মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

আহাম্মক অহমের গল্প: মননের অন্তরালে রয়েছে যে আঁধার

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৭:০৪

সাহিত্য সমালোচনার আলো এখনও স্পর্শ করেনি কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ আলীর সাহিত্যকর্মকে। সাহিত্যের অন্তঃকরণে যে সুবাতাস পাঠককে আলোড়িত করে, মোহাম্মদ আলীর বইয়ের পাতায় পাতায় যেন সেই বাতাসের হিমেল আবহ শিরশির করে বয়ে চলেছে। 

জাগরিত আত্মবোধ জানান দিচ্ছে নিজের সীমাবদ্ধতা অথবা অসীমতার ইশতেহার। গুপ্ত অধ্যায়ের  প্রকাশ্য লিপিকার যেন রয়ে গেছেন অপ্রকাশ্যে ও আলোচনার আবডালে। ‘নর্তকী ট্রিলজি’, ‘আঁধার আয়তন’, ‘মাধুরিম, ‘প্রকৃতির সন্তান’, ‘বিপুল বিভাবরী’, ‘বিশুদ্ধ নৈরাশ্য’ বিবিধ শিরোনামে চলছে তার প্রচল ভাঙার আয়োজন। ‘আহাম্মক অহমের গল্প’ তেমনি এক প্রচেষ্টা।

আমরা প্রাণি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের যত উচ্চ শিখরেই অবস্থান করি না কেন, আমাদের মধ্যে কিন্তু এখনো এমন কিছু বৈশিষ্ট বা ত্রুটি রয়ে গেছে, যা আমরা কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারি না। হয়তো সেই ত্রুটিগুলোকে আমরা দমিয়ে রাখতে পারি। কিন্তু পুরোপুরি মুক্তিলাভ অসাধ্য বিষয়। আর এই ত্রুটিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, ‘অহম’ বা সহজ ভাষায় ‘অহংকার’/ ‘ইগো’।

অহম বা অহংকার মানুষের এমন এক ত্রুটি, যার ফলে কোনো মানুষ সাধু’র খেতাবও পায়। কোনো মানুষ অহমের প্ররোচনায় হয়তো নিজের এবং তার আশেপাশের সকলের জীবনে অভিশাপও বয়ে আনে।
এই যে সবার ভেতর লুকিয়ে থাকা এক ধরণের অহম বা অহংকার এবং এদের প্ররোচনার জাল নিয়ে যে একটা গল্প লেখা হতে পারে, কখনো কি ভেবে দেখেছেন? মোহাম্মদ আলীর ‘আহাম্মক অহমের গল্প’ ঠিক সে রকম একটি উপন্যাস। 

বইটির মূল বিষয়বস্তু মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অহমগুলোর পরিচয় এবং এদের দমন করতে না পারার ফলে মানুষ কীভাবে দিকভ্রান্ত হয় তা নিয়ে। মানুষের এক এক ধরনের ইচ্ছা, সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে এক একটি অহম বা অহংকার। এই অহমগুলোকে কখনো কখনো মানুষ দমিয়ে রাখতে পারে, কখনো কখনো তারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে করিয়ে নেয় নিষিদ্ধ সব কাজ। যার ফলে সম্পূর্ণ নষ্ট হতে পারে এক বা একাধিক জীবন। 

বইটির মূল চরিত্র সোহেল। সে ঢাকায় কর্মরত একজন সরকারি কর্মকর্তা। চাকরি সূত্রে রাজশাহীতে থাকা তার স্ত্রী ও সন্তান এবং অফিসের কাজ নিয়ে তার জীবন বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছিল। অফিসের কর্মচারীদের সঙ্গে সু-সম্পর্ক, সৎ কর্মকর্তা, একজন ভালো বাবা, ভালো স্বামী; সবার নজরে এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যক্তি সোহেল। এরপর ধীরে ধীরে গল্পে আসে আরেকটি প্রধান চরিত্র ‘মেহেক’। মেহেকের সঙ্গে সোহেলের পরিচয় বন্ধুর এক অনুষ্ঠানে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে ফোনে আলাপ, গল্পে আসে ‘প্রেমিক অহম’। শুরু হয় সোহেলের মধ্যকার ‘সৎ, ভদ্র ব্যক্তিত্বের অহম’-এর সঙ্গে ‘প্রেমিক অহম’-এর দ্বন্দ্ব। এই অহমের প্ররোচনায় সোহেলের সুখী সুন্দর জীবনের ছন্দপতন ঘটে। প্রেম, মোহ, কামনা, লোভ, হিংসা, মিথ্যা মানুষের সকল আদি-অন্ধকার জগতের এক একটি ত্রুটি বা লেখকের ভাষায় ‘অহম’ একে একে তার মধ্যে প্রকাশ ঘটায়। পরিণতি হিসেবে মৃত্যু ঘটে সোহেলের। 

গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে একটি মানুষের পরিচিত কিন্তু অন্ধকার জগতের অনুভূতি ‘অহম’কে রীতিমতো একটি চরিত্রে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন লেখক মোহাম্মদ আলী। যা সচরাচর কোনো গল্পে দেখা যায় না। তিনি কেবল চরিত্র হিসেবেই উপস্থিত করার চেষ্টা করেননি, বরং এক এক ধরনের ‘অহম বা অহংকারের’ সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দেন পাঠককে। কাহিনির বিস্তার এবং ঘটনার বর্ণনা বেশ গোছানো এবং সাবলীল হলেও, এক একটি অহমের চিত্রায়নে কিছুটা খাপছাড়া ভাব গল্পজুড়েই চোখে পড়েছে, যেটি কোনো কারণে হঠাৎ হঠাৎ গল্পের মূলধারা থেকে একটু বিচ্ছিন্ন মনে হবে। তবে কাম, লালসা, লোভ, পরকীয়া, ধোঁকাবাজি ও মিথ্যাচারের এই ঘটনাগুলো আমরা আমাদের পরিচিত সমাজেই হরহামেশাই শুনে থাকি। লেখক খুব সুন্দরভাবেই এক গল্পে এই খণ্ড খণ্ড ঘটনাগুলোকে একত্রিত করেছেন। যা সুখপাঠ্য। এবং পাঠক সহজেই ঘটনার সঙ্গে বাস্তবতাকে মেলাতে পারবেন।

লেখক মোহাম্মদ আলী বরাবরই লোকচক্ষুর আড়ালে থাকেন। তবে তার লেখা বরাবরই ভিন্ন। মোহাম্মদ আলী তার সব উপন্যাসেই মনের অন্তরালের অনুভূতি, আবেগ, চিন্তাগুলোকে কোনো না কোনোভাবে প্রাধান্য দিয়ে কোনো একটা চরিত্রের মতোই ফুটিয়ে তুলতে চান। এই গল্পটিও তার ব্যতিক্রম নয়।

১৩৫ পৃষ্ঠার ‘আহাম্মক অহমের গল্প’ শীর্ষক  সমকালীন এই উপন্যাস তাদের জন্য যারা মনের অন্তরালের অন্ধকার সম্পর্কে জানতে চান।

অমর একুশে বইমেলা ২০২৩ সালে ‘আহম্মক অহমের গল্প’ উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে দাঁড়িকমা প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন আল নোমান। মূল্য: ২৯৮ টাকা।

ইত্তেফাক/পিও