হাদিস বেত্তা হযরত ইমাম বোখারী (রহ)

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৯, ২১:৫৯

মাওলানা শাহ্ আবদুস সাত্তার

 

ইসলাম ধর্মতত্ত্বের রূপায়ণে পবিত্র কোরানের পরেই হাদিসের স্থান। হযরত রাসূলে পাক (স) তাঁর জীবদ্দশায় যা করেছেন, যা বলেছেন এবং যা কিছুই সমর্থন করেছেন তাই হাদিস নামে ইসলামি ধর্মশাস্ত্রে পরিচিত। মহানবি (স) এর এই মহান বাণী সংগ্রহে যে সকল মোহাদ্দেস কঠোর পরিশ্রম করে বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন তার মধ্যে প্রখ্যাত চিন্তানায়ক, ধর্মতত্ত্ববিদ ও প্রথম হাদিস সংকলক হযরত ইমাম বোখারীর কৃতিত্ব অন্যতম।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, প্রিয় নবি হযরত মোহাম্মদ (স) নিজের খেয়ালখুশি মোতাবেক কোনো কথা বলেন না বরং আল্লাহ পাকের তরফ থেকে তাঁর প্রতি যে ওহি বা প্রত্যাদেশ আসে, তাই তিনি প্রকাশ করেন। অর্থাত্ রাসূল করীম (স)-এর মহান বাণী চিরন্তন সত্য আর এই সত্যের পবিত্র সংরক্ষণ আল্লাহ পাকের বিশেষ কুদরতেই হয়ে আসছে। আল্লাহ পাক হযরত ইমাম বোখারী (রহ)-কে অনন্য সাধারণ যোগ্যতা দান করে মহানবির মহান বাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়েছিলেন।

হযরত ইমাম বোখারী (রহ) ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাত্ ১৯৫ হিজরি সালের ১৩ই শাওয়াল জুমার দিন বোখারায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল বোখারী। হযরত ইমাম বোখারী (রহ)-এর পিতা ছিলেন একজন ধর্মভীরু আল্লাহ প্রেমিক এবং মা ছিলেন একজন ধর্মশীলা বিদুষী মহিলা। শৈশবে তিনি মায়ের যত্নে ধর্ম শিক্ষার প্রতি অনুরাগী হন এবং ইমাম মোহাম্মদ ইবনে বিশা (রহ) ও অন্যান্য প্রখ্যাত আলেম-ওলামাদের নিকট পবিত্র কোরআন ও হাদিস শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। বাল্যকালে তাঁর স্মরণ ও মেধাশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর ও তীক্ষ্ন। তিনি কোনো হাদিস একবার শ্রবণ করলে সেই হাদিসটি অর্থাত্ তার মূল সনদ ও সূত্রসহ সমুদয় অংশ নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারতেন।

হাদিস সংগ্রহের জন্য তিনি আজীবন বসরা, কুফা, মক্কা ও মদিনা সফর করেছেন। মুসলিম জাহানের বিখ্যাত মোহাম্মদ ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ) ছিলেন ইমাম বোখারী (রহ)-এর ওস্তাদ। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি ইবনে মুবারক ওয়াকীর কিতাবসমূহ মুখস্থ করে ফেলেছিলেন এবং সে কালের খ্যাতনামা মোহাদ্দেস ও তাফসিরকারদের সমস্ত লেখা ও মতামতের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। মক্ক শরিফে থাকা অবস্থায় ‘কদায়া আস সাহাবা ওয়াল তাবেয়ীন’ ও ‘আল তারিখ আল কবির’ কিতাব দু’খানা হযরত রাসূলে পাক (স)-এর পবিত্র রওজা মুবারকের পাশে বসেই রচনা করেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি দামেস্ক, সিরিয়া বসরা ও বাগদাদ সফর করে বিভিন্ন গুণীজনের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে জ্ঞান লাভ করেন।

 ২৫০ হিজরিতে তিনি নিশাপুরে গমন করেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু নিশাপুরের অত্যাচারী শাসকের হিংসাত্মক কার্যকলাপ ও অপপ্রচার তাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। নিশাপুর ত্যাগ করে তিনি তাঁর জন্মভূমি বোখরায় আবার চলে আসেন। এখানেও বোখরার শাসক ও একশ্রেণির লোক তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালা। এখানেই তাঁর কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থানকালে ৬২ বছর বয়সে অর্থাত্ ৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে মোতাবেক ২৫৬ হিজরির ঈদুল ফিতরের দিন ইন্তেকাল করেন।

 তিনি প্রায় ৬ লক্ষ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন এবং তার মধ্যে দুই লক্ষ হাদিস তার মুখস্থ ছিল। এই বিপুল হাদিস সংগ্রহের মধ্যে তিনি ৯ হাজার হাদিস অর্থাত্ নির্ভুল বলে গ্রহণ করেছিলেন এবং ‘আল-জামি আল সহীহ’ নামে সংকলিত করেছিলেন। হাদিস সংকলিত করার পূর্বে তিনি ইরাক, ইরান, সিরিয়া, মক্কা ও মদিনা গমন করে প্রায় ৯ শত হাদিস শাস্ত্রবিদদের মতামত গ্রহণ করেন। একটি গ্রহণযোগ্য হাদিস সংগ্রহের জন্য তিনি শত শত মাইল পায়ে হেঁটে না খেয়ে দূর-দূরান্তে ছুটে গেছেন এবং সতর্ক ও সাবধানতার সঙ্গে প্রতিবারই হাদিস লিপিবদ্ধ করার আগে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিতেন। অতএব, হাদিস সংগ্রহের জন্য তাঁর কঠোর ত্যাগ ও সাধনার কথা ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

lলেখক :সভাপতি, বাংলাদেশ সীরাত মিশন ঢাকা, বাংলাদেশ