পৃথিবী রক্ষার মহাদায়িত্ব সকলেরই

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৩:৩০

কয়েক বত্সর পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা জীবাশ্ম ও ভূপ্রকৃতি গবেষণার মাধ্যমে জানাইয়াছিলেন যে, এখন যেমন রেড পান্ডা বিলুপ্তির পথে রহিয়াছে, ৭০ হাজার বত্সর পূর্বে মানব প্রজাতিও একইভাবে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে চলিয়া গিয়াছিল। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, কিন্তু কী হইত যদি পৃথিবীতে মানুষ না থাকিত? অনেকে বলেন, মানুষ না থাকিলে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ প্রজাতি রক্ষা পাইত। প্রকৃতির উপর প্রভাব বিস্তার করিবার মাত্র কয়েক হাজার বত্সর পূর্বে লন্ডনের নিকটবর্তী বনাঞ্চলে একটি প্রজাপতির যতটুকু ভূমিকা ছিল, মানুষের ভূমিকা বা সামর্থ্য তাহার চাইতে বেশি ছিল না। কিন্তু মানুষ ক্রমশ যাহা করিয়াছে, তাহাকে বলা যায় এই পৃথিবীকে এককভাবে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ওলটপালট করা। এই প্রকৃতিতে লক্ষ লক্ষ প্রজাতি বসবাস করে, মানুষ তাহার মধ্যে একটিমাত্র প্রজাতি। কিন্তু গত কয়েক শত বত্সর ধরিয়া, বিশেষ করিয়া শিল্পবিপ্লবের পর হইতে মানুষ সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়নের নামে প্রকৃতি উজাড় করিয়া এমন সকল পরিস্থিতির সৃষ্টি করিয়াছে—যাহার ক্ষত মেরামত করিতে প্রকৃতি পালটাইয়া যাইতেছে। বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, শিল্পযুগের শুরু হইতে মানবসৃষ্ট কারণে উত্পাদিত অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশ শোষণ করিয়া আসিতেছিল বিশ্বের মহাসাগরগুলি। তবে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাইবার ফলে মহাসাগরগুলির কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণের সক্ষমতা কমিয়া যাইতেছে। এই ব্যাপারে জলবায়ুবিজ্ঞানীদের কেহ কেহ বলিতেছেন—বিশ্বের জলবায়ু মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে।

গত কয়েক দিন ধরিয়া সারা দেশে অঝোর ধারায় বৃষ্টিপাত হইতেছে। বর্ষার বিদায়কালের দিকে বৃষ্টিপাত হইবে, তাহাতে আশ্চর্যের কিছু নাই। কিন্তু এখন যাহা হইতেছে, অল্প সময়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাত। সিকিমে প্রবল বৃষ্টিতে হকড়াবানে কয়েক দিন পূর্বে ভয়াবহ বন্যা হইয়াছে। মাত্র সপ্তাহখানেক পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের প্রায় ৮৫ লক্ষ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। নিউ ইয়র্ক সিটি, লং আইল্যান্ড ও হাডসন ভ্যালি পানিতে তলাইয়া গিয়াছিল। ডুবিয়া গিয়াছিল সাবওয়েগুলি। সেইখানে এমন বৃষ্টিপাত হইয়াছে যাহা ১৪০ বত্সরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গ্রিসে যেমন ঘূর্ণিঝড় ড্যানিয়েলের তাণ্ডব চালাইয়াছে, প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা হইয়াছে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে, তেমনি লিবিয়াতেও হইয়াছে ভয়াবহ বন্যা। বন্যায় বিপর্যস্ত হইয়া লিবিয়ায় কয়েক হাজার মানুষ নিহত হইয়াছে। বিপর্যয়কর বন্যা বা বৃষ্টিপাত ছাড়াও ইতিমধ্যে উষ্ণতম বত্সর হইবার ইঙ্গিত দিয়াছে সদ্যসমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাস। বলা যায়, উষ্ণতম দিনের রেকর্ড এই বিশ্ব প্রতি বত্সরই ভাঙিতেছে। স্পষ্টতই, ১ লক্ষ ২০ হাজার বত্সরের পুরাতন তাপমাত্রার রেকর্ড দিনের পর দিন ভাঙিয়া দিতেছি আমরা। ইহা যেন এক নূতন পৃথিবী! কী এক বিপর্যয়কর যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া রহিয়াছি আমরা! বৈশ্বিক তাপমাত্রা এখন প্রতি বত্সরই অল্প অল্প করিয়া বাড়িবে। ইহাই চরম বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রাও আরো তীব্র হইবে। তাহার ফলে পরিবর্তন ঘটিতে পারে সমুদ্রস্রোতের। ফলে মৌসুমি বায়ুতেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাহার ফলে কোনো কোনো এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হইতে পারে, অন্যদিকে কোথাও দেখা দিতে পারে ব্যাপক খরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাইলে মানুষ অনেক বেশি শহরমুখী হইতে পারে। ফলে ভবিষ্যত্ পৃথিবীর সামগ্রিক চিত্র যথেষ্ট আতঙ্কের। এই সকল বিষয় মাথায় রাখিয়া দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনা করা জরুরি।

এই জন্য বর্তমানে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলা করিবার বিষয়টিকে এই ধরিত্রীর বুকে মানুষের বাঁচা-মরার সহিত তুলনা করা হইতেছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব মোকাবিলায় আগামী নভেম্বরে জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের ভূমিকা রাখিবার সুযোগ রহিয়াছে। নিজ নিজ ক্ষেত্র হইতে পৃথিবীকে রক্ষার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে জরুরি এবং প্রশংসনীয়। আমাদের তো একটাই পৃথিবী। পৃথিবী রক্ষার মহাদায়িত্ব সকলেরই। নিজ নিজ পরিসর হইতে সেই চেষ্টা প্রতিটি রাষ্ট্রকে করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি