নিজেকে সংবরণ করিতে হইবে

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:৩০

পঞ্চাশ-ষাট বছর পূর্বে কী ছিল আমাদের অবস্থা? গ্রামগঞ্জে কাদামাটির রাস্তা, ছনের ঘর, দুই বেলা কোনোরকমে দুই মুঠি অন্নের সংস্থান—ইহার চাইতে খুব বেশি ভালো অবস্থা কি ছিল আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষের? রামপ্রসাদ সেন বলিয়াছিলেন—‘মন রে কৃষিকাজ জানো না।/ এমন মানব জনম রইল পতিত,/ আবাদ করলে ফলত সোনা।’ আমাদের মানব জনমও যেন অবহেলায় পড়িয়া ছিল, আবাদ করিলে যে সোনা ফলিতে পারে, তাহার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি তৈরি করিল আমাদের স্বাধীনতা। যদিও একাত্তরে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি লইয়া সেই সময় বিশ্বব্যাংক বলিয়াছিল—সবচাইতে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল। ১৯৭৬ সালে লন্ডন হইতে নরওয়ের অর্থনীতিবিদ জাস্ট ফাল্যান্ড এবং মার্কিন অর্থনীতিবিদ জে আর পার্কিনসন বলিয়াছিলেন—বাংলাদেশ হইতেছে উন্নয়নের একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। বাংলাদেশ যদি তাহার উন্নয়ন সমস্যার সমাধান করিতে পারে, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে পৃথিবীর যে কোনো দেশই উন্নতি করিতে পারিবে।

কী ভয়ংকর প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়া আমরা সম্মুখ সোপানে পা রাখিয়াছি, তাহা এই সকল গবেষণা প্রতিবেদন হইতে স্পষ্ট হইয়া গিয়াছিল। বরারবই বলা হইয়া থাকে, আয়তনের তুলনায় দেশের বিপুল জনসংখ্যা আমাদের বোঝা হইয়া উঠিবে। ইহার অবশ্য দুইটি দিক রহিয়াছে। ইহার একটি হইল কর্মক্ষম জনসংখ্যা। অন্য দিকটি হইল বাজার। ইহা ঠিক কেবল জনসংখ্যা থাকিলেই হয় না, উহাদের ন্যূনতম ক্রয়ক্ষমতাও থাকিতে হয়। এই ক্ষেত্রে আমাদের শিল্পোত্পাদন ও ভোক্তা-চক্রের গতিময়তাও গুরুত্বপূর্ণ। বিগত অর্ধশতকে আমাদের অর্থনৈতিক সামষ্টিক প্রবৃদ্ধি ৭৩ গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে, মাথাপিছু আয় বাড়িয়াছে ১৫ গুণ, শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়াছে, যদিও মান লইয়া প্রশ্ন আছে। তবে ইহাও সত্য যে, পরাধীনকালে কয়েক জনমাত্র বিদেশি লুণ্ঠনকারী থাকিলেও এখন শত শত স্বদেশি লুণ্ঠনকারী সৃষ্টি হইয়াছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাহাকে ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’ বলা হয়, তাহা স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরে ‘একধরনের পরাধীনতা’র বীজ রোপিত করিয়া থাকে। সেই বীজ হইতে অঙ্কুরিত বৃক্ষকে লালন করা হয় লুটেরা মানসিকতার সংকীর্ণতা হইতে। সার্বিকভাবে লুটেরাদের শায়েস্তা করিতে লাল ঘোড়া ছুটাইয়া অতীতে সামলানো যায় নাই। এই সকল লুটেরা ও দুর্নীতিবাজ এমন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করিয়া থাকেন যে, তাহারা মনে করেন—শুদ্ধিতার কড়া অ্যাসিডও তাহাদের গলাইতে পারিবে না। হঠাৎ কখনো-সখনো লুটেরা শ্রেণি বিপদে পড়েন বটে; কিন্তু বিপদ কাটিয়া গেলে তাহাদের অবস্থা হয় উপকথায় কথিত কাকের মতো। কাক যেমন গাব খাইতে খুব পছন্দ করে; কিন্তু গলায় আটকাইয়া গেলে জপ তোলে—‘আর গাব খাব না/ গাবতলা দিয়ে যাব না।’ কিন্তু গলা হইতে গাবের আঁটি নামিয়া যাইতেই কাক পুনরায় রব তোলে—‘গাব খাব না, খাব কী?/ গাবের তুল্য আছে কী?’ লুটেরাদের গলায় গাবের আঁটি স্থায়ীভাবে আটকাইয়া না থাকিলে, তৃতীয় বিশ্বের অবস্থা হইবে—মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

ইহা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক যে, আমাদের রাষ্ট্রীয় অপচয় ও দুর্নীতির লাগামও যতটা টানিয়া ধরা যাইত, ততখানি সম্ভব হয় নাই; কিন্তু আমাদের বৃহত্তর অর্জনের দিকে অগ্রসর হইতে হইলে এই সকল ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দিতে হইবে। না হইলে সাময়িক সময়ের ‘আমিরিগিরি’ অতি সত্বর ভিন্ন রূপ ধারণ করিতে সময় লাগিবে না। সেই যে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলিয়াছেন—‘সকাল বেলার আমির রে ভাই/ ফকির সন্ধ্যাবেলা’। এই কবিতাংশের মতো অবস্থা যেন আমাদের না হয়। ইহার জন্য লোভ সংবরণ করিতে হইবে। অন্যের পরিশ্রমলব্ধ অর্জনের প্রতি লোভ ঈর্ষা হিংসা রাখা যাইবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করিয়া বলিয়াছেন, ‘আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যাহা দিয়াছেন, সেই জন্য কি তাহারা তাহাদের ঈর্ষা করে?’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৪)। মনে রাখিতে হইবে হিংসা-বিদ্বেষ একটি ভয়ানক সংক্রামক ব্যাধি। সেই কারণে নবী করিম (সা.) সাবধানবাণী উচ্চারণ করিয়াছেন, ‘তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ হইতে নিবৃত্ত থাকিবে। কেননা, হিংসা মানুষের নেক আমল বা পুণ্যগুলি এমনভাবে খাইয়া ফেলে, যেইভাবে আগুন লাকড়িকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করিয়া দেয় (আবু দাউদ)।’

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন