সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজন নিউট্রিশনিস্ট

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:৩০

সাতটি মহাদেশ ও পাঁচটি মহাসাগরের এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পৃথিবীতে বহু মানুষকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে চিকিত্সা নিতে হয়। বায়োলজিক্যালি জটিল হিসাব নিকাশের শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে রোগ বাসা বাঁধে সেগুলোর নিরাময়ের জন্যে হাসপাতাল ও ডাক্তারমুখী হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। চিকিত্সকদের প্রেসক্রাইবড করা ওষুধগুলো রোগভেদে ভিন্ন হলেও বয়স উচ্চতা শারীরিক গঠনের জন্যে অনেক সময়ে সে ওষুধগুলো কার্যক্ষমতা পুরোটুকু নিংড়ে দিতে পারে না। এর প্রধান একটি কারণ—প্রত্যেক মানুষের খাদ্যাভ্যাস আলাদা। হয়তো তিনি হাসপাতাল বা বাসার যে খাবারটুকু খাচ্ছেন তার মধ্যে পুষ্টিগুণ কম রয়েছে বা পর্যাপ্ত থেকে বেশি ক্যালোরি নিয়ে ফেলছেন। এতে করে তার ওষুধের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। আবার রোগভেদে খাদ্যের পরিমাণ, আমিষ শর্করা খনিজ লবণের মাত্রা ভিন্ন হয়ে থাকে। এজন্যও রোগীর আরোগ্যলাভে সময় ও অর্থ দুই-ই বেশি লাগে।

এমতাবস্থায় সহজ ও সাশ্রয়ী সমাধান হতে পারে প্রতিটি হাসপাতালে এক জন নিউট্রিশনিস্ট বা পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেওয়া। এই পুষ্টিবিদ রোগী ও রোগ ভেদে পর্যাপ্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্য নির্ধারণ করে দেবেন ও ডাক্তারদের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত থাকবেন। সুস্থ থাকার জন্য একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে যাতে ঘন ঘন রোগব্যাধি বাসা না বাঁধে, সেজন্য আমাদের পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে হবে। জীবনের বার্ধক্যের সময়টা যেন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাটাতে না হয়, সেজন্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে হবে।

আসলে মানুষের জীবনে এমন কোনো অসুখ নেই, যার সঙ্গে পুষ্টির কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু পুষ্টিবিদের পরামর্শ মেনে কোনো প্রকার ওষুধ বা ইনসুলিন ছাড়াই অনেক ব্যক্তিই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। রক্তের কোলেস্টেরল লেভেল অনেক বেশি হলে পুষ্টিবিদের পরামর্শে ডায়েট চার্ট মেনে খাবার খেলে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ থাকে। কারো হয়তো ফ্যাটি লিভার আছে। ফ্যাটি লিভারের অন্যতম চিকিত্সা হলো সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। সেই পরামর্শ শুধু একজন বিশেষজ্ঞ পুষ্টিবিদই আপনাকে দিতে পারেন। কিডনি রোগীদের বিশেষ খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতে হয়। প্রতিটি খাবার মেপে খেতে হয়, এমনকি পানিও। একজন বিশেষজ্ঞ পুষ্টিবিদই শুধু পারেন আপনার খাদ্যাভ্যাস ঠিক করে দিতে, আপনাকে সুস্থ রাখতে।

খাওয়ার ক্ষেত্রে বাচ্চারা ভীষণ খুঁতখুঁতে হয়। একজন মা হিসেবে আপনি অবশ্যই চান আপনার সন্তানকে পুষ্টিকর খাওয়ার খাওয়াতে। এক্ষেত্রেও পুষ্টিবিদ আপনাকে সেরা উপায় বলে দেবে। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিগুণ গ্রহণ করতে হলে কিছু সহজ কৌশল জেনে রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, যে কোনো খাদ্যই চিবিয়ে খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে বেশির ভাগ খাবারই মুখের মধ্যেই ভেঙে যায়। যা খাবার থেকে শরীরে সঠিক পুষ্টি শোষণ করতে সাহায্য হয়। দ্বিতীয়ত, সবজি রেখে পরে খাওয়ার পরিবর্তে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা খেয়ে নেওয়া উচিত। কেন না সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। তৃতীয়ত, সবজিকে পানিতে ভিজিয়ে রাখা, কেটে বা মিক্স করে খাওয়া অনেক বেশি উপকারী। যেমন, সবজিকে বা কোনো বিনসকে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে ফাইটিক অ্যাসিড কমে যায় এবং শরীরে ঐ খাদ্যের পুষ্টি তাড়াতাড়ি শোষণ হয়। চতুর্থত, খাদ্যকে কৌশলগতভাবে খাওয়াও আমাদের শরীর-স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। যেমন ভিটামিন সি-এর সঙ্গে আয়রন জাতীয় খাবার খেলে তার শরীরে অনেক বেশি পুষ্টি সংরক্ষিত হয়। এমনকি ভিটামিন সি শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে।

আমাদের দেশ উন্নয়নশীল, এই উন্নয়নশীল দেশকে উন্নত দেশে রূপান্তরের জন্যে সুস্থ দক্ষ জনবলের দরকার মুদূরপ্রসারী। আমি নিজে একজন ক্যানসার সারভাইবার, পুষ্টি বিষয়ে বহুদিন ধরে পড়াশোনা করেছি। এজন্য আমার উপলব্ধি হয়েছে, আমরা পুষ্টিবিদের পরামর্শ মতো সঠিক মাত্রায় খাবার গ্রহণ করলে আমাদের শরীর অনেক কম অসুস্থ হবে, আমাদের চিকিত্সা ব্যয় অনেক কমবে এবং আমাদের দেশে কর্মক্ষম মানুষ তার সেরা কাজটা উপহার দিতে শারীরিকভাবে বেশি সুস্থ-সবল থাকবে। সেজন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত নিবেদন এই যে, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে অন্তত এক জন করে নিউট্রিশনিস্ট নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। এই আবেদন জানাচ্ছি ক্যানসার বুকে একটি সুস্থ-সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা একজন স্বপ্নবাজ দেশপ্রেমিক হিসেবে।

লেখক: ক্যানসার সারভাইবার, সচেতন নাগরিক

ইত্তেফাক/এমএএম