ফেসবুকের ডিজিটাল মুদ্রা

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৯, ২২:০৬

বদলে দিতে পারে আর্থিক লেনদেনের বিশ্বব্যবস্থা

এম এ মাসুম

 

ব্যবসায় মুনাফায় মন্দা, তথ্যভান্ডারে সুরক্ষার অভাব, আবার জরিমানাও গুনতে হচ্ছে— এ অবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে আর্থিক বাজারে নামতে চাইছে ফেসবুক। ফেসবুক জানিয়েছে আগামী বছরই নিয়ে আসছে তারা তাদের মুদ্রা ‘লিব্রা। এর মধ্য দিয়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ছাড়িয়ে ই-কমার্স ও বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেন বাণিজ্যে পা রাখতে যাচ্ছে ফেসবুক। ফেসবুকের ক্রিপ্টোকারেন্সি আনার কথা কয়েক মাস ধরেই শোনা যাচ্ছিল। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে বিষয়টি খোলাসা করলেন ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে ফেলেছে পুরনো ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন। বিনিময় হারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন এবং হ্যাকিংয়ের শিকার হয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার হারিয়েছেন বিটকয়েনের ব্যবহারকারীরা। এ কারণে জাকারবার্গের লিবরা প্রজেক্টে ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।

লিবরার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে আগামী বছরের মাঝামাঝিতে। এ ভার্চুয়াল মুদ্রার বিনিময়, পরিচালন ও সর্বোপরী নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে ফেসবুক। লিবরা ডট অরগ ওয়েবসাইটে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। শ্বেতপত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রচলিত ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে লিবরার বেশকিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যদিও অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো লিবরার জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং এটি হবে ওপেনসোর্স।

লিব্রা বিশ্বের আর্থিক লেনদেনের ‘পাশা পাল্টে দেবে’ বলেই মনে করছে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান। জানা যায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্রিপ্টোকারেন্সি ছাড়ার জন্য ইতিমধ্যেই আঁটঘাট বেঁধে নেমে পড়েছে মার্ক জাকারবার্গ।

লিব্রা পরিচালনার জন্য ২৭টি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে লিব্রা অ্যাসোসিয়েশন। লিব্রার দাম যাতে অস্বাভাবিকভাবে ওঠা-নামা না করে তা নিশ্চিত করতেই কাজ করবে তারা।

এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে ফান্ড বরাদ্দ দেওয়ার কাজ করবে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি। লিব্রা অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য কোম্পানিগুলো হলো— পেপ্যাল, ইবে, স্পটিফাই, উবার, লিফট, ভিসা ও মাস্টারকার্ড। এ ডিজিটাল মুদ্রা দিয়ে ফেসবুকের কোটি কোটি ব্যবহারকারী অনলাইনে অর্থ লেনদেন করতে পারবে। ফেসবুকের ভাষায় লিব্রা হলো বৈশ্বিক মুদ্রা ও আর্থিক অবকাঠামো। সহজভাবে বললে, এটা ফেসবুকের তৈরি ডিজিটাল সম্পদ ও তাদের নিজস্ব ব্লকচেইন সংস্করণ। ব্লকচেইন হলো এনক্রিপ্টেড প্রযুক্তি যা বিটকয়েনও ব্যবহার করে। নানাভাবেই লিব্রা নামটি গুরুত্বপূর্ণ ফেসবুকের কাছে। রোমান যুগে মাপদণ্ডকে ‘লিব্রা’ বলা হতো; যারা রাশিচক্র মানেন তারা লিব্রা নিয়ে তো জানেনই। আর ফরাসি ভাষায় লিব্রা অর্থ স্বাধীনতা।

ফেসবুকের লিব্রা প্রকল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পেপ্যালের সাবেক কর্মকর্তা ডেভিড মারকাস। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা, ন্যায় এবং অর্থ, ঠিক এটাই আমরা এখানে এক করার চেষ্টা করছি।’ বিশেষজ্ঞদের বরাতে গার্ডিয়ানের ভাষ্য, ফেসবুকের আর্থিক পড়তির এ সময়ে লিব্রা লাভের মুখ দেখাতে পারে প্রতিষ্ঠানটিকে। নিজেদের সৃষ্টি এ মুদ্রা নিয়ে ফেসবুকের দাবি, কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়াই লিব্রা লেনদেনে লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই তারা এ ব্যাংকিং জগতে প্রবেশ করে টাকা পাঠাতে পারবে।

জানা যায়, সংস্থার তরফে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেও আমেরিকা এবং ইংল্যান্ড ইতিমধ্যেই বাদ সেধেছে। ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে একগুচ্ছ প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছেন জাকারবার্গের কাছে। কিন্তু সে সব কাটিয়ে সত্যি সত্যি লিব্রা বাজারে এলে সারা বিশ্বের ব্যাঙ্কিং এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিতই নাড়িয়ে দিতে পারে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি আসলে ডিজিটাল মুদ্রা, যার বাস্তব কোনও অস্তিত্ব নেই। তবে টাকার মতোই লেনদেন করা যায়। যেমন কোনও জিনিস কিনে বিক্রেতা যদি নিতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে টাকা মেটানো যায়। পেটিএম, ফোন পে, গুগল পে-র মতো অ্যাপ বেসড মানি ট্রান্সফার সিস্টেম, যার সঙ্গে ব্যাংক অ্যাকাউন্টকে সংযোগ করতে হয়। তার পর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা ট্রান্সফার করে ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনে ওয়ালেটে রাখতে হয়। সেটা যেমন লেনদেন করা যেতে পারে, তেমনই শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিনিয়োগও করা যেতে পারে। অর্থাত্ যে দামে কিনবেন, দাম বাড়লে তা বিক্রিও করে দিতে পারেন। এই ক্রিপ্টোকারেন্সি কাজ করে ব্লকচেন প্রযুক্তিতে, যা তুলনামূলক সুরক্ষিত ও নিরাপদ।