মানবিক সংবেদনশীলতা কেন নষ্ট হইতেছে

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৩, ০৭:৩০

অন্যকে ফাঁসাইতে নিজের বোনকে খুন করিয়া মস্তক দ্বিখণ্ডিত করিয়াছে—এই ধরনের সংবাদ আমাদের এখন আর খুব বেশি বিস্মিত করে না। অথচ সংবাদটি যে কোনো স্বাভাবিক মানুষের নিকট অবিশ্বাস্য ও জঘন্য বলিয়া প্রতীয়মান হইবে। আমাদের সংবেদনশীলতা খারাপ খবর পড়িতে পড়িতে ভোঁতা হইয়া যাইতেছে। কিন্তু আমরা যে মানুষ, সৃষ্টির সেরা জীব—তাহার মূলে রহিয়াছে আমাদের মানবিক সংবেদনশীলতা। সুতরাং এই সংবেদনশীলতা যাহাতে নষ্ট না হয়, আমাদের সমাজ তেমনিভাবেই তৈরি হইতে হইবে। গতকাল সোমবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদে বলা হইয়াছে, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকে ৯ বত্সরের শিশুকন্যা ইভাকে আপন বড় ভাই খুন করিয়া মস্তক দ্বিখণ্ডিত করে। পুলিশ বলিতেছে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাইতে চার জন মিলিয়া পরিকল্পিতভাবে ইভার মাথা বিচ্ছিন্ন করিয়া খুন করে। প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের দক্ষিণ কুরশি এলাকার খালেদ নুর নামে এক ব্যক্তিকে পিটাইয়া হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঐ ঘটনায় ইভার মা ও বড় ভাই রবিউলকে আসামি করা হয়। সেই মামলায় রবিউলকে কারাগারেও যাইতে হয়। সম্প্রতি রবিউল কারাগার হইতে জামিনে বাহির হইয়া আসে। অতঃপর প্রতিপক্ষকে ফাঁসাইতেই রবিউলের সহযোগিতায় তাহারা ইভাকে খুন করিয়াছে বলিয়া মনে করা হইতেছে।

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাইতে নিজের পুত্র-কন্যা বা বোনকে হত্যার ঘটনা নূতন নহে। ২০১৮ সালে রাজধানীর বাড্ডার সাতারকুল এলাকার একটি ধানখেতে লাশ খুঁজিয়া পাওয়া গিয়াছিল কিশোর আউসারের। সন্তানের মৃতদেহ দেখিয়া তাঁহার দিনমজুর বাবা জাহিদ কান্নায় ভাঙিয়া পড়েন। কাঁদিতে কাঁদিতে ধানখেতেই লুটাইয়া পড়েন ‘হতভাগ্য’ পিতা। নিষ্পাপ কিশোরটির মৃতদেহ আর তাহার পিতার বুকফাটা আর্তনাদে আশপাশের সাধারণ মানুষের চক্ষুদ্বয়ও অশ্রুতে ছলছল করিতে থাকে। পরের দিনই তিন জনকে আসামি করিয়া মামলা দায়ের করে কিশোর আউসারের বাবা জাহিদ। এই অবধি পড়িয়া আর দশটি সাধারণ খুনের ঘটনার মতো আমরা মনে করিতেই পারিতাম। কিন্তু প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত নির্মম তথ্য আমাদের থমকাইয়া দেয়। তদন্তসূত্রে সেই সময় জানা গিয়াছিল, পুত্রবিয়োগে ‘শোকাহত’ পিতা যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়াছিল, তদন্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাহাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাইতেছিল না। অবশেষে কিশোর আউসারকে হত্যার পূর্বে রেকর্ডকৃত একটি সিসিটিভি ফুটেজের দৃশ্য ঘুরাইয়া দেয় তদন্তের মোড়। ঐ ফুটেজে খুন হওয়া কিশোরের সহিত দেখিতে পাওয়া যায় অত্রাঞ্চলের মজিদকে। তদন্তে জানা যায়, পরিকল্পনা মাফিক মজিদকে হত্যার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাবা ডাকিতেছে বলিয়া আউসারকে ধানখেতে লইয়া যায় মজিদ। কিশোরটিকে হত্যা করা হয় সেইখানেই। আর অদূরে দাঁড়াইয়া হত্যার দৃশ্য দেখিতেছিলেন আসল কালপ্রিট।

কথায় আছে, নিজের নাক কাটিয়া অপরের যাত্রাভঙ্গ। কিন্তু নিজের সন্তানকে হত্যা করিয়া শত্রুকে শায়েস্তা করিবার সত্যিকার কাহিনি মনুষ্যত্বের ভিত কাঁপাইয়া দেয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হইল, এই ধরনের ভূকম্পন আজকাল ঘনঘনই ঘটিতেছে। ২০১৮ সালেই হবিগঞ্জে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়া কিশোরী বিউটি আক্তারের ঘটনাটি প্রবল আলোড়ন তুলিয়াছিল দেশ জুড়িয়া। কী বিস্ময়, পুলিশের ভাষ্য হইতে জানা যায়, বিউটি হত্যায় সরাসরি হাত ছিল তাহার পিতার। সেই সময় সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় আপন ভাইকে ফাঁসাইতে নিজের ছয় বত্সরের শিশুকন্যাকে খুন করে পাষণ্ড বাবা। এই ধরনের ঘটনা আজকাল প্রায়শই সংবাদপত্রের পাতায় ঠাঁই পায়। ছয় বত্সর পূর্বে কুমিল্লায় দাম্পত্য কলহের জের ধরিয়া স্ত্রীকে হত্যা করে তাহার স্বামী। হত্যার সময় শিশুপুত্র জাগিয়া কান্নাকাটি শুরু করিলে তাহাকেও হত্যা করে নিষ্ঠুর পিতা। উদাহরণ অনেকই আছে। অনেক ঘটনা হয়তো কখনোই আলোর মুখ দেখে না।

একজন সন্তানের সবচাইতে নিরাপদ আশ্রয় তাহার পিতা-মাতা, যাহার ব্যত্যয় কখনোই মানিয়া লওয়া যায় না। দাম্পত্য, পারিবারিক, সামাজিক জীবনের মধ্যে কেন এমন ক্যানসার ঢুকিয়া পড়িতেছে—যাহা গিলিয়া খাইবে মনুষ্যত্বকে? ইহার অনুসন্ধান প্রয়োজন।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন