শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

আত্মহত্যা প্রতিরোধে তরুণদের ভাবনা

১০ সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। চাকরি না পাওয়া, হতাশা এবং জীবনের নানা বিষণ্নতায় ভুগে অসংখ্য মানুষ আত্মহত্যা করছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদেরও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। ঠিক কী কারণে তারা আত্মহত্যা করছে তা যেন এক রহস্য। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন মেধাবী শিক্ষার্থীর মতামত সংগ্রহ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী জোবাইদুল ইসলাম

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০১:৪৬

আত্মহত্যাকে ‘না’ বলি এবং আত্মকর্মসংস্থানে জীবন গড়ি
—আফসানা সাথী

হতাশা তরুণ সমাজে এক নীরব পরজীবীর নাম। আত্মহত্যা যেন সেই হতাশা নামক পরজীবী থেকে সংক্রমিত হওয়া এক ব্যাধি। চাকরির বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সীমিত পদসংখ্যার কারণে শিক্ষার্থীরা যে ভয় ও উদ্বিগ্ন অবস্থার সম্মুখীন হয় তা প্রায়শই আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়; অথচ এটিই তাদেরকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আমাদের পড়াশোনার আরেকটি উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই নিজেকে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু এই উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে সবাই বিসিএসকেই কেন পছন্দের শীর্ষে রাখছে তা এক অজানা রহস্য।
আমাদের সমাজ বা পরিবারের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার পার্থক্য  শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। তবে বেকারত্ব থেকে মুক্তির পথ হিসেবে আত্মহত্যাকে বেছে না নিয়ে আমাদের আত্মকর্মসংস্থান নিয়ে ভাবতে হবে।

 

আত্মহত্যা বুদ্ধিমানের কাজ নয়
—মো. রুকন উদ্দিন

আত্মহত্যার মানে কী? সহজ বাংলায় বলা হয়—নিজেকে মেরে ফেলা। একেবারে জানে মেরে ফেলা। পৃথিবী থেকে নিষ্ঠুরভাবে বিদায় নিয়ে নেওয়া। কেন জীবিত মানুষ নিজের হাতে নিজেকে খুন করে? কারণগুলো কি শুধুই ব্যক্তিগত? নাকি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সমানভাবে দায়ী?
সামান্য ব্যর্থতার জন্য পুরো জীবন ব্যর্থ নয়। সমস্যা হলো এই ব্যর্থতাকে সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার মতো জঘন্য পাপে লিপ্ত হতে হবে? এটা কোনো যুক্তিতেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এ সময়ে আত্মহত্যা টক অব দ্য কান্ট্রি।
এক্ষেত্রে আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত তা হলো আশপাশের মানুষদের একাকিত্ব দূর করা, সমস্যার সমাধান করা। বিশেষ করে মানুষকে হতাশ হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারলে আত্মহত্যা কমবে বলে আশা করা যায়।

 

আত্মহত্যা যেন এক সামাজিক ব্যাধি
—এস এম জাহিদুল আলম

সম্প্রতি দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন—এটা প্রায় সকলেরই জানা। এই আত্মহত্যার জন্য সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমাদের এই সুশীল সমাজ। সবাই একটু আঁতকে উঠতে পারেন—আমি এত বড় ইস্যুতে শুধুমাত্র সমাজকেই দায়ী করলাম বলে! আমরা যদি একটু দেখি অধিকাংশ আত্মহত্যার মূলেই রয়েছে ‘সমাজ কী বলবে’ ভাবনা। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধে ব্যর্থতার পর এই সমাজ থেকে নিজেদের লুকাতে শিক্ষার্থীর একটি অংশ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বেকারত্বের বিষয়ে আসা যাক। দেশসেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে বের হওয়া একজন যুবক যখন বেকারত্বের গ্লানি নিয়ে ঘুরতে থাকেন, তখন এই সমাজ তার পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো বলতে থাকে—এত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পরও একটা চাকরি যোগাড় করতে পারনি? এসব বিষয় এড়াতে সেই যুবক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

 

আত্মহত্যার আগাম বার্তা আমলে নেওয়া উচিত
—ইলমা জাহান নূর

চলতি সময়ে আত্মহত্যা ইস্যু প্রকট আকার ধারণ করেছে। মানুষ জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানোটাকেই সবচেয়ে সহজ সমাধান মনে করে—যার সর্বোচ্চ ধাপ আত্মহত্যা! তবে সেই আত্মঘাতী পদক্ষেপের প্রতিটি ছাপ রেখে যায় প্রতি পদে, আচরণে, কথাবার্তায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ইন্টারনেটের বদৌলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত মানুষের কাছে মুহূর্তেই পৌঁছে যায় তাদের হতাশা, বাঁচতে চাওয়ার আর্তনাদ। কিন্তু তা মোবাইল ফোনের দেয়াল টপকে মানুষের হূদয় ভেদ করতে ব্যর্থ হয়। হয়ত তারাও জীবন নিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচতে চাইত, কিন্তু তাদের প্রিয়জনদের নিকট ভরসার শেষ জায়গাটুকুতে পৌঁছাতে না পেরে পাড়ি দেয় অন্তিম গন্তব্যে। আর তাদের হারিয়ে ফেলার পর আমাদের টনক নড়ে। তখন আমরা আফসোস করি। আমাদের কর্তব্য, তাদের সেই ভরসার জায়গাটুকু প্রশস্ত করে দেওয়া। কেননা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ কখনো ব্যর্থতার গ্লানি সাথে নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে আসেনি।

ইত্তেফাক/এসটিএম