পশ্চিমারা যখন রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ব্যাপারে কথা বলে, তখন তারা এটাকে নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য এই সংঘাত দীর্ঘায়িত করা একটা লক্ষ্য। গত সপ্তাহে রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে নতুন অঞ্চলগুলোর পুনর্মিলনের দিন হিসেবে পুতিন ৩০ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেছেন। ইউক্রেনের দোনেত্স্ক, লুহানস্ক, খেরসন এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চল রাশিয়ান ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করার এক বছর পূর্তি পালন করে রাশিয়া—যদিও এই অঞ্চলগুলো তখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার এই সংঘাতকে ইঙ্গিত করে পুতিন বলেন, ‘এই সংগ্রাম আমাদের মাতৃভূমি, সার্বভৌমত্ব, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ, ঐক্য এবং বিজয়ের সংগ্রাম।’ পুতিনের দৃষ্টিতে এটা শুধু রাশিয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ নয় বরং পশ্চিমের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ। এখানে ইউক্রেন একটা যুদ্ধক্ষেত্রের ভূমিকা পালন করছে মাত্র। ২০২৩ সালের বিজয় দিবসের প্যারেডে তিনি তার বক্তৃতায় কঠোরভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের মাতৃভূমির বিরুদ্ধে একটা সত্যিকারের যুদ্ধ শুরু হয়েছে।’
তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা উল্লেখ করে বলেন, রাশিয়ানরা তখন তাদের মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য যে দেশপ্রেম নিয়ে যুদ্ধ করেছিল, সেই দেশপ্রেম বুকে ধারণ করে লড়াই করার সময় আবার এসেছে। কারণ তখনকার মতো পশ্চিমা সম্প্রসারণবাদী অভিজাতরা এখনো রাশিয়াকে ধ্বংস করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই বিষয়টাকে ইউক্রেনে তার তথাকথিত বিশেষ সামরিক অভিযানের নামে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের ব্যর্থ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে পুতিন ইউক্রেনে একটা পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু স্পষ্টতই তার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পুতিনের তথাকথিত সামরিক অভিযান বর্তমানে একটা পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধের রূপ নিতে চলেছে। কিন্তু বাস্তবে পুতিনের অন্য পরিকল্পনা আছে বলে মনে হচ্ছে। এই বছরের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে যখন পুতিন এটাকে ‘আমাদের মাতৃভূমির ভাগ্য নির্ধারণের যুদ্ধ’ বলে ঘোষণা দেন, তখন তার বক্তব্য শুনে মনে হয়েছিল, তিনি এই কথাগুলো তার হূদয় থেকে বলছেন। কিন্তু তার বক্তব্যে তিনি রাশিয়ার সুস্পষ্ট ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিত দেননি, এমনকি রাশিয়া কী প্রত্যাশা করে সে ব্যাপারেও কিছু বলেননি। তিনি রাশিয়ানদের প্রতি শুধু একটা বার্তা দেন যে, রাশিয়া শুরু থেকেই পশ্চিমের সঙ্গে একটা অস্তিত্বের সংগ্রামে আবদ্ধ রয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এর কোনো সমাধান হবে বলে মনে হয় না। বিষয়টা একটা ভয়ংকর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, তবে পুতিনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটার স্পষ্ট তাত্পর্য রয়েছে। নিঃসন্দেহে বড় ধরনের যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য একটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। মার্কিন সরকারি সূত্র অনুযায়ী ইতিমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার রাশিয়ান সৈন্য নিহত এবং ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার সৈন্য আহত হয়েছে। পশ্চিমের সঙ্গে সমঝোতা করে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও রাশিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর সময় লাগবে। শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবীণ সৈনিকদের ওপর প্রভাব তো পড়বেই, তার সঙ্গে স্বল্প তহবিলযুক্ত পাবলিক পরিষেবাগুলোতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।
কিন্তু এটা একটা সুযোগও বটে। যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা যদি পুতিনের সাংগঠনিক নীতিতে পরিণত হয় তাহলে বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে এই যুদ্ধের প্রতি পুরো জাতির সমর্থন ধরে রাখা পুতিনের জন্য বেশ কঠিন একটা কাজ হবে। ইতিমধ্যে পুতিনের বিরুদ্ধে সামান্য ভিন্নমতও রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য হচ্ছে এবং প্রতিরক্ষা খাতে জাতীয় সম্পদের ব্যাপক স্থানান্তর অনিবার্য হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার সর্বশেষ বাজেটে পরের বছর সামরিক ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পরিবেশ সুরক্ষা ব্যয়ের প্রায় তিন গুণ। যুদ্ধক্ষেত্রে পুতিন রাশিয়ান সৈন্যের পরাজয় বরণ না করাকে রাশিয়ার জয় বলে দাবি করতে পারেন। ইউক্রেনের পালটা আক্রমণ দক্ষিণ জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে প্রথম রাশিয়ান প্রতিরক্ষা লাইন ভেঙে দিয়েছে এবং ইতিমধ্যে দ্বিতীয় লাইনের একটা অংশ দখল করে নিয়েছে। কিয়েভ আশা করছে যে, তারা যদি আক্রমণকারী বাহিনীকে পিছু হটাতে না পারে তবে তাদের এই পালটা আক্রমণ অন্ততপক্ষে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ক্রিমিয়ার সংযোগকারী রাস্তা এবং রেললাইনের ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ সংযোগগুলোকে পুনরায় দখল করতে সক্ষম হবে। শীতকাল ঘনিয়ে আসায় এটা পুরোপুরি সম্ভব হবে কি না, তা নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। যদি কিয়েভের লক্ষ্য পূরণ না হয়, তাহলে মস্কো কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে। একই সঙ্গে তারা নতুন পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবে কীভাবে প্রতিরক্ষা আরো শক্ত করা যায়, কীভাবে আরো বেশি সৈন্য সংগ্রহ করা যায় এবং এই যুদ্ধে ইউক্রেনের পালটা আক্রমণকে সীমিত রাখার জন্য পশ্চিমারা কী ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেখার জন্য অতিরিক্ত সময় পাবে।
আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না যে, পুতিন সত্যিকার অর্থে এই যুদ্ধে জয়লাভের আশা করছেন, নাকি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে শত্রুকে সম্পদশূন্য করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে যেটাই হোক, তার দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার একটা তাত্পর্য রয়েছে। সেটা হলো তিনি এই যুদ্ধ লম্বা করে ইউক্রেনের সহায়তাকারী পশ্চিমা দেশগুলোর ধৈর্য পরীক্ষা করছেন। কারণ রাশিয়ান সৈন্যদের দৃঢ়সংকল্পের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিত্র দ্বারা সরবরাহকৃত তুলনামূলক দুর্বল অস্ত্র-সরঞ্জাম নিয়ে যুদ্ধ করে ইউক্রেনের বিজয় ছিনিয়ে আনা সহজ কথা নয়। তবুও স্থায়ী শান্তি এবং দীর্ঘায়িত যুদ্ধের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। এমনকি যদি প্রতিটা রাশিয়ান সৈন্যকে ইউক্রেন থেকে বের করে দেওয়া সম্ভব হয়—তার পরও রাশিয়া তার বাহিনী পুনর্গঠন করে ইউক্রেনীয় শহরগুলোতে ড্রোন আক্রমণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র চালিয়ে পুনরায় ইউক্রেনে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে। এদিকে, ওয়াগনার প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোশিন এবং তার ভাড়াটে সেনাবাহিনীর দ্বারা জুলাইয়ের বিদ্রোহ পরিচালনা করার সময় অনেকে ভেবেছিলেন পুতিন তার চিরচেনা শাসনব্যবস্থা পরিচালনার দক্ষতা হারিয়েছেন কিনা। কিন্তু প্রিগোশিনের অকাল মৃত্যু সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে যে, পুতিনের বিরুদ্ধে গিয়ে রাশিয়াতে টিকে থাকা সহজ নয়। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ান প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর প্রভাব ফেলছে, কিন্তু তাদের বৃদ্ধি রোধ করতে পারেনি, আবার রাশিয়ার অর্থনীতিও ধ্বংস করতে পারেনি। রাশিয়ান সৈন্যের হতাহতের ঘটনা রাশিয়ানদের স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অংশগ্রহণের বাধা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। কোনো যুদ্ধ চিরকাল স্থায়ী হয় না, এই যুদ্ধও চিরস্থায়ী হবে না, কিন্তু এখানে নিকট ভবিষ্যতে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ।
লেখক: মার্ক গ্যালিওট্টি মায়াক ইন্টেলিজেন্সের নির্বাহী পরিচালক এবং লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের অধ্যাপক।
ভাষান্তর: আব্দুল্লাহ আল মামুন
