শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী ও সমাজব্যবস্থায় তাঁর শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৩:৪১

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে দেশবাসীকে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর পক্ষ থেকে জানাই কৃষ্ণপ্রীতি ও শুভেচ্ছা।

যখন ধর্মের গ্লানি হয় ও অধর্মের উত্থান হয় তখন ভগবান এ জগতে আবির্ভূত হয়ে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের মাধ্যমে ধর্মসংস্থাপন করেন। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির পুণ্যলগ্নে আবির্ভূত হন। অষ্টমী তিথিতে আবির্ভূত হন বলে এই দিনটি জন্মাষ্টমী হিসেবে উদ্যাপন করা হয়। তাঁর অনন্য জীবনাদর্শ ও কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে নিমিত্ত করে প্রদত্ত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শাশ্বত জ্ঞান সমগ্র মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ।

সুষ্ঠু সমাজ-ব্যবস্থাপনায় অত্যাবশ্যক বিষয়গুলোর অন্যতম হলো সংযত ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, ন্যায় বিচার, সাম্যবাদ, সৎকর্ম, পরমত সহিষ্ণুতা ইত্যাদি। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অমিয় বাণীর মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ এসব শিক্ষাই জগৎকল্যাণের জন্য দিয়েছেন।

ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে আত্মতত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, প্রতিটি জীবই প্রকৃত স্বরূপে আত্মা; আর এই দেহটি ঠিক পোশাকের মতো অনিত্য। সুতরাং, নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, মানুষ-পশু ইত্যাদি আমাদের বাহ্যিক পরিচয়মাত্র। এসব বাহ্য পরিচয় গৌণ করে যিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণভেদে সব শ্রেণির মানুষ, এমনকি পশুপাখি সকলের প্রতি সমদর্শী হন, তিনিই যথার্থ জ্ঞানবান। যিনি সমস্ত জীবের সুখ ও দুঃখকে নিজের সুখ ও দুঃখের অনুরূপ সমানভাবে দর্শন করেন, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী। এভাবে শ্রীকৃষ্ণ আমাদের প্রকৃত সাম্যবাদের শিক্ষা প্রদান করেছেন।

শ্রীকৃষ্ণ শৈশব থেকে বিভিন্ন অসুরনিধন থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে কংস, জরাসন্ধ ও শিশুপালের মতো দুষ্কৃতকারী রাজাদের পরাস্ত করে অন্যায়কে প্রতিহত করেছেন। অর্জুনকে মহাভারতের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে তিনি দুর্যোধন-দুঃশাসনের মতো অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন। পাণ্ডবদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে তিনি সমাজে ন্যায় স্থাপন করেছেন।

জনসাধারণকে পরিচালিত করার মহৎ দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত হয়েছে, তাদের কর্তব্য সম্পর্কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন (গীতা ৩.২১) শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যেভাবে আচরণ করেন, সাধারণ মানুষেরা তার অনুকরণ করে। তিনি যা প্রমাণ বলে স্বীকার করেন, সমগ্র পৃথিবী তারই অনুসরণ করে। রাষ্ট্রপ্রধান, পিতা ও শিক্ষক স্বাভাবিকভাবেই জনগণের পথপ্রদর্শক। তাই তাঁদের উচিত, শাস্ত্রের বাণি উপলব্ধি করে, শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে জনসাধারণকে পরিচালিত করে এক আদর্শ সমাজ গড়ে তোলা। এর ফলে যে সমাজ গড়ে উঠবে, তাতে প্রতিটি মানুষের জীবন সার্থক হবে।

শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ অনুসারে পরিচালিত আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) একটি সমাজসেবামূলক সনাতন ধর্মীয় আন্তর্জাতিক সংগঠন। সমস্ত পৃথিবীতে এর প্রায় ৮০০ টিরও অধিক মন্দির রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ইস্কন দেশব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের মাঝে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান ও সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ মানবতার স্বার্থে অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম, ছাত্রাবাস ও মেডিকেল সেবার মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক সেবামূলক কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।

গীতায় বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ অনুসারে যদি কোনো সমাজ পরিচালিত হয়, তবেই সমাজে যথার্থ শান্তি, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রতি বছর জন্মাষ্টমী মহোৎসব উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অমৃতময় উপদেশগুলো আমরা স্মরণ ও ব্যক্তি জীবনে প্রয়োগ করতে পারি। এভাবে তাঁর অমিয় বাণি চিরকাল জগতে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা। হরে কৃষ্ণ।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসকন বাংলাদেশ

 

 

ইত্তেফাক/এসসি