পামগাছের বাগান গড়ে তোলা জরুরি

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:০০

মার্কিন চিকিত্সক স্টেফান রিপিচ তার ‘ডায়বেটিক নিরাময় খাদ্য’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো ভোজ্য তেল। একজন মানুষের খাবারের ৩০% পুষ্টি ক্যালোরি ভোজ্য তেল  থেকে আসা প্রয়োজন। তেল হরমোন উত্পাদন, স্বাস্থ্যবান হাড় গঠন, সুষ্ঠু ত্বক এবং শারীরিক দৈনন্দিন কর্মের জন্য আবশ্যক। ভোজ্য তেল শরীরে পুষ্টি গ্রহণে সহায়তা করে এবং শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে রক্ষা করে। এটা নেপটিনকে উত্তেজিত করে যা শরীরকে ‘যথেষ্ট খাওয়া হয়েছে’ সিগন্যাল প্রেরণ করে অতিভোজ থেকে রক্ষা করে। মানুষের শরীরে অতিরিক্ত শ্বেতসার খাবার চর্বি উত্পাদন করে। খাবারের চর্বি মানুষের শরীরে চর্বি উত্পাদনের জন্য মূলত দায়ী নয়। তেল ভালো-মন্দ রয়েছে। সেচুরেটেড তেল খুবই স্থিতিশীল, সহজে অক্সিডাইজ হয় না এবং রেনসাইড হয় না। পাম তেল, নারকেল তেল, বাদাম তেল, তিল তেল সেচুরেটেড তেলের দৃষ্টান্ত। এসব ভোজ্য তেল শরীর গঠনের পুষ্টি, হরমোন, বল, সেলের পর্দার স্থিতিস্থাপকতা দিয়ে থাকে। মানুষের শরীরের প্রয়োজনীয় ফ্রিফেটি অ্যাসিড যা শরীর উত্পাদন করতে পারে না। সেচুরেটেড ভোজ্য তেল হজমে সাহায্য করে।

২০২২-২৩ অর্থবছর বাংলাদেশ ২৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানি করেছে। এ অপরিশোধিত ভোজ্য তেলের মধ্যে ২০ লাখ মেট্রিক টন ছিল পাম তেল এবং ৫ লাখ মেট্রিক টন ছিল সয়াবিন তেল। এই অপরিশোধিত তেল দেশে পরিশোধন করে বিপণন করা হয়েছে। অধিকন্তু বাংলাদেশ বছরে ৩ লাখ মেট্রিক টন রাই, সরিষা ও কেনোলা বীজ আমদানি করে যা থেকে তেল নিঃসরণ করা হয়। তবে দেশে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন রাই ও সরিষা উত্পাদন হয়ে থাকে। কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ নিজের প্রয়োজন মেটানোর মতো ভোজ্য তেল উত্পাদন করতে সক্ষম। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে ভারসাম্য রক্ষায় যেসব ক্ষেত্রে সম্ভব বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হ্রাস করা প্রয়োজন।

পাম তেল হলো পৃথিবীতে স্বল্প মূল্যের ভোজ্য তেল। আমরা অনেকেই জানি না যে, মানুষের শরীরের জন্য এ তেল খুবই সহনীয়। পৃথিবীর যে কোনো ভোজ্য তেল অপেক্ষা পাম তেল হেক্টরপ্রতি উত্পাদন অনেক অনেক বেশি। হেক্টরপ্রতি পৃথিবীতে গড় পাম তেল উত্পাদন হয় ৩.৭৪ মেট্রিক টন। হেক্টরপ্রতি সয়াবিনের উত্পাদন মাত্র ০.৫ মেট্রিক টন। বর্তমানে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া সবচেয়ে বেশি পাম তেল উত্পাদন করে এবং সমস্ত পৃথিবীতে রফতানি করে থাকে। ভারত তার নিজস্ব ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণের জন্য পাম তেল উত্পাদনের জন্য পাম বাগান গড়ে তোলার এক বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে যখন উষ্ণতা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসে সেটা পামগাছের পাম ফল উত্পাদনের জন্য ভালো সময় নয়। তবে জল সেচের মাধ্যমে এ অসুবিধা কাটিয়ে ওঠা সহজ। বছরের অবশিষ্ট দশ মাস পাম ফলের জন্য খুবই উপযোগী। মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় সাধারণত একটি পাম ফলে কাদির ওজন হয় ২০ থেকে ৩০ কেজি, কিন্তু বাংলাদেশের ঘাটাইলে একটি কাদির ওজন ৫০ থেকে ৬৩ কেজি হতে দেখা গিয়েছে।

দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় পরিকল্পিতভাবে পামগাছের বাগান গড়ে তোলা জরুরি। এসব বাগান বাড়তি সুবিধা হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস করতে সহায়ক হবে। দীর্ঘ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শত শত শ্রমিক মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পাম বাগানে কাজ করছে। পাম বাগান গড়ে তোলায় তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশে ব্যাপকভিত্তিতে পাম বাগান গড়ে তুলতে তাদের কাজে লাগানো যায়। পামগাছের ফল থেকে তেল নিষ্কাশন করে কয়েক বছর বাংলাদেশ নিজের জন্য ভোজ্য তেল উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। পাম বাগান গড়া ও পরিচর্যা যেহেতু শ্রমঘন কাজ তাই এক্ষেত্রে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি