খুব বেশি প্রমাণ নেই। 

তার মানে কি ড্রোন হামলা কৌশলগতভাবে অর্থহীন? একদমই না। এগুলো কেবল একটি ভিন্ন উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দেয়। যদিও ইউক্রেন সরকার এখনো ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেনি। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মন্তব্য করেন যে তারা একদম ন্যায্য ও ন্যায়সংগত কারণে লড়াই করছেন। ইউক্রেনীয় সৈন্যরা প্রায়ই বোমা হামলার শিকার হয়। এখন ইউক্রেনীয় সৈন্যদের পালটা আক্রমণ ইউক্রেনীয় জনসাধারণের মনোবল বাড়াতে সাহায্য করবে। এটা রাশিয়ার জনগণকে যুদ্ধের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে এবং দেশকে সুরক্ষিত রাখতে কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করতে প্ররোচিত করবে।

অন্য কথায়, ইউক্রেন একটা অমানবিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের অভ্যন্তরীণ সহনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং সেই সঙ্গে রাশিয়ান জনসংখ্যাকে পুনঃ রাজনীতিকরণের জন্য কাজ করছে। রাশিয়ার এই যুদ্ধ মূলত এমন কিছু নিষ্ক্রিয় দর্শক সমর্থন করে, যারা বর্তমান রাশিয়ার শাসনকে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং যুদ্ধের পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করতে চায় না।

ক্রেমলিনের এমন নিষ্ক্রিয়  সমর্থন বাদ দেওয়ার পরিবর্তে নতুন করে সাজানো হচ্ছে। কেন তা বোঝার জন্য কেবল যুদ্ধের অন্যান্য বিশিষ্ট সক্রিয় সমর্থকদের দিকে তাকালেই হবে। এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সমর্থকেরা রাশিয়ার রাজনৈতিক হুমকি হয়ে উঠেছে এবং ক্রেমলিনের সামরিক অক্ষমতার তীব্র সমালোচক হয়ে উঠেছে, যেমনটা ওয়াগনার প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোশিনের বিদ্রোহ এবং সম্প্রতি দোষী সাব্যস্ত যুদ্ধাপরাধী ইগোর গিরকিনের গ্রেফতার দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, যাকে ২০১৪ সালে পূর্ব ইউক্রেনের ওপর মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭ ভূপতিত করার মূল হোতা হিসেবে একটি ডাচ আদালতে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

ক্রেমলিন এই যুদ্ধের সমালোচকদের কথা বলা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। কারণ তারা যুদ্ধে সৈন্য সুসংগঠিত করতে এবং কঠিনতম যুদ্ধের জন্য সৈন্যদের অনুপ্রাণিত করতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা মেশিন নিজেই গত দুই দশক রাশিয়ার জনগণকে নিষ্ক্রিয় করতে ব্যস্ত ছিল। তাদের বোঝানো হয়েছিল, রাজনৈতিক চাল এমন একটা বিষয়, যা শুধু তাদের সঙ্গেই খেলা হয়।

এছাড়া ভয় নিষ্ক্রিয়করণ ও শান্তকরণ উভয় ভূমিকা পালন করে। যদিও যুদ্ধবিরোধী মতবিরোধের জন্য বন্দি হওয়া লোকের সংখ্যা কম (জনসংখ্যার তুলনায়), শাস্তির নির্মম প্রকৃতি (যেমন যুদ্ধবিরোধী সমালোচনার জন্য ভ্লাদিমির কারা মুর্জাকে ২৫ বছরের সাজা) অনুমিত ‘অপরাধ’ অন্যদের মুখ বন্ধ করে রাখে, যারা ক্রেমলিনের জন্য রাজনৈতিক হুমকি হতে পারে।

যদিও ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রাশিয়ানদের মনে কারাবাসের ভয় কমাতে পারবে না। অবশ্য তারা রাশিয়ানদের জন্য যুদ্ধ সম্পর্কে চিন্তা না করাকে আরো কঠিন করে তুলছে, বিশেষ করে যদি সেই যুদ্ধ তাদের নিজেদের ঘর বা জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

রাশিয়ানদের মধ্যে বড় একটা অংশ এসব আক্রমণ সম্পর্কে সচেতন এবং এই আক্রমণগুলো রাশিয়ার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। সীমান্ত অঞ্চলের অসংখ্য প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে স্থানীয় জনগণ রাশিয়ার সরকারের দ্বারা পরিচালিত যুদ্ধ সমর্থন করে না এবং ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ইউক্রেন আক্রমণের ঘোষণা অল্প সময়ের জন্য হলেও দেশব্যাপী সমালোচিত হয়েছিল। 

যুদ্ধের দ্বারা আপনি যত বেশি ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত হবেন, তত বেশি সম্ভাবনা রয়েছে যে আপনি রাশিয়া রাষ্ট্রের জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যর্থতার জন্য বিরক্ত হবেন এবং দাবি করবেন সাধারণ মানুষ রাজনীতির বাইরে থাকুক এবং রাজনীতিবিদেরা তাদের জীবন থেকে দূরে থাকুক।

কিন্তু এখনো দেশব্যাপী পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় যে ইউক্রেনীয় হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার সমর্থন আরো বেড়ে গেছে। রাশিয়ার জনগণ এসব আক্রমণের জন্য রাগ না দেখিয়ে উলটো দুঃখ প্রকাশ করছে। এটা ইউক্রেনের সক্ষমতার ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লোকের ওপর পরিসংখ্যান চালিয়ে জানা যায়, ইউক্রেনের জনগণ মনে করে  ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত করার মতো এখনো পর্যাপ্ত আক্রমণ এবং ড্রোন হামলা করা হয়নি।  তবে এটা আরো একটা জটিল সমস্যাকে আড়াল করে রাখে।

এমনকি যদি রাশিয়ার জনগণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে যেতে শুরুও করে, তার মানে এটা নয় যে তারা বিশ্বরাজনীতিতে রাশিয়ার ভূমিকাকে কীভাবে দেখে বা এই বিশ্বে ইউক্রেনের অধিকারকে কীভাবে দেখে, তার পরিবর্তন ঘটবে। সর্বোচ্চ এটা হতে পারে যে তারা এই যুদ্ধের জন্য কিছু ব্যক্তিগত খরচ দিতে অসম্মতি প্রকাশ করবে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়ার জনগণ চাইলেই যে প্রেসিডেন্ট পুতিন যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এমন অসংগতির পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, পুতিন নিজেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করেন। পুতিনের ক্ষমতা থেকে অপসারণকে রাশিয়া রাষ্ট্রের পতন হিসেবে দেখা হবে। রাশিয়ান সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রের পতনকে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। এটা পুতিনের বিরুদ্ধে যেকোনো আমূল পরিবর্তনকে রুখে দেবে। প্রেসিডেন্ট পুতিন অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে প্রচারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এই ভয় দেখান যে তার পতন রাশিয়াকে ১৯৯০-এর অনাচার, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, পুতিনকে কখনোই তার ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রাশিয়ার জনগণ সামরিক অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও ব্যর্থতার জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু বা সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভকে দায়ী করে। পুতিনকে কেউ কখনো ব্যর্থ দাবি করতে পারে না।

দায়িত্ব এড়ানোর ক্ষেত্রে পুতিনের মতো ট্যালেন্টেড আর্টিস্ট খুঁজে পাওয়া যাবে না। জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট পুতিন রাশিয়ার গভর্নরদের তাদের নিজস্ব স্থানীয় বেসরকারি সামরিক সংস্থা তৈরি করার আইনি অধিকার দিয়েছেন, যার অর্থ রাশিয়ার ভূখণ্ডে আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যর্থতা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় না হয়ে একটি স্থানীয় শাসকসংক্রান্ত সমস্যা হয়ে উঠেছে।

এসব কারণে ইউক্রেন শুধু ড্রোন হামলা করে এবং সীমান্তে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে রাশিয়ানদের যুদ্ধের বিরুদ্ধে পরিণত করার বিষয়টাকে অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেন যা করতে পারে তা হলো, গোপনে রাশিয়ানদের মনে একটা শঙ্কা তৈরি করা, যাতে তারা বুঝতে পারে যে তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যদিও পুতিনের জীবদ্দশায় এমন কোনো মুহূর্ত আসার সম্ভাবনা নেই।

ততক্ষণ পর্যন্ত ইউক্রেনের পালটা আক্রমণের সবচেয়ে বড় অর্জন হবে তার নিজের জনগণের মনোবল বাড়ানো। ইউক্রেনের বিজয়ের জন্য পশ্চিমা সমর্থনের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনের সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ করতে পশ্চিমা দেশগুলো আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এক্ষেত্রে ইউক্রেনকে কার্যকর কৌশল অবলম্বন করতে হবে।

রাশিয়ার মতো ইউক্রেনের জনসংখ্যা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় নয়, যেটা তারা ইতিমধ্যে নিজেদের সার্বভৌমত্বের জন্য বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনীয় জনগণ অতিমানব নয়। নিজেদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করে জয় ছিনিয়ে আনার আশা করা খুব বেশি যুক্তিযুক্ত নয়।

এসব ড্রোন হামলা হয়তো রাশিয়ার জনগণকে এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য করতে পারবে না। কিন্তু এই আক্রমণ ইউক্রেনের সবচেয়ে পবিত্র এবং কৌশলগত সম্পদ ইউক্রেনের জনগণের মধ্যে অসীম সাহস ও মনোবল সঞ্চার করতে পারবে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন না করার কারণে ক্রমশ কমে আসছিল।  

লেখক: ইয়াদ ম্যাকগ্লিন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একজন সিনিয়র সহযোগী

সিএনএন থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুন

 

ইত্তেফাক/এমএএম