শুক্রবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

পকেট কাটার হিড়িক পর্যটন এলাকায়

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

কর্মব্যস্ততার অবসরে অবকাশ যাপন করতে সুবিধাজনক মৌসুমে দেশের উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত কমবেশি মানুষ ভ্রমণ করে থাকে। আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেকে অর্থসংকটের কারণে ভ্রমণ করতে পারেন না। দেখা গেছে, যাতায়াত ভাড়া ছাড়াও থাকা-খাওয়া বাবদ ব্যয়ভারের হিসাবনিকাশ করলে সাধারণ পর্যটকদের ঘাম ঝরতে শুরু করে। একবার কেউ ভ্রমণে গেলেও দ্বিতীয় বারের মতো আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন পর্যটক। তার পরও ভ্রমণপিপাসুদের সংখ্যা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশে। তার প্রধান কারণ হচ্ছে ফেসবুক ইউটিউবের ব্যবহার। ফেসবুকে পোস্ট দেবে এবং ইউটিউবের জন্য ভিডিও চিত্র ধারণ করবে; মূলত এ দুটি কারণে ভ্রমণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হালে। বিষয়টাকে মন্দ দৃষ্টিতে দেখছি না। ইউটিউবের কল্যাণে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে, এটা আমাদের মানতেই হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমরা তা উপলব্ধিও করি। বিভিন্ন স্পটে গিয়ে দেখেছি, বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে শুরু করে ছোটরাও এখন ভ্রমণে আগ্রহী। তবে তরুণদের সংখ্যাই বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে।

আমরা জানি, ভ্রমণের পিক-অফ সিজন আছে। অফ সিজনে ভ্রমণে একটা সুবিধা হচ্ছে হোটেলভাড়া অন্য সময়ের তুলনায় কিছুটা কমে পাওয়া যায়। তবে আহামরি কম নয়। মধ্যম মানের একটা হোটেল কামরায় এক রাতের জন্য ঘুমাতে নিম্নে ২ হাজার টাকা খরচ করতে হয় পর্যটকদের।

কক্সবাজার ভ্রমণের কথা ধরা যাক। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত প্রধান পর্যটননগরী হচ্ছে কক্সবাজার। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক মানের শহর বলা যায়। শুধু বাংলাদেশই নয়, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশ্বের দীর্ঘতম একটি সমুদ্রসৈকত। এখানে যাতায়াত ভাড়া সাধ্যের মধ্যে থাকলেও হোটেল ভাড়াসহ যাবতীয় খরচ সাধ্যের মধ্যে নেই।

পর্যটন স্পটের কারণে পিক সিজনে ভাড়া একটু বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই বলে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া কারোরই কাম্য নয়। জানা যায়, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখানে দেড় থেকে ২ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। এ ছাড়াও বছরের বিভিন্ন উত্সব মিলিয়ে ধরা যায় আরো এক মাস। এ সময় একজন রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ব্যবসায়ী পর্যন্ত রমরমা অবস্থায় থাকে। মাত্র চার-পাঁচ মাসের আয় দিয়ে বছরের অন্য সময়গুলো অতিবাহিত করেন তারা। প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, একজন ব্যবসায়ী বা শ্রমজীবী মানুষ যদি চার-পাঁচ মাসের আয় দিয়ে সারাটা বছর অতিবাহিত করেন, তাহলে কতটা চাপ পড়তে পারে একজন পর্যটকদের ওপর।

আমরা দেখেছি কক্সবাজারে সাধারণ মানের একটি হোটেলে যদি এক রাত যাপন করতে হয়, সেক্ষেত্রে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয়। আরেকটু ভালো হলে ১০ হাজারে গিয়ে ঠেকে, তার চেয়ে ভালো হলে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঠেকে। এ গেল আবাসিক হোটেলের হিসাব। খাবার হোটেলের কথায় আসা যাক এবার। হোটেলগুলো মানুষের পকেট কাটে এ কথা বললে ভুল হবে, রীতিমতো তারা পর্যটকদের গলা কেটে নিচ্ছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, বিচের চেয়ারে বসতে গেলেও বিপত্তি ঘটে। ঘণ্টায় ৪০-৫০ টাকা হারে গুনতে হচ্ছে। এটা শুধু কক্সবাজারই নয়, কুয়াকাটায়ও লক্ষ করা যায়। একইভাবে আরো অনিয়ম লক্ষ করা যায় সেন্টমার্টিন দ্বীপ, কুয়াকাটা, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, সুন্দরবন, নিঝুম দ্বীপ, সিলেটসহ দেশের সমস্ত পর্যটন এলাকায়। বিশেষ করে সিলেটের বিভিন্ন স্পটে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম লক্ষ করা যায়। যেমন :বিছনাকান্দির কথাই ধরা যাক। হাদারপার বাজার থেকে বিছানাকান্দি যাতায়াতে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন। এ অল্প সময়ের দূরত্বের জন্য ছোট্ট একটা ট্রলার ভাড়া বাবদ আড়াই হাজার টাকা গুনতে হয়। সেখানে গিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলে আরেক বিপত্তি ঘটে, শুধু প্রস্রাবের ক্ষেত্রে ৩০ টাকা গুনতে হয় জনপ্রতি। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে জলে গড়াগড়ি করে মূত্রত্যাগ করেন। আরেকটা আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে হিজড়া। এখানে হিজড়ারা পর্যটকদের মারাত্মকভাবে হেনস্তা করছে। পর্যটকদের ট্রলার প্রতি ২০০ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে মারমুখী হয়ে খিস্তিখেউর শুনিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। তখন পর্যটক বাধ্য হয়ে ওদের সঙ্গে আপস করে অতিরিক্ত টাকা বিসর্জন দেয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ট্রলার চালকেরাও। চাঁদা না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটক ট্রলার ছাড়তে বললেও তারা ট্রলারের ইঞ্জিন চালু করে না। বিছানাকান্দি ছাড়াও সিলেটের ভোলাগঞ্জ, রাতারগুল, জাফলং যেখানেই যান, ফেরার সময় পর্যটকরা তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরেন।

পর্যটকদের শুধু বিভিন্ন স্পটেই গচ্ছা দিতে হচ্ছে না, গচ্ছা দিতে হচ্ছে চলতি পথেও। হাইওয়ের পাশে সামান্য জলখাবার খেতে নামলেই পকেট কেটে নিতে দেখা যায়। দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে নিঝুম দ্বীপ, কুয়াকাটা ভ্রমণে গেলে যাতায়াতের সময় লঞ্চে ভীষণ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। যে কোনো খাবার দ্বিগুণ দামে কিনতে হয়। প্রতিবাদ করতে গেলে প্রচণ্ডভাবে নাজেহাল হতে হয় যাত্রীদের। বাগিবতণ্ডায় জড়ালে না খেয়ে রাত যাপন করতে হয়। লঞ্চ ছাড়াও দেশের সমস্ত পর্যটন এলাকার হালচিত্র একই রকম। অর্থাত্ যেখানে রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল রয়েছে সব জায়গায় একই অবস্থা। বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে, পর্যটক তার পকেটের মালিক হলেও ভেতরের জিনিসের মালিকানা আর ধরে রাখতে পারে না। এমনই সাংঘাতিক এক পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে পর্যটকদের। মনে হচ্ছে ভ্রমণ নয়, পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে ফিরছে পর্যটকরা।

সর্বশেষ বলতে হয়, আমাদের পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ; কিন্তু নিরাপদ নয়। দেশি-বিদেশি পর্যটক বাড়াতে হলে কিংবা এ শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে হলে দ্রুত নিরাপত্তার দিক নিয়ে ভাবতে হবে; পকেট কেটে নেওয়ার দিকেও নজর দিতে হবে। তাহলে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে দ্রুত। মনে রাখতে হবে, পর্যটক নিরুত্সাহিত হওয়ার মানে হচ্ছে এ শিল্পের মুখ থুবড়ে পড়া আর স্থানীয়দের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন