সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

স্মৃতির শব্দবন্ধে আসাদ চৌধুরী

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:৪১

প্রয়াত হলেন ষাটের দশকের কবি আসাদ চৌধুরী। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার জগতে যেন নক্ষত্রের পতন হলো।

বিশ শতকের ষাটের দশকের এই কবিকে নিয়ে আলোচনা করেছেন অনেক। তার স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে অন্য আলোতে প্রকাশিত ‌‘আসাদ চৌধুরী: স্মৃতিসূত্রের কবি’ প্রবন্ধে পিয়াস মজিদ লিখেছেন, ‘...যার প্রেমও গ্রহণলাগা, ব্যক্তিবিরহও সামষ্টিক ব্যর্থতার রঙে রঞ্জিত। এর মাঝে স্মৃতি হয়তো বিশেষ করে আলোচ্য কোনো বিষয় হতে পারে না তবু সরল এক প্রস্তাবনারূপে যদি তাকে ইতিউতি পাঠের স্মৃতি থেকেই তার স্মৃতিসূত্র শনাক্তের প্রয়াস পাই, তবে হয়তো সামগ্রিকভাবে আমাদের কবিতার এক গতিমুখেরও সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।’

আসাদ চৌধুরীর বইয়ের সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তবক দেওয়া পান’ প্রণিধানযোগ্য। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে লোকজ নির্যাস দিয়ে কবি এই কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। ১৯৭৫ সালে যখন কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ হলো, তখনই আঁচ করা গিয়েছিল বাংলা সাহিত্যে শক্তিমান কবির উদয় হয়েছে।

এ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে পিয়াস মজিদ লিখেছেন, আমরা বলি, এও তার স্মৃতিচর্যারই প্রকাশ। সময়ের সঙ্গে অঙ্গীভূত যে লোকাচার-লোকাভ্যাস লুপ্তপ্রায়, তাকে স্মৃতিতে জায়মান রাখেন কবি তবক দেওয়া পানের রূপকে। একদিন হয়তো পানের বরজ সব উঠে যাবে এ দেশ থেকে, একদিন এই তুমুল ফরমালিন-বাস্তবে প্রাণের ‘পান’ হয়তো নেবে বিষের আকার, তখন আসাদ চৌধুরীর কবিতা সূত্রে পান থাকবে আমাদের স্মৃতির গহনে। আর তার কবিতা মনে করিয়ে দেবে অলস দুপুরের বাংলা, একটু আয়েশি ভঙ্গি আর গুরুভার মজলিশে হালকা রসের ফোয়ারা।’

আসাদ চৌধুরী ছিলেন স্পষ্টবাদী কবি। ‘সত্যফেরারী’ কবিতায় শক্তিমান এই কবি লিখেছেন-
‘কোথায় পালালো সত্য?
দুধের বোতলে, ভাতের হাঁড়িতে! নেই তো
রেষ্টুরেন্টে, হোটেলে, সেলুনে,
গ্রন্থাগারের গভীর গন্ধে,
টেলিভিশনে বা সিনেমা, বেতারে,
নৌকার খোলে, সাপের ঝাঁপিতে নেই তো।

গুড়ের কলসি, বিষের কৌটো,
চিনির বয়াম, বাজারের ব্যাগ,
সিগারেট কেস, পানের ডিব্বা,
জর্দার শিশি, লক্ষ্মীর সরা,
নকশী পাতিল, চৌকির তলা,
সবি খুঁজলাম, খুঁজে দেখলাম নেই তো!

সাংবাদিকের কাঠের ডেস্কে,
কাগজে, কেতাবে, পুঁথিতে, কলমে,
ইনজেকশনে, দাঁদের মলমে,
ভ্যানিটি ব্যাগে বা পকেটে, আঁচলে
ড্রয়ারে, ব্যাংকে, আয়রণ সেফে
সত্য নামক মহান বস্তু নেই তো!

কবিতায় নেই, সঙ্গীতে নেই
রমণীর চারু ভঙ্গিতে নেই
পাগলের গাঢ় প্রলাপেও নেই
নাটকের কোন সংলাপে নেই
শাসনেও নেই, ভাষণে নেই
আঁধারেও নেই, আলোতেও নেই
রেখাতেও নেই, লেখাতেও নেই,
উত্তরে নেই, প্রশ্নেও নেই
লেবাসে নেই, সিলেবাসে নেই
পারমিটে নেই, বোনাসেও নেই
হতাশায় নেই, আশাতেও নেই
প্রেম-প্রীতি ভালবাসাতেও নেই
এমন কি কালোবাজারেও নেই
কোথায় গেলেন সত্য?’

নিজের ‘কবিতার জন্মরহস্য’ নিয়ে তিনি এভাবে লিখেছেন- ‘বাবরি মসজিদ ধ্বংস হলো ২০০১ সালে। এরপর ভারতে মারাত্মক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূচনা। তারই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অবনতি ঘটে। মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা ভাঙচুর ও ধ্বংস করা হয়। সে সময় আমার কবিসত্তা দারুণভাবে নাড়া দেয়। ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের পর এমন দামামা। আমাকে চরমভাবে ব্যথিত ও আন্দোলিত করে। ভাষা-সংস্কৃতি এক অথচ ধর্মকেন্দ্রিক এই দাঙ্গা। বিশেষত চট্টগ্রামে মারাত্মক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। তারই প্রতিফলন আমার এই ব্যথাভরা নতুন কবিতাটি’ (সালিম সুবেরী, কারুজ কবিতাকৃতির মধ্যমাঠে: কবি আসাদ চৌধুরী, নয়াদিগন্ত)।

বরেণ্য এই কবির জন্ম ১৯৪৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। কবিতার পাশাপাশি টেলিভিশনে উপস্থাপনা ও মনোগ্রাহী আবৃত্তির জন্যও সমানুপাতিক পরিচিত তিনি। বাবা মোহাম্মদ আরিফ চৌধুরী ও মা সৈয়দা মাহমুদা বেগম। আসাদ চৌধুরীর স্ত্রীর নাম সাহানা বেগম।

কবির বাবা মোহাম্মদ আরিফ চৌধুরী ব্রিটিশ আমলে ছিলেন এমএলএ। পরিচিত ছিলেন ধনু মিয়া নামে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, ‘চৌধুরী সাহেবের ব্যবহার ছিল অমায়িক। খেলাফত আন্দোলন থেকে রাজনীতি করছেন। দেশের রাজনীতি করতে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বরিশালের উলানিয়ার জমিদারি বংশে।’ কবির জন্মদিনে ‘তবক দেওয়া পান’ শিরোনামে সমকালে প্রকাশিত কবিরই প্রথম কাব্যগ্রন্থের পর্যালোচনায় মিজান শাহজাহান আসাদ চৌধুরীর পারিবারিক জীবন তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘তার সংসার এখন আর রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উলানিয়ার মানুষের কাছে একজন অভিভাবক। অনেকের কাছে ডাকনাম খসরু ভাই বা খসরু চাচা হিসেবেও তিনি পরিচিত’ (মিজান শাহজাহান, ‘তবক দেওয়া পান’, সমকাল)।

বরেণ্য এই কবি উলানিয়া হাই স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যয়ন করেন তিনি। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই বাংলা ১৯৬৩ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

আসাদ চৌধুরীর কবি জীবনের বর্ণনা দিয়ে পিয়াস মজিদ লেখেন, কবি জীবনের প্রারম্ভিক পর্বে আসাদ চৌধুরী গত শতকে পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে স্মরণ করেছিলেন প্যাট্রিস লুমুম্বাকে, যা বাঙালি তরুণ কবির গভীর আন্তর্জাতিকতাবোধের স্মারক। দূরদেশের বিপ্লবীর পাশাপাশি এই বাংলাদেশের কুমিল্লার বরুড়া অঞ্চলের কৃষক নেতা কমরেড মুহাম্মদ ইয়াকুবও তার পরবর্তী কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে অনায়াসে। একই সঙ্গে ‘স্মরণের মীঢ়ে ধীরেন’ কবিতাটি স্মরণের সরণিতে নিয়ে আসে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রথম প্রস্তাবক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে।’

‘দিন যায়,
 দিন যেতে থাকে।
 তাঁর জন্যে যত শ্রদ্ধা নিজেদের প্রতি ততখানি ঘৃণা,
 কারাগার তাঁকে চেনে,
 ঘাতক বুলেট তাঁকে চেনে
 শুধু অকৃতজ্ঞ আমরা চিনি না।’

রাজনৈতিক কবিতা লেখেননি আসাদ চৌধুরী। তিনি মনে করতেন, স্লোগানে কবিতার প্রয়োজন নেই। বরং কবিতাকেই সময় তার প্রয়োজনে স্লোগান করে নেয়।

আসাদ চৌধুরীর লেখা ক্ষুরধার। তার কবিতা পড়ে কখনও মনে হয়েছে ‘নির্জীব দুষ্কালের বিরুদ্ধে কাম্য সশস্ত্রতা’, আবার কখনও মনে হয়েছে বিষণ্ন অনুভূতি যেন ঘিরে ধরেছে তাকে।
তেমনই তিনি বলেছেন তার কবিতায়-
‘অভিধান থেকে নয়
আশি লক্ষ শরণার্থীর কাছে জেনে নাও, নির্বাসনের অর্থ কী?
জর্জ ওয়াশিংটনের ছবিঅলা ডাকটিকেটে খোঁজ থাকবে না
স্বাধীনতার...’

প্রকৃতপক্ষে আসাদ চৌধুরীর কবিতায় বিশ্বযুদ্ধ, রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা, কোরআন, পুরাণ, বাইবেল, প্রাচীন লোকসাহিত্য এবং ইতিহাসের বিভিন্ন প্লট উঠে এসেছে। কবি আসাদ চৌধুরী লিখেছেন বাংলার মাটি ও মানুষের কথা। আবহমান ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও আপন করে নিয়েছেন স্বমহিমায়। তেমনই ‘ইলা মিত্র এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের প্রতি’ কবিতায় তিনি বলেছেন-
‘স্বপ্ন ছিল
এখন স্মৃতির ভার,
ব্যর্থতার ভার
কোনখানে পেতে রাখি
রাত্রির প্রণাম!’

সেই কবি আর নেই। শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় স্মরণ করি কবিকে।

তথ্যসূত্র:
১. পিয়াস মজিদ, ‘আসাদ চৌধুরী: স্মৃতিসূত্রের কবি’, অন্য আলো, প্রথম আলো (১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১);
২. সালিম সুবেরী, ‘কারুজ কবিতাকৃতির মধ্যমাঠে: কবি আসাদ চৌধুরী’, নয়াদিগন্ত (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩);
৩. মিজান শাহজাহান, ‘তবক দেওয়া পান’, সমকাল (১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২);
৪. তারেকুল ফাহিম, ‘কবি আসাদ চৌধুরী: জীবন ও সাহিত্যকর্ম’, আরটিভি অনলাইন (৫ অক্টোবর ২০২৩);
৫. আমীরুল ইসলাম, ‘চিরযুবক আসাদ চৌধুরী’, আলোকিত বাংলাদেশ (১৪ মে ২০২২);
৬, কবি আসাদ চৌধুরীর জন্মদিনে নির্বাচিত সাক্ষাৎকার নিয়ে এলো ঐতিহ্য, এনটিভি অনলাইন (ফিচার) (১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩);
৭. ‘দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে, সমাজ ও সাহিত্যের উন্নতি দরকার: কবি আসাদ চৌধুরী’, আজকের পত্রিকা (১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)
৮. ড. ফজলুল হক সৈকত, ‘আসাদ চৌধুরী চোখের দোষে কাতর এক কবি’, যায়যায়দিন, (১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)
৯. সম্পাদক: রাকিবুজ্জামান লিয়াদ, ‘আসাদ চৌধুরী কহেন নির্বাচিত সাক্ষাৎকার’ গ্রন্থ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩;
১০. কবির বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ ও কবিতা।

ইত্তেফাক/এইচএ