সিকিমের বন্যা ও তিস্তার ভয়াল রূপ

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:৩০

সম্প্রতি টিভির বাটন টিপে নির্দিষ্ট চ্যানেলে যাওয়ার রোলিং করতেই হঠাত্ একটি বিদেশি বাংলা চ্যানেলে লাইভ ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে আর্তনাদের স্বর শুনে সেখানে কিছুক্ষণ আটকে থাকলাম। লাইভ খবরের উপস্থাপক ও উপস্থাপিকা দুই জনের কণ্ঠেও উচ্চ স্বরে টিভির বড় পর্দার দিকে বারবার তাকাতে বলা হচ্ছিল। নর্থ সিকিমের চুংথামের কাছে রাজ্যের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুত্ প্রকল্পের ড্যাম ভেঙে গেছে। চুংথামের কাছে লাচুং নদী দিয়ে বৃষ্টি ও হিমবাহের জমা হওয়া পানি সেখানকার লোনক হ্রদে জমা হতো। হঠাত্ লোনক হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।

সিকিমের তিস্তা উপত্যকায় গত কয়েক দিনের মেঘভাঙা (ক্লাউড বাস্ট) বৃষ্টিতে লোনক হ্রদের পানি উপচে গিয়ে চুংথামের জলবিদ্যুত্ প্রকল্পের দেওয়াল ফেটে ধসে যায়। প্রবল বেগে সেই বাঁধভাঙা পানি তিস্তা নদী দিয়ে নিচের দিকে ধাবিত হলে ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গিয়ে অরক্ষিত দুই তীরে বিপর্যয় ঘটতে শুরু করে। সেখানকার পাহাড়ি তিস্তার প্রশস্ততা কম। দুই দিকে পাহাড়ঘেরা গিরিপথে অনেকটাই সংকীর্ণ পথে তিস্তা নদী প্রবহমান। এই এলাকায় সচরাচর খরস্রোতা চরিত্রে মানব বসতি থেকে অনেক নিচে বছরের সব সময় প্রবহমান থাকে তিস্তা। তাই কেউ তিস্তা স্রোতকে ততটা তোয়াক্কা না করে দুই পাড় ঘেঁষে গড়ে তুলেছেন দালানকোটা, বাজার, অফিস, পর্যটন স্পট। কিন্তু লোনাক লেকের পানির চাপ সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ড্যাম ফেটে গেলে সবার ধারণার বাইরে তিস্তায় পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পায়।

এর সঙ্গে অতি বৃষ্টির পানি সংযুক্ত হলে হঠাত্ উপচে পড়া জলোচ্ছ্বাসে দুই তীরের বসতিতে সাধারণ মানুষ ও সেনবাহিনীর চৌকিতে থাকা জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। আচমকা এই ঢলে তীরবর্তী সেনা চৌকির ২৩ জন সদস্য স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হয়েছেন, যারা মূলত সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে বিভিন্ন নির্মাণকাজে সহায়তা করে থাকেন। তাদের ৪১টি গাড়ি ও ক্যাম্পের মালামালও নদীতে ভেসে গছে।

এই বন্যায় পুরো লাচিন উপত্যকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কালিম্পংয়ে ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক ভেঙে গেছে। সেখানে ১৪টি সেতু ভেঙে গেছে। ২৮০ বাড়ি ধসে ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ১০২ জন অধিবাসী নিখোঁজ রয়েছে। ঘটনার দুই দিন পর বাংলাদেশের তিস্তা নদী দিয়ে তিন জন ও ধরলা নদী দিয়ে এক জন ভারতীয়র মরদেহ ভেসে এসেছে। সেগুলো বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া ৩ হাজার পর্যটক সিকিমে আটকা পড়েন। এসব পর্যটক সাধারণত পাহাড়ি নদী ও ঝরনার মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে বর্ষাকালে সিকিমে ভ্রমণ করে থাকেন।

বলা হচ্ছে, ২০১৩ সালে উত্তরাখন্ডের কেদারনাথের চোরাবালিতলায় সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছিল। সাধারণত উত্তরাখন্ড, কাশ্মীর, হিমাচল ইত্যাদি প্রদেশে এ ধরনের ফ্লাশফ্লাড হয়। ভারতে কেদারনাথ বিপর্যয়ের পর সিকিমের বুকে এত বড় বিপর্যয়ের ঘটনা এই প্রথম। সিকিমে তিস্তায় বিপর্যয়ের সংবাদ পেয়ে বাংলাদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকাতে ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। ফ্লাড বাইপাস সড়ককে নিরাপত্তার জন্য পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এছাড়া মাইকিং করে চর এলাকার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হঠাত্ প্রাকৃতিক বিপর্যয় এসে হানা দেওয়া এখন প্রকৃতির নতুন চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। ভূমিকম্প, টর্নেডো, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও পাহাড়ি নদীতে ফ্লাশফ্লাড ইত্যাদি হরদম ঘটছে। তবে এসব বিপর্যয়ের জন্য মনুষ্য নির্মিত মেগা প্রকল্পগুলোকে বহুলাংশে দায়ী মনে করা হয়। একটি সাধারণ পাঁচ-ছয় মাত্রার ভূমিকম্পে যতটা প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটে, তার চেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি ঘটে সেই মাত্রার ভূমিকম্পের প্রভাবে যে কোনো মেগা প্রজেক্ট ভেঙে যাওয়ার কারণে।

সিকিমের চুংথাং লেকের দেওয়াল ফেটে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে গত দুই দিন আগে এই এলাকায় পরপর ঘটা চারটি ভূমিকম্পকে। অক্টোবরের ৩ তারিখ রাতে নেপালে এক ঘণ্টায় চারবার ভূমিকম্প হয়েছে। রিখটার স্কেলে এর একটি ৪.৪, একটি ৬.২, আরেকটি ৩.৮ মাত্রার, যা হিমালয়ের নিম্নাংশে শিলং ও বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে অনুভূত হয়েছিল। এছাড়া ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ৫.৩ মাত্রার ভূমিকম্পের সময় সারা দেশ কেঁপে উঠেছিল, যার উত্পত্তিস্থল ছিল সিকিমের কাছে শিলংয়ে।

এসব ছোট ছোট ভূমিকম্পকে সামনে বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাষ হিসেবে মনে করা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে ভয়াবহ ভূমিকম্পের আগে বেশ কয়েক বার ছোট ছোট ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছিল। তারা সেগুলোকে আমলে নেয়নি। সারা পৃথিবীতে বড় বড় ড্যাম তৈরি করে নদীর প্রাকৃতিক জলধারা আটকে নিজেদের প্রয়োজনে যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু হয়েছে বহু বছর আগে থেকে। যত বড় উন্নত দেশ, সেখানে তত বেশিসংখ্যক ড্যাম তৈরি করে চাষাবাদ করা হচ্ছে। সেই সব ড্যামের কোনো কোনোটির মেয়াদ অনেক আগে শেষ হয়েছে। তবু সামান্য সতর্কতা জারির মাধ্যমে সেগুলো টিকিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু অনেক দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ ড্যাম নিয়ে মাথা ঘামানো হয় না। যেমন—লিবিয়ার মারাক্কাসে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের ঘটনায় ডেরনা শহরের কাছে ওয়াজি ডেরনা নদীতে ১৯৭০ সালে নির্মিত মেয়াদোত্তীর্ণ ড্যাম নিয়ে ওদের ‘ড্যামকেয়ার’ ভাব ছিল। যুগোস্লাভিয়া কর্তৃক নির্মিত এসব মেয়াদোত্তীর্ণ ড্যাম সাগরের পানির তোড়ে নিমেষেই ধসে গিয়ে সারা শহরকে দৈত্যের মতো কচলিয়ে সাগরে ভাসিয়ে দেয়। ১০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয় সাগরের বুকে! সেই সব ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা মাত্র দুই মাস আগের।

সিকিমের চুংথাং লেকের দেওয়াল ফেটে যাওয়ার পেছনে সমকালীন চারটি ভূমিকম্প কোনো ক্রিয়া করেছে কি না, তা হয়তো ভবিষ্যতে গবেষণা বা তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে। এছাড়া বিশ্লেষকগণ বলছেন, সিকিমের ব্যারেজ নিকটবর্তী এলাকায় রাস্তা ও রেললাইন বসানোর জন্য ভারী মেশিন দিয়ে ড্রিল করে পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ চলছিল। এজন্য গত বছরের যোশীমঠের মতো ভারী মেশিনের কারণে কৃত্রিম ভূকম্পনের ফলে চুংথাং ড্যামের দেওয়ালে ফাটল ঘটতে পারে। কথা হলো, দিনে দিনে মানুষ প্রকৃতির ওপর যত বাঁধ দিয়েছে, প্রকৃতিও মনে মনে তত বড় বাদ সেঁধেছে। প্রকৃতির সেই প্রতিশোধের অপেক্ষার পালা মেয়াদোত্তীর্ণ স্থাপনা ধ্বংসের মাধ্যমে মানুষকে জানান দিতে মোটেও কার্পণ্য করছে না।

বিশেষ করে সীমান্তের ওপারে ভারতের পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টি, বন্যা অথবা বরফগলা পানি আটকানো সম্ভব না হলে সেটা নিচে ছেড়ে দেওয়া হয়। হঠাত্ বিনা নোটিশে সেই অতিরিক্ত পানি আমাদের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা প্রভৃতি নদ-নদীতে ঢুকে অরক্ষিত দুই কূল ছাপিয়ে অকালবন্যা সৃষ্টি করে এবং উঠতি ফসল ও মানুষের চরম ক্ষতি করে। প্রতি বছর সুনামগঞ্জের হাওরে পাকা ধান ঘরে তোলার আগে পাহাড়ি ঢলে ডুবে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। এ বছর মাত্র দুই মাস আগে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় নির্মিত নতুন রেললাইন উদ্বোধনের আগেই বাঁকা করে দিয়েছে উজানের আকস্মিক পাহাড়ি ঢল।

তিস্তা নদীর পানিকে উজানে একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। ফলে বাংলাদেশে তিস্তায় অহরহ বিপর্যয় ঘটে। প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ বার পর্যন্ত তিস্তা নদীতে বান ডাকে। এমনকি চৈত্র মাসেও বাংলাদেশের তিস্তা অংশে বন্যা দেখা দেয়। ক্ষতি হয় পেঁয়াজ, রসুন, আলু, বাদাম, ডাল প্রভৃতি রবি ফসলের; যার সিংহভাগই সীমান্তের উজানে মনুষ্যসৃষ্ট অবহেলার পরিণতি। এখন উজানে ড্যাম ভেঙে বড় বিপর্যয় হওয়ার আশঙ্কা আমাদের ব্যারেজ, ব্রিজ ইত্যাদি স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ভাবনার উদ্রেক করেছে।

তাই আমাদের সময় থাকতে বেশি সাবধানতা অবলম্বন করে মেয়াদোত্তীর্ণ স্থাপনা—বহুতল বাড়ি, বড় বড় ব্রিজ, ড্যাম, ব্যারেজ, ইঞ্জিন, অফিস, কারখানা—সবকিছুর ব্যাপারে আশু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রকৃতির নিয়মে নশ্বর পৃথিবীতে হঠাত্ হঠাত্ বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে। প্রকৃতির প্রতিশোধের আগুন এখন মানুষের কল্পনার বাইরে পৌঁছে গেছে। তবে মনুষ্যসৃষ্ট কারণে এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এড়াতে মানুষকেই আরো বৈজ্ঞানিক তথ্যনির্ভর আগাম সতর্কতা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। উজানে তিস্তায় চুংথাং জলবিদ্যুত্ কেন্দ্রে আগাম সতর্কতার অপর্যাপ্ততা ও অসাড়তা আমাদের এই বার্তাই দিচ্ছে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

ইত্তেফাক/এমএএম