ইরান-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক যুদ্ধের অংশ

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৯, ২১:৩৯

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরান পাতালপুরীর প্রান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, ফলে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রবৃদ্ধমান উত্তেজনাও নতুন শীর্ষের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আল-ফুজায়রাহ্র চারটি ট্যাংকারের আক্রান্ত হওয়া এবং আরামকো পাইপলাইনে মিসাইল আক্রমণের স্মৃতি মলিন হওয়ার আগেই ওমান উপসাগরে তেলের দুই ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ও আগুন লাগার ঘটনা ঘটল (১৩ এপ্রিল, ২০১৯)। গত উনিশে এপ্রিল, ২০১৯ ইরানি বিপ্লবী বাহিনী মার্কিন নেভির যুদ্ধ প্লেন ও যুদ্ধ ড্রোনের ভিড়ের মধ্য থেকে একটি যুদ্ধ ড্রোনকে ভূপাতিত করল।

নেভির ড্রোন ভূপাতিত হওয়া সত্ত্বেও সেরকম কিছু ঘটতে না দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা ট্রাম্পের নেই। তবে ড্রোন-এপিসোডের মাধ্যমে দুটো বাণী ইরান পাঠায় : ১) সর্বশক্তি নিয়োগ করে সত্যিকারের যুদ্ধ করতে ইরান প্রস্তুত, পরিণতি কী হবে না হবের পরোয়া করে না সে, ২) ইরান সচেতন যে প্রেসিডেন্ট নিজেই নিজেকে কোণঠাসা অবস্থায় নিয়ে এসেছেন। লজ্জায়/অস্বস্তিতে পড়বার মতো আক্রমণটি ঘটে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে নামার কাছাকাছি সময়ে।

মধ্যপ্রাচ্যের এ উত্তেজনাকে বশে আনতে ট্রাম্প যেসব পন্থার কথা বলছেন, সেগুলোতে কিন্তু নির্দয় অর্থনৈতিক অবরোধের নির্মমতা হ্রাসের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বিবি নেতানিয়াহুর অনুরোধ রাখতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি পারমাণবিক চুক্তিকে বাতিল করার ফলস্বরূপ এই সাম্প্রতিক অচলাবস্থার জন্ম হয়েছে। ট্রাম্পের ইচ্ছা যে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন পর্যন্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের আচ্ছামতো ভোগান্তি হোক। এই ‘স্টেটাস কুউও’ ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত অনুকূল হবে বটে (বেশ বড়াই করে ভোটারদের বলতে পারবেন), কিন্তু ইরানের জন্য ডেকে আনবে চরম বিপর্যয়। এ কারণেই ইরান ট্রাম্পের সঙ্গে এমন কোনো দৃশ্যায়নের মুখোমুখি হতে চায় না যেখানে ট্রাম্প বিজয়ীর বেশে বড়াই করে বলবে যে আমাদের যুদ্ধ ড্রোনকে ভূপাতিত করা হয়েছিল, সেসব স্থান আমি বোমা মেরে ধ্বংস করার আদেশ দিয়েছি, সেসব এখন কেমন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ইত্যাদি।

ট্রাম্প নিজেকে যুদ্ধ বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন বটে, কিন্তু প্রতিপক্ষ ইরানি প্রশাসন যেমন তাঁর অনুকূলে কিছু করতে অনিচ্ছুক, তেমনি ট্রাম্পও ইরানের অনুকূলে কিচ্ছু করতে অপারগ। ট্রাম্প কি প্রকৃত সত্য বিস্মৃত হয়েছেন যে অর্থনৈতিক অবরোধ, একতরফা ইরানি তেলের রপ্তানি নিষিদ্ধকরণ ও ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়াও যুদ্ধ করার মধ্যে পড়ে, অর্থাত্ ট্রাম্পের এই কর্মকাণ্ড ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের অবস্থায় নিয়ে গেছে? ট্রাম্প আদতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। 

সাম্প্রতিককালের ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াশিংটন : কয়েকটি ড্রোনদল ও স্ট্রাইক ফোর্সের সমন্বয়ে গঠিত এক/দেড় হাজার সদস্যের একটি অতিরিক্ত সেনাদল পাঠিয়েছে। গত বছরই প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা সুস্পষ্টভাবে বলে যে : আমরা যদি তেল রপ্তানি করতে না পারি তো অন্য কাউকেই করতে দেওয়া হবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কানে সতর্ক বাণীটি পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল কি? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, না দেওয়া হয়নি। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ড্রোন-ভূপাতনের প্রতিউত্তরে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আঘাত হানার অনুমোদন করেন বটে, তবে কয়েক ঘণ্টা বাদে হুকুমটি তিনি প্রত্যাহার করেন।

হুকুম প্রত্যাহারের মাধ্যমে ইরানকে পুনর্বার আশ্বাস দেওয়ার প্রচেষ্টা চলে যে ইরানের বিরুদ্ধে চড়াও হওয়ার কোনো অভিসন্ধি যুক্তরাষ্ট্রের নেই, যুক্তরাষ্ট্র বরং এই কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। ইরানও যুদ্ধ চায় না, কিন্তু রপ্তানি-আমদানির ওপর বিরামহীন অর্থনৈতিক অবরোধও ইরানের জন্য মেনে নেওয়া মোটেই সম্ভব নয়। যতদিন পর্যন্ত না ইরানকে তার তেল বিক্রয় করতে দেওয়া হবে না ততদিন পর্যন্ত ইরান ও ট্রাম্প তাদের ‘ডান্স মেকাবর’ (danse macabre) ও অব্যাহত রাখবে। ইরানের অর্থনীতি ট্রাম্পের অর্থনৈতিক অবরোধের শিকার, ইরানের জন্য অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকাটাই হলো সবচেয়ে বড়ো সংগ্রাম। ট্রাম্প অবরোধ তুলে নিতে চান না, এবং ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান। তাঁর প্রশাসনের যুদ্ধবাজ ‘হকিশ’ কর্তাব্যক্তিরা ও ইসরাইল যুদ্ধ চায়। যুদ্ধবাজের দলটি নানা ছলে ট্রাম্পকে যুদ্ধমুখী করতে ব্যস্ত তত্পর।  ট্রাম্পের বড়ো সখ বা ইচ্ছা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়া বটে, কিন্তু তিনি অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে ইরানের ওপরে যে ‘সর্বোচ্চ চাপের’ সৃষ্টি করেছেন, সেই চাপে ভেঙে দুমড়ে যাওয়ার পরিবর্তে ইরানও তাঁর ওপরে প্রবল পালটা চাপ সৃষ্টি করছে। আলোচনায় বসার জন্য ট্রাম্প তেহরানে অবস্থিত সুইস দূতাবাস, জার্মানি ও জাপানের মাধ্যমে একাধিকবার দাওয়াতপত্র পাঠিয়েছেন। বুলিশূন্য দাওয়াতপত্রের প্রতি উত্তরে ইরান বলেছে : হয় আমাদের তেলের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নাও আর নয়ত চলো যুদ্ধ করি। (ট্রাম্পের পক্ষে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়াটা যদি প্রায় অসম্ভব হয়ে থাকে তো (পরোক্ষ সমাধান হিসেবে) ট্রাম্প কি অন্তত ইউরোপকে ইরানের ওপর আরোপিত চাপ তুলে নিতে ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে নিষেধাজ্ঞামুক্তভাবে ইরানের সঙ্গে লেনদেন মেনে নেবেন?)।

যাহোক, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অর্থনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত। এই যুদ্ধাবসানের চাবিকাঠি বর্তমানে ট্রাম্পের হাতে।

n লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক