অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:৩০

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত ও বিতর্কিত। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর স্বৈরশাসকরা নির্বাচনের নামে একটির পর একটি প্রহসনের জন্ম দেয়। সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি মানুষের আস্থা আছে কি না—তা যাচাই করার জন্য ১৯৭৭ সালের ৩০ মে হ্যাঁ বা না ভোটের আয়োজন করে। ভোটারের উপস্থিতি দেখানো হয় ৮৮.১ শতাংশ, জিয়াউর রহমানের পক্ষে ভোট দেখানো হয় ৯৮.৯ শতাংশ এবং না ভোট দেখানো হয় ২.১ শতাংশ।

সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংসের সূত্রপাত হয়। জেনারেল এরশাদ জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করে একইভাবে ক্ষমতা থাকার চেষ্টা করে। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে পূর্বনির্ধারিত নির্বাচনি ফলাফলের ওপর জনগণের অবিশ্বাস চরমে পৌঁছায়। ফলে স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সব বিরোধী রাজনীতি দল একযোগে একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন শুরু করে।

১৯৯০ সালে তিন বিরোধী রাজনৈতিক জোটের যৌথ ঘোষণায় নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করা হয়। আপামর গণমানুষের বিক্ষোভ ও গণআন্দোলনের মুখে জেনারেল এরশাদ ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সম্মিলিত বিরোধী দলগুলোর মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে দেশের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুরু হয়। তিন বিরোধী রাজনৈতিক জোটের যৌথ ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়, আগামী তিনটি নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসন পেতে ব্যর্থ হয়। বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল ভিত্তি ছিল সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন। কাজেই এর বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। বিএনপি সরকার গঠন করার কিছু দিন পর থেকেই বিরোধী দলগুলো সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধান সংবিধানে সংযোজনের জন্য চাপ দিতে থাকে। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি অসাংবিধানিক বলে অগ্রাহ্য করতে থাকে। খালেদা জিয়া বলেন, একমাত্র পাগল ও শিশু ছাড়া কোনো মানুষ নিরপেক্ষ নয়।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভুলে গেল, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিরোধী দলের রূপরেখার কথা। আবারও শুরু হলো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। বিশেষ করে ১৯৯৪ সালে ২০ মার্চ মাগুরা উপনির্বাচনে কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ উঠল। মাগুরা নির্বাচনের পর বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের দাবি আরো জোরালো হতে থাকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আপসহীন আন্দোলনের মধ্যে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে না নিয়ে সব বিরোধী দল নির্বাচন বয়কট করার পরও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচন করে। গণআন্দোলনের মুখে ষষ্ঠ সংসদের ১৯৯৬ সালের ১৯ মার্চ সংবিধানের ১৩তম সংশোধনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করে খালেদা জিয়া সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান করা হয়। সাংবিধান অনুযায়ী, বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে উদাহরণ সৃষ্টি করলেন। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্দলীয় সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন। ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করতে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতার সময় নির্বাচন নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলতে পারেনি। তারপরও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সংবিধান মেনে শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে শেখ হাসিনা একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি নির্দিষ্ট সময়ে শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনের আয়োজন করে। এই নির্বাচনে চারদলীয় জোট জয় লাভ করে। বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চারটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনটি ছিল সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল বাংলাদেশের জন্য এক অন্ধকার সময়। নির্বাচনের পর পরই শুরু হয় দেশ জুড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, নির্যাতন। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এ এস কিবরিয়া, সাবেক সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার, নাটোরের জনপ্রিয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সামসুল ইসলাম, জনপ্রিয় সাংবাদিক মানিক সাহা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ গোপালকৃষ্ণ মুহুরীসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, শিক্ষক নির্মম হত্যার শিকার হন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধুর কন্যা আওয়ামী লীগের সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। অল্পের জন্য রক্ষা পায় আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।

ঐ সময় দুর্নীতি ভয়াবহ রূপধারণ করে। পরপর পাঁচ বার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বে বাংলাদেশ রেকর্ড সৃষ্টি করে। নির্বাচনকে সামনে রেখে শুরু হয় নীলনকশা। বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক বিচারপতি কে এম হাসান অবসরে যাওয়ার পরের দিন বিচারপতিদের চাকরির বয়স দুই বছর বাড়ানো হয়েছিল, যাতে করে কে এম হাসান সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি থাকতে পারেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হতে পারেন। ২০০৬ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে পিছু হটেন কে এম হাসান, কিন্তু ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। সংবিধানে অনেক সুযোগ থাকার পরও বিএনপি কোনো নির্দলীয়, নিরপেক্ষ লোক খুঁজে পেল না। তাদের দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান করা হলো। পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করে দেওয়া হলো নিরপেক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিকে। ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ একাধারে রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ায় সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়। বিরোধী দলের আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রথম দিকে আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ৬৮ জন নেতাকর্মী নিহত হয়। এমতাবস্থায় মহাজোট সরকার নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ৮ জানুয়ারি থেকে বঙ্গভবন অবরোধ শুরু হয়, ১০ জানুয়ারি সারা দেশ থেকে বঙ্গভবন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সরকারবিরোধী আন্দোলন বিক্ষোভ অচল হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ১১ জানুয়ারি তত্কালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন। গঠন করা হয় আরো একটি সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন- মঈন উদ্দিনের নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ জরুরি অবস্থা জারির পর থেকে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।

তিনিই এক অনুষ্ঠানে ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা জারির দিনটিকে ওয়ান-ইলেভেন বা এক-এগারো নামে আখ্যায়িত করেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ অনেকেই এ সরকারের সময় গ্রেফতার হন। প্রায় দুই বছর অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।

২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক হিসেবে রায় দেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে নবম জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। রাজনীতিতে মিথ্যাকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দুই বার নির্বাচনে জয়ী হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় বিশ্বাস রাখেনি। ক্ষমতায় থেকে কখনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে চায়নি, কিন্তু জনগণের আন্দোলনের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছে।

বিএনপি প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার আন্দোলন করেও সফলতার মুখ দেখেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আন্দোলনের নামে আবার নতুন করে অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির একটি আবহ তৈরি হয়েছে।

লেখক: সভাপতি, জার্মান আওয়ামী লীগ

ইত্তেফাক/এমএএম