শুক্রবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৪ আশ্বিন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বাইডেন রাজনৈতিক সমালোচনার সম্মুখীন হলেও আমেরিকানরা ঘরে ফিরেছে

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৫:৩০

যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ নাগরিকেকে মুক্ত করার বিনিময়ে ইরানের ফ্রিজ করে রাখা ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড় দেওয়া নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে ঘায়েল করতে চেষ্টা করাটা একটি অপচেষ্টাই। এটি তাকে দুর্বল করতে চাওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র। তার পরও এটি সর্বোচ্চ পদে আসীন প্রেসিডেন্টের জন্য একটি অস্বস্তিকর দ্বিধা হিসাবে কাজ করবে। তারা ভূরাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে যে মানবাধিকার বিষয়ক উদ্বেগ প্রকাশ করে ভেলকি দেখাচ্ছেন, তার কোনো উত্তর নেই। যুক্তরাষ্ট্র কখনো ভুলক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের কাউকে বন্দি করা অথবা জিম্মি করা নিয়ে কোনো দেশের সঙ্গে সাধারণত কোনো চুক্তি করে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি শত্রুভাবাপন্ন দেশ ইরান, রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা অথবা তালেবানদের সঙ্গে যে আপসরফা করেছে এবং যে রাজনৈতিক ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে, তা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ শত্রুভাবাপন্ন পক্ষের জন্য বিচার করা কঠিন বটে। তবে একজন রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হয় যে, ইরান ও রাশিয়ার মতো ভয়াবহ বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার শক্তি আছে কি না। অথবা সমালোচনার ভয়ে অথবা সমালোচনা তীব্র হওয়ার ভয়ে সেই পদক্ষেপ থেকে সরে থাকবে কি না। এই ক্ষেত্রে শত্রুদের সঙ্গে সমঝোতা করার বিষয়টি দুর্বলতার পরিবর্তে বরং রাজনৈতিক মুক্তিরই পরিচায়ক। কিন্তু কাতারের মাধ্যমে ফ্রিজ করা অর্থ ছাড় দিয়ে পাঁচ জন নাগরিককে মুক্ত করার পুরস্কার হিসাবে বাইডেন সমালোচনারই সম্মুখীন হচ্ছেন। রিপাবলিকানরা তার এই পদক্ষেপকে দুর্বলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে শত্রুদের প্রতি সদয় হয়ে ওঠা বলে বর্ণনা করতে চেষ্টা করছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বলেছেন, এই পদক্ষেপ একটি ভয়াবহ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সত্যটাকে ঢেকে দিয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন, ‘ইরানের সঙ্গে ৬ বিলিয়ন ডলারের বন্দি বিনিময় চুক্তি’। ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘একবার যদি অর্থ প্রদান শুরু করেন, তাহলে সর্বদাই এমন অর্থ দিতে হবে এবং এমন আরো জিম্মি করার চেষ্টা উত্সাহিত হবে।’ তিনি ভুলে গেছেন যে, প্রশাসনের এই উদ্যোগ শুধু মানবিক দিকে বিবেচনায় ইরানের অর্থ ছাড় দেওয়ামাত্র।

 একজন সিনিয়র অফিশিয়াল জানিয়েছেন, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, আগামী সোমবার প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিরুদ্ধে ‘গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসকে প্ররোচিত করা’ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করবেন। এবং চীনের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার মধ্য দিয়ে লাভ অর্জন করা যায়।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মাইক পেন্সের এই সমালোচনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্বাচনি প্রচারের অংশ। তারা ভুলে গেছেন, অথবা উপেক্ষা করেছেন তাদের সময়ে আমেরিকানদের ছাড়িয়ে আনার চুক্তির কথা। ২০১৯ সালে ট্রাম্প বন্দি বিনিময়ের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক শিউ ওয়াংকে ছাড়িয়ে আনতে। উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক উনের কাছ থেকে ২০১৮ সালে তিন জন আমেরিকানকে ছাড়িয়ে এনে স্বাগত জানিয়েছিলেন তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেটি ভালো আচরণের জন্য ছাড়। তবু বাইডেনের মতোই ট্রাম্পের সেই আপস আমেরিকার পরিবারগুলেকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছিল।

বর্তমান এই ঘটনা বাইডেনের সমালোচকরা ঝড় তুলবেন, যা ইরানের সঙ্গে পরমাণু বিষয় নিয়ে আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই আলোচনা থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ছিটকে বের হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গ্র্যান্ড ওল্প পার্টির আইনপ্রণেতারা আরো বড় প্রশ্ন তোলেন।

উদাহরণস্বরূপ, টেক্সাসের প্রতিনিধি ও হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান মাইক ম্যাককল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ চুক্তিটি ‘ভবিষ্যতে মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করার ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রতিপক্ষদের প্রত্যক্ষভাবে আরো উত্সাহিত করবে’। এমনটি ঘটতে পারে, যদিও তা প্রমাণ করা কঠিন। যদিও ইরানের মতো প্রতিপক্ষের দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক দশক ধরে চলে আসা অচলায়তনমূলক সম্পর্কের মধ্যে এই জাতীয় কৌশলকে ন্যায্য খেলা বলে মনে করেছে। বহুল আলোচিত ১৯৭৯-৮০ সালে মার্কিন দূতাবাস অবরোধের সময়ও ঘটে এমন ঘটনা। একই ধরনের রিজার্ভেশন ছিল রাশিয়ার সঙ্গে বন্দি অদলবদলের সময়েও। যেমন, গত বছর ডব্লিউএনবিএর তারকা-সাংবাদিক ব্রিটনি গ্রিনারের মুক্তির জন্য আমেরিকায় কারাবন্দি রাশিয়ার অস্ত্র ব্যবসায়ী ভিক্টর বাউটকে ব্যবহার করা হয়েছিল। মস্কো পরবর্তী সময়ে বন্দি আমেরিকান পল হুইলান ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রিপোর্টার ইভান গারশকোভিচের ভাগ্য নিয়েও দরকষাকষি চালায়।

কিন্তু হোয়াইট হাউজে যে কেউ থাকুন না কেন, বিদেশে বন্দি আমেরিকানদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যতই চুক্তি করা হোক, এতে তার রাজনৈতিক শত্রুদের সমালোচনার মুখে পড়তে হবে। তারা এই দাবি করবেন যে, এক্ষেত্রে তাদের আরো ভালো করা উচিত ছিল। যারা ক্ষমতার বাইরে রয়েছেন এবং পদের ভার বহন করছেন না, তাদের এক্ষেত্রে রয়েছে যেন বিশেষ অধিকার। যেমন—জিওপি ফ্রন্ট-রানার ডোনাল্ড ট্রাম্প হচ্ছেন তার চূড়ান্ত উদাহরণ। তিনি সাম্প্রতিক কালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ‘অযোগ্য’ বলে দাবি করেছেন। তার মতে, এই ইরান চুক্তি সন্ত্রাসীদের আরো উসকে দেবে।

কিন্তু কূটনৈতিক দরকষাকষি এবং বন্দি বিনিময় চুক্তি ইরানের সঙ্গে এর আগেও করা হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করেছে। এটি এমন মৌলিক বিষয়, যা তাত্ক্ষণিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। বিদেশে মার্কিন নাগরিকদের মুক্ত করার জন্য জো বাইডেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, বারাক ওবামা এবং রোনাল্ড রিগ্যানের সময় সম্পাদিত প্রতিটি চুক্তি একটি রাজনৈতিক দাবানলের মতো ঝড় তুলেছে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও উদারতা প্রকাশের বহিঃপ্রকাশও বটে। দেশীয় রাজনীতিতে এর তুমুল অভিঘাত পড়ে। এতে প্রমাণিত হয়, প্রেসিডেন্ট তার বন্দি নাগরিকদের বিদেশের মাটি থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তরিক ও উদ্গ্রীব। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হচ্ছে।

আমেরিকানরা কি এমন একজন কমান্ডার-ইন-চিফকে পছন্দ করবেন, যিনি কঠোরভাবে জিম্মি বা বন্দিদের জন্য মার্কিন শত্রুদের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা না করাকে গুরুত্ব দেবেন? এটা হতে পারে না। কেননা এতে কেবল আরো অর্থ বাজেয়াপ্তকে উত্সাহিত করবে এবং সেই কট্টর বৈদেশিক নীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। নাকি কেউ অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ হলেও শান্তি স্থাপনের খাতিরে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনাকে প্রেসিডেন্ট কোনো আমলই দেবেন না? বরং এক্ষেত্রে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা করা দরকার, তা-ই করবেন।

যারা ইতিমধ্যে মুক্ত হয়েছেন, তাদের কাছে রাজনৈতিক বিবেচনা কোনো ব্যাপার নয়। তাদের মূল উপজীব্য মানবতা। গত সোমবার ইরান থেকে মুক্তি পাওয়া এমাদ শারঘির বোন নেদা শারঘি যেমনটি বলেছেন—‘ইনি আমার ভাই, এটা কোনো বিমূর্ত নীতি নয়। আমরা মানুষের জীবন রক্ষার কথা বলছি। নিরপরাধ আমেরিকানদের জীবন বাঁচানোর বিষয়ে এতে পক্ষপাতমূলক কিছু নেই এবং আজকের দিনটি আমেরিকান ঐক্যের মুহূর্ত হওয়া উচিত। কারণ আমরা তাদের বাড়িতে স্বাগত জানাতে পারছি।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হোয়াইট হাউজ বন্দিসংক্রান্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলেছে। কারণ বন্দিদের পরিবারগুলো সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারসহ প্রেসিডেন্টদের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে আরো দক্ষ হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে কূটনীতিকরা এই পরিবারগুলোকে তাদের প্রিয়জনের স্বাধীনতার জন্য যাতে আরো চড়া মূল্য দিতে না হয়, এই জন্য বিষয়টিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে বাইরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। কয়েক জন প্রেসিডেন্ট এমন যুক্তিও দিয়েছিলেন যে, এতে ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার কারণে তাদের বিপদ আরো বাড়বে। তারা হেনস্তার শিকার হবেন। কিন্তু গ্রিনারের সমর্থকদের অত্যাধুনিক চাপ সৃষ্টিমূলক প্রচার-প্রচারণা এই খেলা বদলে দিয়েছে। পল হুইলানের পরিবার দৃশ্যত একটি শক্তিশালী মিডিয়া প্রচারাভিযান পরিচালনা করেছে। জো বাইডেন ও অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে।

গত সোমবার সম্পাদিত এই চুক্তির রয়েছে তিনটি অংশ—এমাদ শারঘি, মোরাদ তাহবাজ ও সিয়ামক নামাজি। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা কারাগারে ছিলেন। অন্য দুই আমেরিকানের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।

চুক্তি সম্পাদনকালে বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ কথার ওপর জোর দিয়েছেন যে, ৬ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ছাড়ের অর্থ হলো, তারা এই অর্থ শুধু ইরানের মানবিক কাজে ব্যবহার করবেন। এর প্রতিটি লেনদেন মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ পর্যবেক্ষণ করবে। কিন্তু ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার উত্তাপে চুক্তির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের গুরুত্ব ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেছে।

লেখক: সিএনএনের হোয়াইট হাউজ ও বিশ্বরাজনীতি বিষয়ক সিনিয়র প্রতিবেদক

সিএনএন থেকে অনুবাদ :ফাইজুল ইসলাম

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন