সময়ের চাহিদা ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৫:৩০

মাঝেমধ্যেই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়; তা হলো, দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়ার মান কেমন? তারা কি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে? আমি একজন শিক্ষাবিদ ও সমাজের সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার আগে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের পদ্ধতি এবং কৌশল সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া জরুরি। প্রথমেই প্রশ্ন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কি ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাদানের জন্য উপযুক্ত ছিল না? স্মর্তব্য, আর্থসামাজিক সব ক্ষেত্রেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ শুধু যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি অর্জন করেছে তা নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এগিয়েছে। প্রায় শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। সরকার শিশুদের বিদ্যার্জনে, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের বিনা বেতনে উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করেছে। শিক্ষাস্তরের প্রতিটি পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে বিপুলভাবে। বর্তমানে প্রতি বছর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে যত ছাত্রছাত্রী পাশ করে বেরোচ্ছে, আগে সেটা কল্পনাও করা যেত না। যেসব শিক্ষার্থী প্রতি বছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বেরোচ্ছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সবাইকে সংকুলান করতে পারছে না। শিক্ষার্থীদের বিপুল চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব হয়েছে। যদি দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে না উঠত, তাহলে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বেরোনো শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া থেকে বঞ্চিত হতো। তবে হ্যাঁ, আমাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি যে, কতসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা প্রয়োজন, সেটা গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন।

অনেকেই অভিযোগ করেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়ার মান খুব একটা ভালো নয়—আমি একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে এটা মানতে রাজি নই। দুই-একটি ব্যতিক্রম বাদে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পড়াশোনা যথেষ্ট মানসম্পন্ন। আমার জানামতে, দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা হচ্ছে ১০৮টি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৫৫টি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা ফ্যাকাল্টি হিসেবে আছেন, তারা অত্যন্ত রিসোর্সফুল। বিভিন্ন কনফারেন্সের আয়োজন করেন এবং নিজেরাও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগদান করেন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চমান বজায় রাখা হয়। আমরা সব সময়ই চাই, একজন ডক্টরেট ডিগ্রিধারী বিশেষায়িত প্রার্থী যেন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ছাত্রছাত্রীরাও যে বিভাগে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা বেশি, সেখানেই ভর্তি হতে আগ্রহী হয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় খারাপ—এই বক্তব্য সঠিক নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অর্থায়ন করে সরকার। ফলে তারা আর্থিক দিক থেকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকে। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যগণের দেওয়া অনুদানের ওপর নির্ভর করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয়। দেশের বিদ্যমান পরিপ্রেক্ষিতে একজন শিক্ষাবিদের পক্ষে হয়তো অনেক সময় শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের ট্রাস্টি বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে যেসব ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডে আসেন, তারাও যথেষ্ট শিক্ষানুরাগী। তারা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করাকে সামাজিক দায়িত্ব বলেই মনে করেন।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদানের একটি প্রস্তাব কিছুদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে। আমি মনে করি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদানের যে আলোচনা চলছে, তা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে এখানে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। কারণ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা নিয়ে ঝুঁকি আছে। যেন বাণিজ্যিকীকরণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই মানের প্রশ্নে ছাড় দেওয়া যাবে না। ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদানের জন্য অনুমতি প্রদান করা যেতে পারে। প্রথম দিকে উপযুক্ত শিক্ষকের স্বল্পতা থাকার কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো সূত্র থেকে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিতে হতো। এখন সেই অবস্থা নেই। এখন অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক উপযুক্ত শিক্ষক আছেন।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি অনেক বেশি—এটি একটি কমন অভিযোগ। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি অনুদান পায় না। তাই তাদের ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফির ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেশি ফি গ্রহণ করতে হয়। তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রাইম এশিয়া) টিউশন ফি তেমন একটা বেশি নয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়াশোনা করতে পারছে। এখানে বিভিন্ন ধরনের ওয়েভারের ব্যবস্থা রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য শতভাগ বেতন মওকুফের সুবিধা রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ট্যালেন্ট, তাদের জন্য বেতন মওকুফের সুবিধা রয়েছে। 

অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিটের সমস্যা রয়েছে। একজন ছাত্র বা ছাত্রী চাইলেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। এমন এক সময় ছিল, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলে সময় নষ্ট হতো। এখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার কারণে ছাত্রছাত্রীদের সময় নষ্ট হচ্ছে না। আবার এমনও দেখা গেছে, অনেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে; কিন্তু চয়েসফুল সাবজেক্ট পায়নি। তারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পছন্দনীয় সাবজেক্টে ভর্তি হচ্ছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্ররাজনীতিমুক্ত। ফলে এখানে শিক্ষার্থীরা একাগ্র মনোযোগসহকারে পড়াশোনা করতে পারে। অনেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও নানা কারণে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকে। কাজেই ঢালাওভাবে এটা বলা যাবে না যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ভর্তি হয়, তারা ছাত্র হিসেবে তুলনামূলকভাবে খারাপ। যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, তারা দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তারা অনেক ক্ষেত্রেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো করছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বড় সুবিধা হচ্ছে, এখানে কোর্সগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়ে যায়। চার বছরের কোর্স চার বছরেই সম্পন্ন হয়। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের কোর্স শেষ হতে অনেক সময় ছয়-সাত বছর লেগে যায়। কোনো পরিবারই চায় না তার সন্তানের শিক্ষাজীবন শেষ হতে এতটা সময় লাগুক। এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পরও সেখানে না পড়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ভালো রেজাল্ট করে বেরিয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে কর্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, সে কী শিখল এবং কর্মজীবনে কতটা প্রতিষ্ঠিত হতে পারল। আমাদের দেশে কর্মমুখী শিক্ষা বিস্তারের খুবই প্রয়োজন। অনেকেই বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা বেকার তৈরির কারখানা। এটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যাবে না। আমাদের দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা একজন শিক্ষার্থীর জন্য কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান করে না। আমরা যদি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কারিকুলাম প্রত্যক্ষ করি, তাহলে দেখা যায়, এখানে সেই সব বিষয়েই পাঠদান করা হয়, যেগুলোর মার্কেটে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কাজেই এসব সাবজেক্টে পাশ করে একজন শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতিও অত্যন্ত আধুনিক। এসব সাবজেক্টে পড়াশোনা করে একজন শিক্ষার্থী কর্মমুখী জ্ঞানার্জন করতে পারছে। অনেকগুলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যারা বিশেষায়িত ক্ষেত্রে শিক্ষাদান করছে। যেমন :ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়, ফ্যাশন ডিজাইনিং ইত্যাদি। এরা সরাসরি কর্মমুখী শিক্ষাদান করছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, বরং একধরনের সত্ প্রতিযোগিতা আছে। এই প্রতিযোগিতা হচ্ছে কীভাবে আরো ভালো করা যায়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে একজন শিক্ষার্থী সাধারণত বেকার থাকে না। তারা কোনো না কোনোভাবে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নিতে পারছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো হয়। এদের কারিকুলামগুলোও উন্নত বিশ্বের আদলে তৈরি। পাঠ্যক্রম উন্নয়ন করার জন্য আলাদা সেল আছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রিসার্চ ওরিয়েন্টেড করা হচ্ছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি রিসার্চ ওরিয়েন্টেড হয়, তাহলে তার শিক্ষার মান অবশ্যই উন্নত হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পাশাপাশি চলছে। যদি দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় না থাকত, তাহলে শিক্ষার হার অনেক কম থাকত। একই সঙ্গে যারা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করছে, এদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে পড়াশোনায় ইতি টানতে বাধ্য হতো। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ নিশ্চিত করেছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দুর্বলতা থাকতে পারে, তবে সেটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তাই বলে সার্বিকভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের কোনো অবকাশ নেই।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর ও ট্রেজারার, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

অনুলিখন: এম এ খালেক

 

ইত্তেফাক/এমএএম