নদী বাঁচাতে হবে

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৯, ২২:২০

সাধন সরকার

 

বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে তখনো আমাদের জানা নেই যে, আমাদের দেশে আসলে নদীর সংখ্যা কত?  এ ব্যাপারে সরকারি বিভিন্ন বই ও প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন রকম তথ্য পাওয়া যায়। এসব ভিন্ন ভিন্ন তথ্য মূলত নদী রক্ষার ব্যাপারে আন্তরিকতার অভাবকেই তুলে ধরে! কোনো কোনো নদীর অস্তিত্ব মানচিত্রে আছে, অথচ বাস্তবে নেই! অনেকের লোভ-লালসার ছাপ পড়েছে নদীর ওপর। নদী দখল করে অনেকে মাছ চাষ করছে, বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করছে নদীর ওপর, অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গৃহস্থালি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্যের লাইন জুড়ে দিয়েছে নদীর সঙ্গে। আবার কোনো কোনো স্থানে শহরের সিটি করপোরেশনের আবর্জনা গিয়ে পড়ছে পাশের নদীতে। শিল্পকারখানার বর্জ্যে নদী সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে। নদ-নদী দূষণ-দখল আর ভরাটের সঙ্গে যারা জড়িত তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। বিভিন্ন সময় তারা দলের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নদ-নদীগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে!

যুগের পর যুগ নদ-নদীগুলো আমাদের অর্থনৈতিকব্যবস্থাকে সচল রেখেছে। নদীগুলো আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারণ করে চলেছে। নদীতে বছরের পর বছর অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, উত্সমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছোট-ছোট খাল-বিল, শাখানদী, উপনদীগুলো ধীরে ধীরে মেরে ফেলা হয়েছে। ফলে বড় বড় নদ-নদীতে পানি সরবরাহের উেস এখন টান পড়েছে। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে এবং হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, নদীগুলো আমাদের সম্পদ, সৌন্দর্য।

গত দুই-তিন দশকে নদী-নদীগুলো প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছে! সরকার বছরের পর বছর নদ-নদী বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও সেসব অর্থের যথার্থ ব্যবহার হয়নি! সময়মতো নদীগুলো খনন করা হয়নি। আর হলেও নদী খনন কাজে দক্ষতার অভাবে নদ-নদীগুলোর পলি অপসারণ করার পরপরই নদ-নদীগুলো আবার ভরাট হয়ে গেছে। পলি অপসারণ করেই ঐ মাটি নদীর তীরেই রাখা হয়েছে, ফলে সেই মাটি নদীতেই আবার এসে পড়েছে। নৌপথ ক্রমাগত কমতে কমতে এখন নেমে এসেছে চার হাজার কিলোমিটারে (যদিও পানির মৌসুমে নৌপথ দাঁড়ায় প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার!)। আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশে নৌপথের সুবিধা অনেক। নৌপথে পরিবহন খরচ কম, জ্তালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। 

নদীর ওপর এমনসব অত্যাচার চলতে থাকলে বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশের বদলে ‘নদীমৃত্যুর দেশে’ পরিণত হবে! আগে বাংলাদেশে নদী রক্ষায় এত এত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছিল  না, অথচ তখন নদ-নদীর দখল-দূষণ-ভরাট কম হতো। আর এখন নদী রক্ষায় বহু প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও নদ-নদীগুলো রক্ষা করা যাচ্ছে না! সম্প্রতি হাইকোর্ট ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’কে নদ-নদীর অভিভাবক ঘোষণা করেছে। তাই সময় এসেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে আরো লোকবল, সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়ার। এছাড়া নদী বিষয়ে আলাদা ট্রাইব্যুনাল করলে তা নদ-নদী রক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে। সর্বোপরি, নদীর দখল-দূষণ রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে ।

 ঢাকা