অনিশ্চয়তার বেড়াজাল ছিন্ন হইবে না সহজে

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৩, ০৭:৩০

সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগিতে পারে—বিশ্ব কি নূতন নূতন সংকটে পড়িতে যাইতেছে? করোনা মহামারি এবং তাহার পর যুদ্ধবিগ্রহের অনলে পুড়িয়া বিশ্ব অর্থনীতি যেইভাবে ক্রমাগত ভাঙিয়া পড়িতেছে, তাহার পরিপ্রেক্ষিতে এমন চিন্তা অবান্তর নহে। আমরা লক্ষ করিয়া আসিতেছি, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বৃহত্তর সংঘাত কিংবা সংঘাত অবস্থার কারণে ক্রমাগত যেইরূপ অচলাবস্থার সৃষ্টি করিতেছে, তাহার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়িতেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ফলস্বরূপ, দেশে দেশে ঘনীভূত হইতেছে বিবিধ সংকট। গ্লোবালাইজেশন বা কানেকটিভিটির যুগে যেই হেতু প্রতিটি রাষ্ট্র পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পৃক্ত, সুতরাং বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে কাঁপন ধরাইতেছে মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন। বিশেষত, দরিদ্র দেশসমূহকে তাড়া করিয়া ফিরিতেছে অভাব, দুষ্প্রাপ্যতা।

বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকাইলে আমরা কী দেখিতে পাই? চতুর্দিকে কেবল সংঘাত আর হানাহানি এবং তাহার ফলে ধাবমান ‘অনিশ্চয়তার বেড়াজাল’। সত্যি বলিতে, ভালো নাই কোনো ভূখণ্ড। অধিক সংকটে গরিব দেশগুলি। মুদ্রাস্ফীতির ফলে নিত্যপণ্যের বাজার লাগামহীন। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানিবার স্বার্থে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সুদহার বৃদ্ধি করিলে তাহা শিল্পোত্পাদনের জন্য সুখকর নহে। আবার ভোক্তা পর্যায়ে কনজিউম কমাইবার ফলে ক্ষতির মুখে পড়িবে জাতীয় অর্থনীতি। অর্থাত্ পরিষ্কার হিসাব, আন্তর্জাতিক বা জাতীয় অর্থনীতিতে টান পড়িলে তাহার রেশ বহিয়া যায় ব্যক্তি-পরিবার পর্যায়েও। উন্নত বিশ্বের সহনশীলতার মাত্রা ব্যাপক বিধায়, তাহারা পরিস্থিতি সামলাইয়া লইবে, কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে ইহার অভিঘাত অতি মারাত্মক—যাহা হইতে মুক্তির পথও সহজসাধ্য নহে!

এই ঘোরতর সংকট হইতে নিষ্কৃৃতি মিলিতে অর্থনীতিবিদগণের মুখে বহু তত্ত্বীয় বাণী শুনিতে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু পকেটশূন্য জনগণের কষ্ট লাঘবে তাহা কতটা কাজ করে? একটি সময় ছিল, যখন বাংলার মানুষ পান্তা ভাতের সঙ্গে কাঁচা মরিচ মাখিয়াই উদরপূর্তি করিয়াছে। কিন্তু যখন উন্নয়নশীল বিশ্বের জনগণের ক্রমশ উন্নয়নে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাইতে শুরু করিল, তখন তাহাদের খাদ্যতালিকায় নূতন নূতন পদ যুক্ত হইল। ভালোই চলিতেছিল এইভাবে, কিন্তু বাড়ন্তের গহ্বরে পড়িয়া বর্তমান সময় যেন ‘দিবস যায় না বত্সর বাড়ে’ পরিস্থিতি! এই ক্ষেত্রে ‘সরকার কী করিল’, এমন কথা উঠিতে পারে। সেই ক্ষেত্রে সরকার কি চেষ্টার খামতি রাখিয়াছে, এমন প্রশ্নও উঠিবে। দ্বিমত থাকিবার কথা নহে, দেশ আগাইয়াছে অনেক দূর। অবকাঠামোগত খাত হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের প্রভূত চিত্র দৃশ্যমান হইয়াছে। তবে অবস্থা এখন এমন যে, কোনোরকমে খাইয়া-পরিয়া বাঁচিয়া থাকা গেলেও অসুখে পড়িলে চিকিত্সা করিবার মতো সামর্থ্য কমিতেছে বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের। সংকটের পানি বাড়িতেছে প্রতিদিন, গলা পর্যন্ত ডুবিয়া গিয়াছে অনেকের। এখন কেবল নাক ভাসাইয়া বাঁচিয়া থাকিবার চেষ্টা করা।

বৈশ্বিক অঙ্গন এবং জাতীয় অর্থনীতি যখন সংকটের গভীরে নিমজ্জিত, তখন স্বাভাবিক জীবনধারণের স্বার্থে সকলকে একটি বাক্যই আঁকড়াইয়া ধরিতে হইবে—‘আয় বুঝিয়া ব্যয় করো’। সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প—সকল কিছুই ক্ষুধা বা মন্দার নিকট নতশির। জঠরানলের জ্বালা সর্বাপেক্ষা বড় জ্বালা। সুতরাং, মহাসংকট মোকাবিলায় আয় এবং খরচের মধ্যে সমন্বয়সাধন বাস্তবিক অর্থেই অনেক বড় মহৌষধ। বিশ্ব যেইভাবে ক্রমাগত সংঘর্ষের লীলাভূমিতে পরিণত হইয়া উঠিতেছে, তাহাতে উন্নয়নশীল বিশ্বে ‘বুভুক্ষা পরিস্থিতি’ কী হইতে পারে, তাহা বুঝিতে পারা কঠিন নহে। এবং যেই সকল উন্নয়নশীল দেশ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নানাবিধ চাপের সম্মুখীন, সেইখানকার অর্থনীতির ভবিতব্য কী, তাহাও সহজে অনুধাবনযোগ্য। অনিশ্চয়তার এই বেড়াজাল ছিন্ন হইবে না সহজে। সুতরাং, সকল ক্ষেত্রে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখিয়া টিকিয়া থাকিতে হইলে পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ এবং আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্যসাধন অতীব জরুরি।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন