ঋণখেলাপি, প্রকৃত উদ্যোক্তার প্রতি অবিচার

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৯, ২১:৩৫

সম্প্রতি মহান জাতীয় সংসদে শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশিত হইবার পর ঋণখেলাপি ইস্যুটি সকলের দৃষ্টি কাড়িয়াছে। মুখরোচক আলোচনায়ও কোনো কোনো বড়ো ঋণখেলাপি রহিয়াছেন। কিন্তু তাঁহারা খেলাপি হইলেন কেন? সেই প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর কেহ খুঁজিতেছে না। ইহা সত্যি যে, বাংলাদেশে সেই শুরু থেকেই ব্যাংক হইতে ঋণ লইয়া তাহা আত্মসাত্ করিবার ট্র্যাডিশন চালু রহিয়াছে। যাহারা এই কাজে নিয়োজিত ছিলেন বা রহিয়াছেন, তাহারা বরাবরই সরকারের মদদপুষ্ট বিশেষ গোষ্ঠী। প্রভাবশালী না হইলে ব্যাংকের ঋণ গ্রহণ করে তাহা আত্মসাত করা মোটেই সহজ নহে। যতদিন এই গোষ্ঠীর পক্ষে রাষ্ট্রীয় মদদ থাকিবে, ততদিন একটি সুশৃঙ্খল ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু স্বপ্নই থাকিয়া যাইবে। আর ইহার দায় বহন করিতে হইবে নির্দোষ উদ্যোক্তাশ্রেণিকে। যাহারা শিল্পের চাকা ঘুরাইতে আসিয়া নিজেরাই অশুভ ঘূর্ণিচক্রে নিপতিত হইয়াছেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প-উদ্যোক্তা মহলের বিশেষ অবদানের কথা অস্বীকার করিবার জো নাই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পণ্য রপ্তানি অভ্যন্তরীণ চাহিদাপূরণ করিয়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন  ও রক্ষার মাধ্যমে দেশকে স্বাবলম্বনের পথে আগাইয়া নিয়াছে উদ্যোক্তাশ্রেণি। উদ্যোক্তাদের অনেকেই ব্যাংক হইতে ঋণ লইয়া শিল্প স্থাপন করিয়াছেন। পরবর্তী সময়ে কেহ কেহ ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে সক্ষম হন নাই। কেহ কেহ অতিকষ্টে কিস্তি চালাইয়া গিয়াছেন। নেপথ্যের কথা কেহ জানিতে চাহেন নাই। কিংবা পর্যাপ্ত গবেষণাও করা হয় নাই যে, একজন সত্যিকার উদ্যোক্তা কী কারণে ঋণখেলাপির তকমা নিজের গায়ে মাখিবেন? এই বিষয়ে আরো কয়েকটি প্রশ্নের জবাব মিলানো আবশ্যক। কলকারখানা চালু হইবার পর উদ্যোক্তা কি তাহার চাহিদামতো গ্যাস-বিদ্যুত্, জ্বালানিসুবিধা পাইয়াছেন? দৈনিক কত বার লোডশেডিং হইয়াছে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির অভাবে উত্পাদিত পণ্যের মান নষ্ট হইয়াছে? উদ্যোক্তামাত্রই হলফ করিয়া বলিতে পারিবেন যে, দিনে একটি শিফটেও নির্বিঘ্ন জ্বালানি সরবরাহ পান নাই। উত্পাদন ক্ষতিগ্রস্ত হইলে তিনি ব্যবসা করিবেন কী আর ব্যাংকের কিস্তিই বা দিবেন কীভাবে? উদ্যোক্তা যখন ঋণ গ্রহণ করিলেন, তখন ডলারের মূল্য কত ছিল? আর এখন কত? এই বাড়তি অর্থের দায় উদ্যোক্তার কাঁধে পড়িয়াছে। এইখানেই শেষ নহে। উদ্যোক্তাকে ব্যাংক হইতে উচ্চ সুদ হারে ঋণ নিতে হইয়াছে। যাহা গোটা বিশ্বে সর্বোচ্চ সুদ হার। ব্যাংকগুলি যেই হার ধার্য করে, তাহা কার্যকরী হয় প্রায় দ্বিগুণ হারে। এইদেশে সুদের হিসাব করা হয় ‘কম্পাউন্ড’ পদ্ধতিতে। সুদের উপর সুদ, দণ্ড সুদ আরোপ করিয়া উদ্যোক্তাকে নাজেহাল করিয়া দেওয়াই যেন এইখানকার সংস্কৃতি। এতটা ঝামেলা পোহাইবার পরও যাঁহারা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করিতেছেন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখিতেছেন, কিংবা শেষতক খেলাপি হইয়া পড়িয়াছেন, তাঁহাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা কতটা রহিয়াছে, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ।

অন্যদিকে, যাঁহারা ইচ্ছাকৃত ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করেন নাই, তাঁহাদের সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও যাঁহারা খেলাপি হইয়াছেন তাহাদের মিলাইলে চলিবে না।  তাহা ন্যায়ানুগও হইবে না। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ঋণখেলাপির তালিকা বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে—একটি বিশেষ খাতের ব্যবসায়ীরাই ঐ তালিকায় অধিকসংখ্যক। এই গোষ্ঠী নানাভাবে সরকারের কাছ হইতে সুবিধা নিয়া থাকে। প্রকারান্তরে, প্রকৃত উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত জামানত রাখিয়াই ঋণ নিয়াছেন। তাঁহারা পরিশোধ করিতে না পারিলেও ঐ অর্থ মাপ পাইবেন না। ব্যাংকের টাকা তাঁহাকে ফেরত দিতে হইবে। অন্যথায়, ব্যাংকও তাঁহার বন্ধককৃত সম্পত্তির বদলে অর্থশোধের ব্যবস্থা করিবে। আর জামানত ও বকেয়া পাওনায় যদি ফাঁক থাকে, তাহাতেও উদ্যোক্তার দোষ নাই। কারণ, ডলারের দাম বাড়িবার পেছনে উদ্যোক্তার হাত নাই। বন্ধককৃত সম্পত্তি অতিমূল্যায়িত হইলে তাহার দায় ব্যাংকারদের। কাজেই উদ্যোক্তার বিকাশ ঘটাইতে হইলে পদ্ধতিগত পরিবর্তন জরুরি। ঢালাও সব উদ্যোক্তাকে ঋণখেলাপির তকমা দিয়া সামাজিকভাবে হেয় করিবার মানসিকতারও পরিবর্তন দরকার। একইসঙ্গে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করিলে এই ধরনের প্রবণতা হ্রাস পাইবে বলিয়া আমরা বিশ্বাস করি।