রেজাউল হক কৌশিক
ব্যাংক একদিকে আমানত সংগ্রহ করে অন্যদিকে গ্রাহককে ঋণ দেয়। কম সুদে আমানত নিতে তা তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ দেওয়ার ফলে ব্যাংকের আয় বাড়ে। এটাই ব্যাংকের মূল আয়। তবে এর পাশাপাশি ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের সেবা দেয়। সেসব সেবার বিনিময়ে চার্জ নেয়। সরকার ও ব্যাংকের মালিকদের সংগঠন বিএবির চাপে এখন সুদের হার কমে গিয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো সার্ভিস চার্জ থেকে বেশি আয় করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তবে এতে লোকসানে পড়ছেন গ্রাহকরা। সেবার নামে নানাভাবে সার্ভিস চার্জ কাটছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।
এখন ব্যাংকের সেবা পেতে গ্রাহককে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত টাকা গুণতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলো গতানুগতিক কিছু বিষয়ের সার্ভিস চার্জের তালিকা প্রকাশ করলেও অনেক চার্জের বিষয়ে কোনো ধরনের ঘোষণা থাকে না। এমনকি গ্রাহক কোনো সেবা নিতে ইচ্ছুক কি না সে বিষয়েও গ্রাহকের কোনো মতামত ছাড়াই সার্ভিস দেওয়া শুরু করে দেয়। আর সার্ভিস শুরু হওয়া মানেই হলো অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া। এভাবে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন ধরনের হিডেন (লুকায়িত) চার্জ কেটে নেওয়া হয়। এতে গ্রাহক অনেক ক্ষেত্রেই জানতে পারেন না তার অ্যাকাউন্ট থেকে কী পরিমাণ টাকা কাটা হচ্ছে।
গ্রাহক মাঝে মাঝে যখন হিসাবস্থিতি জানতে চান, তখন দেখতে পান অ্যাকাউন্টে যে পরিমাণ টাকা থাকার কথা, তা নেই। অনেক সময় দেখা যায়, আসল টাকাও অনেকটা কমে গেছে। এখানে অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ব্যাংক যে সুদ দিয়ে থাকে তারও কোনো হিসাব পাওয়া যায় না। তার মানে অ্যাকাউন্টে সুদ জমা হলেও সেটা কেটে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন চার্জের নামে।
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মতো এত বেশি সার্ভিস চার্জের খড়গ পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। এখানে বড় ঋণের ক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জ কিছুটা কম হলেও ছোট ঋণের ক্ষেত্রে দিতে হয় হরেক রকম চার্জ। ফলে বড় গ্রাহকের তুলনায় ছোট গ্রাহকের ভোগান্তিও বেশি।
কোন সার্ভিসের বিপরীতে চার্জ সর্বোচ্চ কত হবে সে বিষয়ে তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা আছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অতি চালাকির সঙ্গে গ্রাহকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ চার্জ কেটে নেয়। আবার অনেকসময় এ সীমার বাইরে যেয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা কাটা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো সেবা না নিয়েও গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। এসএমএস বা ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা না নিলেও গ্রাহকের টাকা কাটা হচ্ছে এমন অভিযোগ অহরহই শোনা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে (এফআইসিএসডি) এ ধরনের বহু অভিযোগও পড়েছে।
ব্যাংকভেদে একেক ব্যাংকে একেক ধরনের চার্জ দিতে হয়। তবে সব ব্যাংকেই যেসব চার্জ কাটে সেগুলো হলো, হিসাব পরিচালন ফি, এটিএমের ডেবিট কার্ড ফি, হিসাবের শুরুতে চেক বই নেওয়াসহ প্রতিবার নতুন চেকবইয়ের জন্য আলাদা চার্জ। বছরে দুই বার ব্যাংক স্টেটমেন্ট ফ্রি দেওয়ার কথা থাকলেও তা না দিয়ে প্রতিবার কাটা হয় স্টেটমেন্ট চার্জ। ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট নিতেও গুনতে হয় টাকা। ব্যাংকে আমানত রাখলে তার ওপরও চার্জ দিতে হয় গ্রাহককে। বর্তমানে সব ব্যাংকেই অনলাইন চার্জ দেওয়া লাগে। আর সব চার্জের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাটও দিতে হয় গ্রাহককে। এছাড়া বিও সনদ প্রদান ফি, সাইট এলসি কমিশন, রপ্তানি বিল নেগোসিয়েশন ও কালেকশন কমিশন, এলসি অ্যামেন্ডমেন্ট, কনফারমেশন ও ফরেন করেসপন্ডেন্ট চার্জের ক্ষেত্রে মেইলিং, কুরিয়ার, টেলেক্স, সুইফট সব ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত চার্জ আদায় করছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলো।
এসব চার্জ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি স্বচ্ছতা আনা দরকার। ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় এসব চার্জ নিয়ে যাতে আলোচনা করলে টাকা দিলেও গ্রাহকদের স্বস্তি থাকবে। আর পরবর্তীতে সার্ভিস চার্জের কোনো পরিবর্তন আসলেও যেন জানানো হয় সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে আরো সচেতন হতে হবে। সর্বোপরি শুধু ঘোষণা বা প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন দায়িত্ব শেষ না করে সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যথাযথ তদারকি না হলে এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। আর সেটা গ্রাহকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন্ন করবে। ফলে গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়বে বৈ, কমবে না।
