শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো যাদের কথা বলতে যাচ্ছি, এ লেখায় তাদের প্রকৃত নাম ব্যবহার করা অসমীচীন হবে। কাজেই ছদ্মনাম ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে ছদ্মনামের আড়ালে যে ঘটন-অঘটনগুলোর কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবে ঘটেছে। গল্পগুলো বলছি, ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসকে মনে রেখে।
নিলয়ের বয়স বর্তমানে ত্রিশের কাছাকাছি। এখন থেকে সাত বছর আগে তিনি একবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই চেষ্টা বিফল হয়েছে এবং তিনি এখনও বেঁচেবর্তে আছেন। খুব সামান্য দু-একটি বিষয়ের মধ্যে এটি একটি বিষয় যেখানে কেউ ব্যর্থ হলে অন্যরা এবং পরে নিজেও খুশি হন। নিলয়ের প্রেম ছিল কলেজ জীবন থেকে সহপাঠিনীর সঙ্গে। সঙ্গতকারণেই নিলয়ের মতো তাঁর প্রেমিকার নামটিও আমরা দিয়ে নিচ্ছি। ধরা যাক, মেয়েটির নাম পূর্ণিমা।
নিলয় ভীষণ আবেগী ছেলে। পূর্ণিমার সঙ্গে প্রেমটা তাঁর প্রথম প্রেম। পূর্ণিমার প্রেমটা প্রথম কিনা জানার সুযোগ নেই আমার। গল্পটা নিলয়ের কাছ থেকে শুনেছি এবং পূর্ণিমার কাছে কিছু জানতে চাওয়াটা ব্যক্তিগতের সীমানা লঙ্ঘন করা হবে।
নিলয়ের কাছে প্রেমটা যে জীবন-মরণ পণ করা ছিল বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির এক বছরের মধ্যেই পূর্ণিমার দিক থেকে সাড়া কমতে থাকে। নিলয় অধীর হতে থাকেন। একসময় তাঁর কাছে পরিষ্কার হয় অন্য আরেকজনের সঙ্গে তার চেয়ে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক হয়েছে পূর্ণিমার। তাই যদি হয় তবে এই জীবনের আর মূল্য কি থাকে। এমন ভাবনায় নিলয় আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে যান। প্রচুর পরিমাণ ঘুমের ওষুধ খেয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে যেতে চান। সময় শেষ হওয়ার আগেই বন্ধুরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পেরেছিল। পাকস্থলী ধৌত-বিধৌত করা হয়েছে, নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন। ব্যবসায়ী পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান নিলয় সেই অগ্যস্ত যাত্রা থেকে বেঁচে ফিরেছেন, বেঁচে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া ভালোভাবেই শেষ করেছেন, সাংবাদিকতা করছেন বছর কয়েক হলো, ভালো করছেন। তিনি একজন উদীয়মান তরুণ সাংবাদিক, চৌকস। আজকাল টকশোতেও তাঁকে দেখা যায় মাঝেমধ্যে। প্রায় চার বছর হলো তার প্রেম হয়েছে অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করা এমনই একটি মেয়ে যার মত সরল, শিশু-সুলভ মেয়ে সচরাচর দেখা যায় না।
তোমরা বেঁচে থাকো, তোমরা ভালো থাকো নিলয়। বলে রাখা ভালো নিলয় ছদ্মনামের আড়ালে ওই তরুণ আমার ছোট ভাইয়ের মতো, বন্ধু বটে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ওকে বলতে চেয়েছিলাম, ‘যে প্রাণ তুমি দিতে পারো না কাউকে, এমনকি নিজেকেও নয় সেই প্রাণ বিনষ্ট করার অধিকার তোমার নেই এবং কখনো ছিল না।
ব্রেভ হার্ট নামে চলচ্চিত্রটির কথা অনেকেরই জানা আছে। উইলিয়াম ওয়ালিস একজন স্কটিশ বিদ্রোহী। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের বিরুদ্ধে স্কটিশ স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তিনি। তার সঙ্গে যোগ দেন এডওয়ার্ডেরই সন্তানের স্ত্রী রাজকুমারী ইসাবেল। অসম যুদ্ধে যখন পরাজিত হন উইলিয়াম, তখন রাজার বন্দিশালায় বন্দি থাকা অবস্থায় ইসাবেল তাকে শিরচ্ছেদ থেকে বাঁচাতে বিষ তুলে দেন তার মুখে। কিন্তু তিনি তা পান না করে মুখে রেখে দেন এবং ইসাবেল চলে গেলে তা মুখ থেকে ফেলে দেন। জনসম্মুখে শিরচ্ছেদে মৃত্যুই তিনি বরণ করেন বীরের মতো।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমরা যত কথাই বলি না কেন, বাংলাদেশে সম্ভবত তরুণরাই আত্মহত্যা করে বেশি এবং আত্মহত্যা করার কারণ অভিমান। আঁচল ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান দেখতে পেলাম এ লেখাটি শুরু করার পর। গতকাল ৯ সেপ্টেম্বর তারা শিক্ষার্র্থীদের আত্মহত্যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসে ৩৬১ জন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।এই ৩৬১ জনের মধ্যে স্কুল শিক্ষার্থী ১৬৯, কলেজ শিক্ষার্থী ৯৬, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ৬৬ এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী রয়েছে ৩০ জন।সেখানে পুরুষ শিক্ষার্থী ছিল ১৪৭ এবং নারী শিক্ষার্থী ২১৪। আত্মহত্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে নারী শিক্ষার্থীরা।
শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই বাংলাদেশে আত্মহননকারীর মধ্যে নারীরা সংখ্যায় বেশি। বিশ্বজুড়ে নারীদের চেয়ে পুরুষদের আত্মহত্যার হার বেশি। বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশে পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশি আত্মহত্যা করে বলে জানায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)৷ এর মধ্যে বাংলাদেশ একটি৷ বাকিগুলো হচ্ছে মিয়ানমার, চীন, মরক্কো ও লেসোথা৷
গত ৭ আগস্ট দিনাজপুরের বিরল উপজেলার নওশীন আত্মহত্যা করেছে গলায় ফাঁস দিয়ে। তিনি ছিলেন এইচএসসি পরীক্ষার্থী। দুটি পরীক্ষাও দিয়েছেন। তার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার প্রেমিক পরিবারের পছন্দে অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন ঘরে বিয়ে করে ফেলার রাতেই নওশীনের আত্মহনন।
আবার এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আত্মহত্যা করে জয়পুরহাটের তিথী। পরীক্ষায় জিপিএ ৫ না পাওয়ার ক্ষোভ এবং লজ্জা থেকে তার আত্মহত্যা।
ডাব্লিউএইচও-এর তথ্যানুযায়ী সারা বিশ্বের প্রতিবছর ১০ লাখ মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বিশ্বে আত্মহননকারী পুরুষের সংখ্যা নারীর সংখ্যার তিন গুণ, আগেই বাংলাদেশে এই পরিসংখ্যানের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে সেই বছর এক লাখ মানুষের মধ্যে যে ১২৮ দশমিক ০৮ জন আত্মহত্যা করেছিল তাদের মধ্যে ৮৯ শতাংশই নারী ছিলেন এবং তাদের অধিকাংশই অবিবাহিত ছিলেন। জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে ২০০৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ৪০ জন ছাত্রী লাঞ্ছনার শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। ২০০১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত শারীরিক ও ঘরোয়া সহিংসতার কারণে ৪৭৪৭ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন।
অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ঘটে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে আত্মহননকারী ব্যক্তি মনের গভীরে আত্মহত্যার চিন্তা বিচ্ছিন্নভাবে লালন করতে থাকে। কেউবা প্রকটভাবে এই চিন্তা লালন করে এবং আত্মহনন ঘটিয়ে খেলাটাকেই অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে করে। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গলায় ফাঁস গ্রহণের মাধ্যমে আত্মহননের ঘটনা ঘটে থাকে। দড়ি সহজ প্রাপ্য তাছাড়া দড়ির পরিবর্তে ওড়না, গামছা, শাড়ি, চাদর ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দ্বিতীয়তঃ বিষ, কীটনাশক পানেও অনেক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। গ্রামবাংলায় কীটনাশকও বেশ সহজে পাওয়া যায়।
আত্মহননে লিপ্ত ব্যক্তিও অন্তিম মুহূর্তে প্রবলভাবে বাঁচবার চেষ্টা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে বাঁচবার আকুতিও প্রকাশ পায়।বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করবার মতো কাছে পিঠে কেউ থাকে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেরি হয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই বা পৌঁছানোর পরও জীবনে ফেরানো যায় না।
কত তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে যে মানুষ আত্মহত্যা করে ফেলে তা বলাই বাহুল্য এবং আগেও বলেছি, তাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী, বয়স সীমা ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। আচল ফাউন্ডেশন গত বছরও স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান করে দেখিয়েছিল, মাসে গড়ে ৩৭ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আচল ফাউন্ডেশন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত আত্মহত্যার খবর বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানায়।বলা হয়েছে, গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে স্কুল কলেজ পর্যায়ে (সমমান মাদ্রাসা শিক্ষার্থীসহ) ৪৪৬ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে স্কুল ও সমমান পর্যায়ের শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৪০ জন কলেজ ও সম্মান পর্যায়ে ১০৬ জন এবং শুধুমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৪ জন। ২৭.৩৬ শতাংশ স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করছে অভিমান করে। এছাড়া প্রেমঘটিত কারণে ২৩.৩২ শতাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
আপত্তিকর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ায় ৪জন, শিক্ষকের দ্বারা অপমানিত হয়ে ৬ জন, গেম খেলতে বাধা দেওয়ায় ৭জন, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ২৭ জন আত্মহত্যা করেছে। এছাড়া মুঠোফোন কিনে না দেওয়ায় ১০ জন এবং মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায় ৬ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে ২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৭৩,৩৮৯ জন আত্মহত্যা করেছে। এই ৭৩,৩৮৯ জন ব্যক্তির মধ্যে ৩১,৮৫৭ জন গলায় ফাঁস দিয়ে এবং ৪১,৫৩২ জন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী আত্মহত্যা প্রবণতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। বাংলাদেশে প্রতিবছর কমপক্ষে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। দেশে আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার ৭.৮ থেকে ৩৯.৬ জন। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার কারণে যে সব মানুষ মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায় তাদের মধ্যে ০.০৬ শতাংশ বাংলাদেশী।
বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা ঝিনাইদহে, তাদের অধিকাংশ অল্পবয়সী এবং নারী। ঝিনাইদহে আত্মহত্যার প্রবণতা ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই জেলায় প্রতিবছর গড়ে ৪০০ জনের মত মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন বলে ধারণা করা হয়। ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায় ঝিনাইদহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে শৈলকূপা উপজেলায়।
আত্মহত্যা বা আত্মহনন (Suicide) হচ্ছে কোন ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়া বিশেষ। ল্যাটিন ভাষায় Suicidare থেকে Suicide বা আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে। যার অর্থ হল নিজেকে হত্যা করা। যখন কেউ আত্মহত্যা করেন তখন জনগণ এ প্রক্রিয়াকে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করে। ডাক্তার বা চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় সব ধর্মেই আত্মহত্যাকে মহাপাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
