৩ দিনের বৃষ্টিতে ডুবেছে সিলেট, টিলা ধসে শিশুর মৃত্যু

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৩, ২২:৪১

টানা ৩ দিনের বৃষ্টিতে সিলেট নগরীসহ আশপাশ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। সিলেটের নিন্মাঞ্চল গোয়াইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের বেশ কিছু নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। সিলেট নগরীর বহু বাসাবাড়িতে পানি উঠায় আসবাবপত্র নষ্ট হয়। রান্নাঘরে ময়লা পানি উঠায় অনেকেই রান্নাবান্না থেকে বিরত রয়েছেন।

শনিবার (৭ অক্টোবর) দুপুরের পর থেকে বৃষ্টি থামলেও বিকাল পর্যন্ত নগরীর অনেক এলাকা জলমগ্ন ছিল। সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন জানান, শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩৫৭ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এছাড়া শনিবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয় ১০২ মিলিমিটার। শেষ আশ্বিনে এরকম বৃষ্টিতে অনেকেই অবাক। 

ছবি: আব্দুল বাতিন সয়সল
 
এদিকে অতিবৃষ্টিতে সিলটে সদর উপজেলার খাদিম চা বাগান এলাকার বস্তিলানে টিলা ধসে শনিবার সকালে অর্চনা ছত্রী (১১) নামের এক শিশু মারা যায়। সে ঐ বাগানের বুলবুল ছত্রীর মেয়ে। এছাড়া জৈন্তাপুর উপজেলায় টিলা ধসে তিনটি বাড়ি বিধ্বস্থ হয়েছে। শনিবার ভোরের দিকে এসব টিলা ধসের ঘটনা ঘটে। ভারি বৃষ্টির কারণে টিলার মাটি নরম হয়ে ধসে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা। সিলেটের বিভিন্ন স্থানে টিলার উপর ও টিলার পাশে ঝুকি নিয়ে অনেক পারিবার বসবাস করছেন।

খাদিমনগর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আতাউর রহমান শামীম জানান, অর্চনাদের ঘরটি ছিলো একটি টিলার পাদদেশে। ভারী বৃষ্টিতে ভোরে টিলা ধসে অর্চনাদের ঘরের উপর পরে। এতে শিশুটি ঘটনাস্থলেই মারা যায়। সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। 
 
শনিবার ভোরে জৈন্তাপুর উপজেলার ৬ নম্বর চিকনাগোল ইউনিয়নে দুটি টিলা ধসে তিনটি বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। 

ছবি: আব্দুল বাতিন সয়সল

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, তার বাড়ির কাছে ভোরে টিলা ধসের ঘটনা ঘটে। ধসের আগে এসব ঘরের বাসিন্দারা দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ায় রক্ষা পান তারা। টিলা ধসের খবরে ঘটনাস্থলে যান জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল বশিরুল ইসলাম। তিনি খাদ্য সহায়তা বাবদ ১০ হাজার টাকা করে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি পরিবারকে সহায়তা প্রদান করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাহাড়-টিলার নিকট ঝুঁকি পূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করিয়েছেন।
  
এদিকে ভারী বর্ষণে নগরের বেশিরভাগ এলাকাই পানিতে তলিয়ে যায়। শুক্রবার গভীর রাতে হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার সংলগ্ন পায়ারা আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা নির্ঘুম রাত কাটান। বেড রুমসহ রান্নাঘরে ময়লা পানি উঠায় অনেক বাসায় চুলা বন্ধ। সড়ক, বাসাবাড়ি, দোকানপাট সব পানিতে সয়লাব। 

উপশহর এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ-২ কার্যালয়েও পানি ঢুকেছে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়ও পানি উঠে। তিন ধরে সিলেটে অবিরাম বৃষ্টির ফলে শুক্রবার রাত থেকেই নগরীর বাসাবাড়ীতে পানি ঢুকতে শুরু করে। শনিবার সকালের মধ্যে তলিয়ে যায় নগরের বেশিরভাগ এলাকা।  

নগরের অন্যতম উঁচু এলাকা শাহী ঈদগাহ এলাকার বেশিরভাগ বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। শাহী ঈদগাহসহ উঁচু এলাকা টিলাগড়, মেজরটিলা এলাকারও অনেক বাসায় পানি ঢুকে পড়ে। 

ছবি: আব্দুল বাতিন সয়সল

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান বলেন, ভারি বৃষ্টিতে  জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ড্রেন নালা পরিষ্কার রাখতে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, নগরীর মধ্য দিয়ে বহে যাওয়া সুরমা নদী খনন জরুরি। তাহলে পানি দ্রুত বের হয়ে যাবে। এমএজি ওসমানী মেডিকেলে কলেজ হাসপাতাল, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কাজলশাহ, শাহজালাল উপশহর, দরগামহল্লা, কালীঘাট, বাগবাড়ী, কানিশাইল, লামাপাড়া, লালা দিঘিরপাড়, মাছুদিঘিরপাড়, বাদামবাগিছা, শাহপরান, কুয়ারপাড় উপশহর, সোবহানীঘাট, যতরপুর, শিবগঞ্জ, মাছিমপুর, কামালগড় ও দক্ষিণ সুরমার পিরোজপুর, সিলেট রেলওয়ে স্টেশনসহ সিলেট নগরের বেশিরভাগ এলাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানিতে তলিয়ে গেছে। 

সিলেটে-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের পাঠানটুলায় ছিল কোমর পানি। বরাবরের মতো ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পানি ঢুকায় ব্যাহত হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। 

হাসপাতালের চিকিৎসক অরূপ রাউৎ জানান, ওসমানী মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং ছাত্রাবাসের নিচতলা অবধি পানি উঠেছে।  হাঁটু পানি ভেঙেই ডাক্তাররা ডিউটিতে এসেছেন।

অন্যদিকে ভোরে নিজ এলাকায় জলাবদ্ধতা নিয়ে ফেসবুকে লাইভ করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরহাদ চৌধুরী শামীম। তার লাইভে দেখা যায়, শামীমের বাসার নিচ তলায় পানি থৈ থৈ করছে। আসবাবপত্র অর্ধেক ডুবে আছে। তিনি বলেন, মহানগরের ছড়া, নালা ও খালগুলো যথাসময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হলেও বার বার জলাবদ্ধতার শিকার হতে হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, সুরমা নদী খনন না করলে এ ভোগান্তি থেকে রক্ষা নেই। পাঠানটুলা এলাকায় সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে কোমড় পর্যন্ত পানি জমায় এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা।

শাহজালাল উপশহর এলাকার বাসিন্দারা জানান, প্রায় বাসার নিচ তলায় রাতে পানি ঢুকে পড়ে এতে বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে আছেন।

ইত্তেফাক/পিও