নওরীনের যুদ্ধ জয়ের কথা

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৮:২৭

নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য স্বপ্ন দেখতে হয়, সাধনা থাকতে হয়। সঠিক পরিকল্পনা আর ইচ্ছাশক্তি থাকলেই সফলতা সম্ভব। আর সেই সফলতা এলেই স্বীকৃতি পায় ‘প্রতিষ্ঠার গল্প’। তেমনই নিজের ভাগ্য বদলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ ‘নওরীন আহমেদ’। একজন উদ্যোক্তা থেকে নিজেকে পৌঁছেছেন প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবসায়ীর কাতারে। তার কাছে ব্যবসাটা ছিল স্বপ্নের মতো। শত বাঁধা আর প্রতিকূলতার মধ্যেও দমে যাননি, হননি নিরাশ। সেই দিনগুলোই আজ তার জীবনে যুদ্ধ জয়ের স্মৃতি, যা তিনি ভুলে যাননি। 

‘সিগনেচার লাইফস্টাইল’ নামক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ফ্যাক্টরির প্রতিষ্ঠাতা নওরীন আহমেদ। বর্তমানে নওরীনের ফ্যাক্টরিতে তৈরি পোশাক বিক্রি হয় দেশের নামিদামি মলে। ২০১৬ সাল থেকে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু তার। ছোট উদ্যোগ থেকেই পথচলা শুরু। প্রথমে সবকিছুই গোলমেলে ছিল। রুদ্ধ পথে হাঁটতে হাঁটতে সুখ হারিয়ে গেল। তবে নানা বাঁধা পেরিয়ে ফেরেন ব্যবসা জীবনে। নিজেকে চালিয়ে নিলেন ইচ্ছাশক্তির জোড়ে। 

ব্যবসা শুরুর গল্প জানতে চাইলে নওরিন বলেন, প্রথম উদ্যোগ যখন নিই, তখনই বাবা মারা গেলেন। এরপর পরিবারের দায়িত্ব আসল নিজের উপর। শুরুতেই এত বড় একটা ধাক্কা আমাকে পিছিয়ে দেয়। পূর্ণোদ্যমে ফের যাত্রা শুরু করেছি ২০১৬ সালে। এমন সময় ব্যবসায়ের অনুপ্রেরণা, নিত্যদিনের পরামর্শক হয়ে পাশে দাঁড়ায় সফল ব্যবসায়ী রিপন আহমেদ সাকিব। তিনিই আমাকে শেখান, কীভাবে কঠিন পথ সহজে এগিয়ে যেতে হবে, আমার মানসিক সাপোর্ট থেকে শুরু করে বিজনেস কিভাবে এগিয়ে নিতে হবে আমার পেছনে থেকে সর্বদা যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন এবং যাচ্ছেন ।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ছোট ছোট উদ্যোগ নেওয়া শুরু করি। আমার সফলতা আসতে শুরু করে একটি ই-কমার্সে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে। তাদের প্রোডাক্ট সরবরাহ করতে গিয়ে আমার গার্মেন্টসের পণ্য সম্পর্কে বেশ জানাশোনা হয়। এরই সূত্র ধরে প্রতিষ্ঠা করি বায়িং হাউজ।

নিজ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নওরীন আহমেদ বলেন, আমি মূলত বাচ্চাদের পোশাক, মেল-ফিমেলদের ফ্যাশনেবল পোশাক নিয়ে কাজ করি। হোলসেল ক্যাটাগরিতে আমরা এখন দেশের মধ্যে অন্যতম পর্যায়ে অবস্থান করছি। পণ্যের মান ও দামের সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এত বেশি পরিশ্রম ও আঁধার কাটিয়ে তিনজন ক্রেতা নিয়ে শুরু করা আমার ব্যবসাটি আজ ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানে পণ্য সরবরাহ করছে।

নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা এবং ক্যারিয়ার গড়ার প্রতি আগ্রহী। বয়স যখন ১৫ বছর, তখন থেকেই নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু। আমার জীবনের আদর্শ আমার বাবা। তার থেকে শিখেছি অনেক কিছু। তার স্বপ্ন নিয়েই আসলে বড় হওয়া। আমার ব্যবসায়ের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে পাশে ছিলেন আমার বিজনেস মেন্টর রিপন আহমেদ সাকিব । মানুষটি আমার ব্যবসায়ের সব গোছাতে সহায়তা করেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন।

উদ্যোক্তার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের জীবনে চ্যালেঞ্জ না থাকলে সফলতা আসে না। আমার প্রতিষ্ঠানটি রাজধানী ঢাকার উত্তরায় শুরু হয়। আমি যখন যাত্রা শুরু করি, তখন উত্তরায় প্রায় ৮-৯ হাজার প্রতিষ্ঠিত বায়িং হাউজ। এত প্রতিযোগিতার মধ্যেও একজন নারী হয়ে নিজেকে নিজের প্রতিষ্ঠা করা বেশি কঠিন ছিল। শুধু তা-ই নয়, আমাদের পণ্যের মান এবং দামও তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে কঠিন কাজটিও সফল করেছি আমি। ক্ষুদ্র থেকে বড়, যে কোনো উদ্যোক্তাকে আমি সমান গুরুত্ব দেই বলেই আজ এত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। তবে সব সময় চেষ্টা করি, নতুন উদ্যোক্তা এবং তাদের উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করতে। 

সিগনেচার লাইফস্টাইল নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নওরীন আহমেদ বলেন, ছোটবেলা থেকেই এক ধরনের প্যাশন কাজ করতো। লাইফে আমার একটা চেয়ার লাগবে, যেখানে বসে সারাবিশ্বকে আমি দেখতে পারবো ও বিশ্বের মানুষ আমাকে চিনবে। এ ধরনের প্যাশন নিয়েই আমি এগিয়েছি। কারণ, বাবা আমাকে খুব বেশি ইন্সপায়ার করতেন বিজনেসের জন্য। বাবা চাইতেন, আমি যেন এমন কেউ হই যাকে সারা বাংলাদেশ যেন চেনে। ওই যে একটা জিদ সেটা আমার মধ্যে সবসময় ছিল; এ কারণে ক্যারিয়ারে ফোকাস করতে হেল্প করেছে। আমার বাবা যখন হ্যার্ট অ্যাটাক করেন ও এরপর মারা যান তখন থেকে পরিবারের যে রেস্পন্সিবিলিটি সেটি আমার মধ্যে কাজ করে। শুরুতে আমি আমার পরিবার থেকে কোনরকম কোন সাপোর্ট পাইনি, যখন সবার সহযোগিতা বেশি দরকার ছিলো তখন কারও কোন সহযোগিতা আমি পাইনি, বরং পরিবার থেকে বিষয়গুলো নিয়ে আমি মানসিকভাবে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছি, প্রচুর কষ্ট বুকে বেঁধে আমাকে আমার কাজ করে যেতে হয়েছে সবাই বিষয়গুলোকে খুবই নেগেটিভভাবে নিতো কিন্তু যখন আমি দেখিয়েছি আমি একটা মেয়ে হয়েও পারি, স্টাবলিশড হয়ে গেছি তখন সবার বাহবা পেয়েছি ।

কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে নওরীন বলেন, বড়বড় ব্যান্ড শপগুলোর সাথে কাজ করে ও ফরেন বায়ারদের সাথে কাজের অভিজ্ঞতায় সবমিলিয়ে যে জায়গাটা আমার তৈরি হয়েছে এটাকে আমি অনেক ভালোবাসি। সিগনেচার লাইফস্টাইলকে এমন একটা ব্যান্ড হিসেবে তৈরি করতে চাচ্ছি; যাকে সারা বাংলাদেশ ও সারা বিশ্বের সব জায়গায় মানুষ এটাকে এক নামেই চিনবে এবং জানবে এটির সিইও নওরীন আহমেদ। 

ইত্তেফাক/এএইচপি