নূর মোহাম্মদ শেখ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান 'বীরশ্রেষ্ঠ' উপাধিতে ভূষিত করা হয় তিনি তাদের অন্যতম।
১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল জেলার মহিষখোলা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে নূর মোহাম্মদ শেখ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোহাম্মদ আমানত শেখ ও মাতা জেন্নাতুন্নেসা। অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে শৈশবেই ডানপিটে হয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সপ্তম শ্রেণীর পর আর পড়াশোনা করেননি।
কৈশোরে তিনি নাটক থিয়েটার খুব পছন্দ করতেন। ১৯৫২ সালে নিজ গ্রামেরই এক কৃষক ঘরের মেয়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে (তোতাল বিবি) বিয়ে করেন। তখন তার বয়স মাত্র ১৬ বছর ও স্ত্রী তোতাল বিবির বয়স মাত্র ১২ বছর। তিনি দুই সন্তানের বাবা ছিলেন। ১৯৫৪ সালের শেষের দিকে তার প্রথম সন্তান হাসিনা খাতুন ও ১৯৬৪ সালের ১৫ নভেম্বর তার দ্বিতীয় সন্তান শেখ মো. গোলাম মোস্তফা জন্মগ্রহণ করেন।
যুবক নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর-এ যোগদান করেন। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমান্তে চাকরি করে ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই নূর মোহাম্মদকে দিনাজপুর থেকে যশোর সেক্টরে বদলি করা হয়। এরপর তিনি ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮নং সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধ চলাকালীন যশোরের শার্শা থানার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সুতিপুরে নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাহিনীর সামনে যশোর জেলার গোয়ালহাটি গ্রামে নূর মোহাম্মদকে অধিনায়ক করে পাঁচ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হঠাৎ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পেট্রোলটি তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা গুলিবর্ষণ করা হয়। তবুও পেট্রোলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এক সময়ে সিপাহী নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে নূর মোহাম্মদ নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেন ও হাতের এলএমজি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করলে, শত্রুপক্ষ পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। হঠাৎ করেই শত্রুর মর্টারের একটি গোলা তার ডান কাঁধে লেগে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন।
শত্রুর গোলায় আহত হওয়া নান্নু মিয়াকে বাঁচানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন নূর মোহাম্মদ শেখ। হাতের এলএমজি সিপাহী মোস্তফাকে দিয়ে নান্নু মিয়াকে নিয়ে যেতে বললেন ও মোস্তফার রাইফেল চেয়ে নিলেন। যতক্ষণ ওরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে সক্ষম হন ততক্ষণ পর্যন্ত রাইফেল চালিয়ে শত্রুসৈন্যকে ঠেকিয়ে রাখবেন এবং শত্রুর মনোযোগ তার দিকেই কেন্দ্রীভূত করে রাখবেন এইভাবে। অন্য সঙ্গীরা অনুরোধ করলেন তাদের সাথে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু তাকে বহন করে নিয়ে যেতে গেলে সবাই মারা পড়বে এই আশঙ্কায় তিনি রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে রাজি হলেন না। বাকিদের আদেশ দিলেন তাকে রেখে চলে যেতে। শেষ পর্যন্ত তার আদেশ অনুসরণ করে তাকে রেখেই নিরাপদে সরে গেলেন সবাই। রক্তাক্ত নূর মোহাম্মদ সমানের দিকে গুলি ছুড়তে লাগলেন। একদিকে পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনী, সঙ্গে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্র, অন্যদিকে মাত্র অর্ধমৃত সৈনিক (ইপিআর) যার সম্বল একটি রাইফেল ও সীমিতগুলো।
এই অসম অবিশ্বাস্য যুদ্ধে তিনি শত্রুপক্ষের এমন ক্ষতিসাধন করেন যে তারা এই মৃত্যুপথযাত্রী বীর যোদ্ধাকে বেয়নেট চার্জ করে চোখ দুটো উপড়ে ফেলে ও মস্তক বিদীর্ণ করে ঘিলু ছড়িয়ে ফেলে। পরে প্রতিরক্ষার সৈনিকরা এসে পাশের একটি ঝাড় থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে। এই বীর সৈনিককে পরবর্তীতে যশোরের শার্শা থানার গোড়পাড়া থেকে নয় কিলোমিটার দূরে কাশিপুর গ্রামে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছেই সমাহিত করা হয়।

শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন এমরান: আইনমন্ত্রী
ইউনূস ইস্যুতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া শুরু
দেশে ফিরেছেন লিবিয়ায় আটকে পড়া ১৫১ বাংলাদেশি