একজন ক্রীড়াবিদ হইয়াও রাজনৈতিক অনুশীলনে সুন্দরতম উক্তিটি করিয়াছেন ভিনস লম্বারডি। তাহার ভাষায়, ‘নেতারা জন্মান না; কঠোর চেষ্টা ও ত্যাগের মাধ্যমে একজন মানুষ নেতায় পরিণত হন’। লম্বারডির কথা শতভাগ সঠিক। পরিশ্রম, অধ্যাবসায়, ত্যাগ ব্যতীত কি প্রকৃত নেতা হওয়া যায়? যদিও উন্নয়নশীল বিশ্বের চিত্র বলে ভিন্ন কথা। বিশেষ করিয়া, যেই সকল দেশ আধাসামন্তবাদের বৃত্ত ভাঙিতে পারে নাই এখন অবধি, সেইখানে যেন নেতার অভাব নাই; কিন্তু আধাসামন্ত ব্যবস্থার সুযোগে যাহারা অসত্ পথে টাকা কামাই করিয়া রাতারাতি নেতা বনিয়া যায়, তাহাদের কি নেতা হিসাবে গণ্য করা উচিত? দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য, এই ধাঁচের নেতারাই উন্নয়নশীল বিশ্বে সর্বেসর্বা হইয়া উঠিতেছে। দলের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতা বা আমলার নাম ভাঙাইয়া তাহাদের রাজপথ দাপাইয়া বেড়াইতে দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় মদতে উন্নয়নশীল বিশ্বে সামন্তবাদের শিকড় যেইভাবে বহুদূর অবধি বিস্তার লাভ করে, তাহার আসল শক্তির জায়গা হইল ‘আমলাতন্ত্র’। এই মহা সুযোগটিই গ্রহণ করে একশ্রেণির ভুঁইফোঁড় নেতা। পুলিশ-প্রশাসনসহ অন্যান্য স্পর্শকাতর সরকারি প্রতিষ্ঠানকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কবজা করিয়া লয় তাহারা। কতিপয় অসাধু আমলাকে ম্যানেজ করিয়া হঠাত্ নেতায় পরিণত হওয়া ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষের জন্য অভিশাপ হইয়া উঠে।
আমরা গভীর উদ্বেগের সহিত লক্ষ করিয়া আসিতেছি, এই জনপদে বিশেষ করিয়া বিগত প্রায় দুই যুগকালে বহু পাতিনেতা, ভণ্ড নেতার উদয় ঘটিয়াছে। তাহারা গঠন করিয়াছে পেটোয়া বাহিনী। মাদক ব্যবসায়, চাঁদাবাজি, মাস্তানিসহ হেন অপরাধ নাই, যেইখানে তাহাদের অবাধ বিচরণ পরিলক্ষিত হইতেছে না। অথচ তাহাদেরই দেখিতে পাওয়া যায় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষমহলের কর্তাব্যক্তিদের সহিত! দলে অনুপ্রবেশ করিয়া তাহারা যে রাতারাতি বড় নেতা হইয়া গেল, তাহা দলের শীর্ষব্যক্তি না জানিতে পারেন; কিন্তু যাহার বা যাহাদের পাশে দাঁড়াইয়া তাহারা স্লোগান দিতেছে, তাহারা কেন এবং কোন স্বার্থে তাহাদের লালনপালন করিতেছেন? বাস্তবতা হইল, উন্নয়নশীল বিশ্বের শীর্ষব্যক্তিদের ধ্যানধারণাই এমন যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যাহার পকেটে থাকিবে, তাহার কথামতোই চলিবে সকল কিছু। উন্নয়নশীল দেশের এক নম্বর সমস্যা ইহাই।
জাতীয় নির্বাচনের ক্ষণ যত নিকটবর্তী হইতেছে, লক্ষ করা যাইতেছে—কোনো কোনো এলাকায় পাতি বা হাইব্রিড নেতারা ‘বিশেষ কৌশল’ খাটাইতে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে। অন্য দলের নেতাকর্মীর উপর দমনপীড়ন বাড়াইয়া দিয়া তাহাদের কোণঠাসা করিবার চেষ্টা করিতেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তুচ্ছ কারণ দেখাইয়া তুলিয়া দিতেছে পুলিশ-প্রশাসনের হাতে। মাসল পাওয়ার দেখাইতে ‘হিটার বাহিনী’ গড়িয়া তুলিতেছে এবং রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি জনগণের সম্মুখে ক্ষুণ্ন করিতেছে। ইহা তো অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা, সামন্তবাদ ব্যবস্থার নগ্ন দৃষ্টান্ত!
উপর্যুক্ত পরিস্থিতির আলোকে উত্তরণের রাস্তা কী হইতে পারে? দলে একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী নেতার অনুপ্রবেশ ঘটিলে শীর্ষনেতাদের কী করিবার কথা? সম্ভবত ইহার সঠিক পথটি দেখাইয়াছেন গ্রাচো মার্কস। গ্রাচোর পরামর্শ, ‘রাজনীতি হইল সমস্যার অনুসন্ধান করা, ইহার খোঁজ করা, ইহা নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা এবং সর্বশেষে ভুল রাস্তা পরিহারে সঠিক ও কার্যকর পন্থা প্রয়োগ করা’। এই প্রখ্যাত মার্কিন তারকা শীর্ষনেতাদের উদ্দেশে যাহা বলিয়াছেন, তাহার সহিত একমত না হইয়া উপায় নাই। কেননা, পাতিনেতাদের দৌরাত্ম্যে দলে কেবল বিশৃঙ্খলা ও হানাহানিই বাড়িবে। সাধারণ মানুষের উপর যেইভাবে দমনপীড়ন চালাইতেছে, তাহাদের সহিত অবধারিতভাবে সংঘাত বাধিবে একটি সময়ে আসিয়া। বিশেষত, নির্বাচনের সময় ইহার আশঙ্কা অধিক। পাতিনেতারা না-জানিতে পারে, সচেতন মহল ঠিকই জানেন, রাজনীতিতে সুদিন এবং দুর্দিন অসাবধানতার কারণে সহসাই বদলাইয়া যাইতে পারে!
