বাংলাদেশের মাটিতে সালফার ঘাটতি ও করণীয়

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:৩০

ফসল উৎপাদনের জন্য কমপক্ষে ১৭টি মৌলিক উপাদান প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ৯টি মুখ্য পুষ্টি-উপাদান গাছ বেশি পরিমাণে শোষণ করে নেয়। যার মধ্যে তিনটি মুখ্য উপাদান, যেমন—কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন বাতাস ও পানি থেকে গাছ গ্রহণ করে। তিনটি প্রাথমিক পুষ্টি উপাদান যেমন—নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম মাটি থেকে পাওয়া যায়। বাকি তিনটি মুখ্য পুষ্টি-উপাদান, যেমন—সালফার, ক্যালশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়াম মাটি থেকে পাওয়া যায়। এ ছাড়া আরো আছে আটটি অনুখাদ্য উপাদান যেমন—আয়রন, মলিবডেনাম, বোরন, কপার, অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক ও ক্লোরিন, যা মাটিতে থাকা প্রয়োজন। এর কোনো একটি পুষ্টি উপাদানের অভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উন্নয়ন সঠিকভাবে হতে পারে না। ফলে ফসলের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

আধুনিক কৃষিব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে মাটিতে মৌলিক উপাদানের ঘাটতি দেখা যায়। বাংলাদেশের মাটিতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি দেখা দেয় ১৯৫১ সালে। এরপর ১৯৫৭ সাল থেকে ঘাটতির তালিকায় নাইট্রোজেনের সঙ্গে ফসফরাস যুক্ত হয়। এ তালিকায় পটাশিয়াম যুক্ত হয় ১৯৬০ সালের দিকে। ১৯৮০ সাল থেকে সালফারও ঘাটতির তালিকায় যুক্ত হয়। ১৯৮২ সাল থেকে জিংক ঘাটতি তালিকায় যুক্ত হয়। ১৯৯৫ সাল থেকে বোরন ঘাটতি দেখা দেয় । ২০০০ সাল থেকে ঘাটতির তালিকা আরো দীর্ঘ হয়েছে। এখন আটটি মৌলিক পদার্থ যেমন নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরন, ম্যাগনেশিয়াম এবং মলিবডেনামের ঘাটতি নিয়ে চলছে বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন। এখন যেভাবে চলছে এভাবে কৃত্রিম সারনির্ভর কৃষি উৎপাদন পরিচালিত হলে অদূর ভবিষ্যতে অন্তত ১৭টি মৌলিক পুষ্টি উপাদান তথা সার প্রয়োগ করে এদেশে ফসল উৎপাদন করতে হবে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন।

উদ্ভিদের জন্য সালফার বা গন্ধক ১৭টি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের একটি। এটি প্রায় সব ফসলের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য অপরিহার্য। যে কোনো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের মতো সালফার (S)-এরও উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য কিছু মৌলিক কাজ রয়েছে। সালফার মূলত ক্লোরোফিলের গঠনে ভূমিকা পালন করে, যা সালোক-সংশ্লেষণের মাধ্যমে উদ্ভিদ স্টার্চ, শর্করা, তেল, চর্বি, ভিটামিন এবং অন্যান্য যৌগ তৈরি করে। সালফার হলো তিনটি S-যুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিডের একটি উপাদান (সিস্টিন, সিস্টাইন এবং মেথিওনিন), যা প্রোটিনের বিল্ডিং ব্লক। প্রায় ৯০ শতাংশ উদ্ভিদ এস যুক্ত এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো উপস্থিত থাকে। এ কারণে উদ্ভিদের বীজে তেলের সংশ্লেষণের জন্য পর্যাপ্ত সালফার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সালফার এনজাইম সক্রিয় করে থাকে, যা উদ্ভিদে জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সাহায্য করে। ফসলের ফলন বৃদ্ধি করে এবং উৎপাদনের গুণমান উন্নত করে। কৃষকের উত্পাদিত পণ্যের মান কেমন হবে এবং তার বাজারমূল্য কেমন পাবেন তা সালফারের দ্বারা নির্ধারিত হয়। সালফার উদ্ভিদের বীজে প্রোটিন সংশ্লেষণ করে, বীজে তেলের শতাংশ নির্ধারণ, মিলিং এবং বেকিংয়ের জন্য খাদ্যশস্যের গুণমান উন্নত করে এবং এটি উদ্ভিদের বিশেষ বিপাক এবং প্রোটোপ্লাজমের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। তাছাড়া উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিকাশের সহায়তা করে সালফার। এ উপাদানটির ঘাটতি দেখা দিলে ফসলের পরিপক্বতার সময় বেড়ে যায়, মানও কমে যায়।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা যায় যে, এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০০০ সালে দেশে উর্বরতার ঘাটতিযুক্ত জমির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১০ লাখ হেক্টর। পরের ২০ বছরে আরো প্রায় ১ লাখ হেক্টর ভূমি এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে দেশে উর্বরতা বা পুষ্টি ঘাটতিযুক্ত ভূমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ১১ লাখ হেক্টরে, যা দেশের মোট জমির প্রায় ৭৫ শতাংশ। ২০০১ থেকে ২০২০ সালে মোট ২০ বছরে সারা দেশে ১১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বেড়েছে সালফারের ঘাটতি। সালফারের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৭৬ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর বা ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ জমির। বাংলাদেশের মাটিতে দিন দিন সালফারের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ২০১০ সালে জলাভূমির ধানি জমিতে দো-আঁশ থেকে এঁটেল মাটিতে সালফারের (খুব কম থেকে কম) পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং এটি ২০২০ সালে ৪৬ দশমিক ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং ২০১০ সালে সালফারের উপাদান মাঝারি পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং এটি ২০২০ সালে ২০ দশমিক ৯২ শতাংশে পৌঁছে। মাটিতে সালফারের সর্বোত্তম উপাদান ১১ দশমিক ৩৯ শতাংশ (১০,৯৩,২৯৯ হেক্টর) থেকে ১৫ দশমিক ২১ শতাংশ (১৩,০৫,৮০৮ হেক্টর) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং ২০১০-২০২০-এর মধ্যে মাটির সালফারের (উচ্চ থেকে খুব উচ্চ) পরিমাণ ৩৫ দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে ১৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়।

এই যখন সারা দেশের পুষ্টি উপাদানের চিত্র, তখন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক গবেষণাগার, ফরিদপুর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ফরিদপুর অঞ্চলের মাটির উর্বরতা বা পুষ্টি গুণাগুণ নির্ধারণের জন্য পিএইচ, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফারের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ৭৪৩টি মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৮ শতাংশ জমিতে অতি নিম্ন এবং ৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ জমিতে নিম্ন মাত্রায় এবং ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ জমিতে মধ্যম মাত্রায় সালফারের ঘাটতি আছে। সব মিলিয়ে ৮০ দশমিক ৬১ শতাংশ জমিতে সালফারের ঘাটতি রয়েছে (সারণি-০১)। মাত্র ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ জমিতে সালফারের ঘাটতি নেই।

মাটিতে সালফার ঘাটতি হলে কী ঘটে? এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মাটিতে সালফারের পরিমাণ কমে গেলে মাটির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। মাটির সালফারের পরিমাণ ৯ দশমিক ০ পিপিএম বা এর নিচে হলে ৫০-৭৫ শতাংশ এবং মাটির মধ্যে সালফারের পরিমাণ ৯ দশমিক ১-১৮ দশমিক ০ পিপিএম হলে ২৫-৫০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। মাটির সালফার ১৮ দমমিক ০-২৩ দশমিক ৫ পিপিএমেএর মধ্যে হলে ১০-২৫ শতাংশ উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সালফারের মতো মাটির একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এভাবে কমতে থাকলে ফলনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। 

সর্বোপরি সারা দেশে জলাভূমির ধান ফসলের দো-আঁশ থেকে এঁটেল মাটিতে সালফারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এটি ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং সালফারসমৃদ্ধ সারের অপর্যাপ্ত ব্যবহারের কারণে হতে পারে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৯-২০ সালে কৃষিতে জিপসাম এবং সালফারযুক্ত জিংক সার ব্যবহার করা হয় যথাক্রমে ৩৬০,০০০ মেট্রিক টন এবং ১১৫,০০০ মেট্রিক টন। যার মানে বাংলাদেশের মাটিতে গড়ে সালফার সারের ব্যবহারের পরিমাণ ছিল প্রতি হেক্টর ৫৫ দশমিক ৩২ কেজি ।

মাটির পুষ্টি ঘাটতির প্রতিকার করতে হলে, মাটির গুণমান পরীক্ষা করে পরিমিত মাত্রায় সুষম সার প্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্তিকার পুষ্টির ক্ষয় রোধ করা সম্ভব। মাটির জৈব পদার্থের অপচয় নিয়ন্ত্রণে মাটিতে জৈবসার প্রয়োগের মাধ্যমে জৈব পদার্থ যুক্ত করতে হবে। গাছ বা ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। এছাড়া শস্যের পাশাপাশি একই স্থানে পশুপালন করলে তাদের গোবরের মাধ্যমে জৈব পদার্থের ঘাটতি দূর করা সম্ভব হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, মাটির স্বাস্থ্যের সঙ্গে মানবস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিবিড়। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন টেকসই মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশের কৃষি এখন খোরপোশ কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে উত্তরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মাটির জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এর উর্বরতা বজায় রাখা দেশের ভবিষ্যত্ কৃষি উৎপাদনের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ ব্যাপারে সবার উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, কৃষি মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক গবেষণাগার, ফরিদপুর।

ইত্তেফাক/এমএএম