ঢাকার নারী উদ্যোক্তা হামিদা। কাজ করেন পাটপণ্য নিয়ে। ভালো পাটপণ্যের জন্য ছুটে যান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিভিন্ন সোর্স থেকে ম্যাটেরিয়াল সংগ্রহ করে নারায়ণগঞ্জে নিজেই ছোটোখাটো একটি কারখানা তৈরি করেন। অথচ কয়েক বছর আগেও তার এমন পরিস্থিতি ছিল না।
করোনা মাহামারির আগে করতেন চাকরি। করোনা আসার সঙ্গে সঙ্গে থাবা পড়ে হামিদার চাকরির ওপর। একসঙ্গে অনেক সহকর্মী চাকরিচ্যুত হন। অনেক জায়গায় নতুন চাকরির জন্য চেষ্টা করেও কাজ হয়নি।
সেই সময়ের অভিজ্ঞতা জানান এভাবে, 'একদিন মেয়েকে খাওয়াচ্ছি। তখন টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হোন। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করছি। উদ্যোক্তাদের সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে।’ কথাটি মাথায় ঘুরতে থাকে।”
পাটের তৈরি পণ্য সম্পর্কে হামিদার আগেই ধারণা ছিল। সেই ধারণা আর কিছু অর্থ সম্বল করে নেমে পড়েন মাঠে। বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে পাটের তৈরি পণ্যের সোর্সিং খুঁজে বের করেন। অর্থাৎ, পণ্য ও পরিষেবার জন্য সরবরাহকারীদের খুঁজে বের করেন। সেই সোর্সিং দিয়ে আগাতে আগাতে এখন প্রায় ২৫টি ভিন্ন ভিন্ন পাটের তৈরি পণ্যের সম্ভার তার উদ্যোগে।
হামিদা বলেন, আমি প্রথমে যাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ শুরু করি, তাদের অভিজ্ঞতাও তেমন ছিল না। তারাও আমার মতোই নতুন। সবাইকে বলি, আমার ওপর বিশ্বাস রাখেন। আমি লাভবান হলে আপনাদের সবাইকে লাভবান করব নিশ্চিত। তাদের বিশ্বাস আর প্রধানমন্ত্রীর সেই উৎসাহ আমার কাজে লেগেছে।
বর্তমানে উদ্যোক্তার সংখ্যা অনেক। রাজধানী থেকে প্রান্তিক, ঘরের নারীরা এখন নিজেরাই নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। তারা এখন অর্থনীতি সচল করছে। আর তাই ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ক্ষেত্রে ঋণদান ব্যবস্থার সংস্কার করে এই প্রকল্পে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষেত্রগুলো বন্ধক ছাড়াই ২ লাখ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হবে। এই ঋণের সুদ ১ শতাংশ হারে কমানো হবে।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নারীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা, স্বল্প সুদে ঋণ, নারীর জন্য সহায়ক পরিবেশ, সংকটমুক্ত কর্মমুখর প্রতিবেশের কারণে দেশে প্রচুর নারী উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপিতে বর্তমান নারীর অবদান ১০ শতাংশ এবং উদ্যোক্তার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন করা হলে তাদের জিডিপিতে অবদান হবে ২৫ শতাংশ।
নারী এখন যেমন উদ্যোগী হচ্ছেন, তেমনই তারা অনলাইন অর্থনীতিকে আপন ভেবে নিচ্ছেন, নিরাপদ ভাবছেন। হামিদা বলেন, এখন আমি কোনো পেমেন্ট ক্যাশে করি না। আমি যত জায়গায় আমার পণ্যের সোর্সিংয়ের জন্য পেমেন্ট করি, সবই অনলাইনে। অথচ আগে হলে আমাকে ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরে টাকা জমা দিতে হতো। সেই পরিবেশ এখন নেই। এখন সবই ডিজিটাল। এমনকি আমার কাস্টমাররাও কেউ ক্যাশে পেমেন্ট করেন না। সবাই অনলাইনে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মোবাইল ফোনভিত্তিক ডিজিটাল আর্থিক সেবা ‘নগদ’-এর মাধ্যমে করেন।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ১ লাখ ৫৯৩ কোটি টাকার মোবাইল ব্যাংকিং-এ লেনদেনের মধ্যে টাকা জমা ও উত্তোলন হয়েছে যথাক্রমে ৩১ হাজার ২৬০ কোটি ও ২৮ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। গ্রাহক থেকে গ্রাহকের কাছে পাঠানো হয়েছে ২৮ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। কেনাকাটায় খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৭৭২ কোটি, সরকারি ভাতা দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ১৪৪ কোটি এবং বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। এছাড়া মোবাইল রিচার্জ করা হয়েছে ৯০৫ কোটি টাকা এবং পরিষেবা বিল দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা।
অনলাইন অর্থনীতি এখন বড়ো আকার ধারণ করেছে। অথচ ১০ বছর আগেও কেউই অনলাইনে অর্থ লেনদেন করতে সাহস করতেন না। ভয় পেতেন। প্রতারণার ভয়ে ব্যাংক ছাড়া অন্য কোথাও লেনদেন করার কথা ভাবতেন না। সেই জায়গা থেকে এখন দেশ অনেক এগিয়ে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশের কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যে কেউই যে কোনো মুহূর্তে অর্থ লেনদেন করতে পারছেন।
এই যে স্মার্ট অর্থনীতি বা স্মার্ট ইকোনমি, এটা হয়েছে বর্তমান সরকারের সময়ে। এখন কেউই টাকা নিয়ে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে যান না। স্মার্ট মোবাইলের মাধ্যমেই দেশের মানুষ স্মার্ট অর্থনীতি বা স্মার্ট ইকোনমির সুফল পাচ্ছেন।
অনলাইনে কেনাকাটা, অর্থ লেনদেন, পণ্য বাছাই, প্রসার-প্রচার, অর্ডার এবং পণ্য সম্পর্কে ফিডব্যাক সবই সম্ভব। স্মার্ট বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিটি হচ্ছে স্মার্ট অর্থনীতি। স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার, স্মার্ট সমাজ এ সবই স্মার্ট অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তার এক বক্তৃতায় বলেন, স্মার্ট ইকোনমির মূল মেরুদ- হবেন আমাদের স্মার্ট উদ্যোক্তারা। দেশে বর্তমানে ২ হাজার ৫০০ স্টার্টআপ বা শুরুর পর্যায়ের ব্যাবসা রয়েছে। যারা ১৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। আমাদের লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের আইটি সেক্টরে আরও ৫ হাজার স্টার্ট-আপে উন্নীত করা, এর মাধ্যমে ৩০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে এই সেবা খাত থেকে জিডিপিতে অবদান দাঁড়াবে ২০ শতাংশ।
আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতাহারে রাজনৈতিক অঙ্গীকার আকারে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ রূপকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা আসছে। সেই লক্ষ্যে অর্থনীতির ক্ষেত্রে সনাতনী ব্যবস্থার আধুনিকায়ন বা রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থনীতি গতিশীল করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
স্মার্ট অর্থনীতির ফলে শুধু শিল্প উৎপাদনই বৃদ্ধি পাবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন ও অর্থনীতি সমৃদ্ধ করবে দেশ।
এই আধুনিকায়ন করা হবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংকস (আইওটি), ব্লকচেইনের মতো অগ্রসর প্রযুক্তির দ্বারা। কৃষি, শিল্প, শিক্ষাসহ প্রায় সব খাতেই এসব প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভ্যালু যোগ হবে। ফলে ডিজিটাল অর্থনীতিও দ্রুত বিকশিত হবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
